বঙ্গভঙ্গ নিছকই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি ছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উদ্দেশ্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ভূমিকা বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনকে ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সূত্রে গেঁথে দেয়। তবে এ আন্দোলন শুধু সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদেরও সীমাবদ্ধতা ছিল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। বঙ্গভঙ্গ তাই একদিকে ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সংঘাতকে সামনে এনেছিল, অন্যদিকে বাংলা কার প্রতিনিধিত্ব করবে সেই প্রশ্নও সামনে এনেছিল

১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর। ব্রিটিশ সরকার যখন এ দিনে বঙ্গভঙ্গকে বাস্তবে রূপ দেয়, এর পেছনে তারা দেখিয়েছিল প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির যুক্তি। বিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে ভাগ করে গঠন করা হয় পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ, যার রাজধানী ছিল ঢাকা। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যায় কলকাতাকেন্দ্রিক প্রশাসনের কাছে। ব্রিটিশ সরকারের যুক্তি ছিল, এত বিশাল একটি প্রদেশকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত ঘিরে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা ক্রমেই প্রশাসনিক সীমানার প্রশ্ন ছাড়িয়ে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও জাতীয়তাবাদের বিতর্কে রূপ নেয়।

প্রশ্ন হলো, বঙ্গভঙ্গ কি শুধু প্রশাসনিক সুবিধার জন্য করা হয়েছিল, নাকি এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক হিসাব-নিকাশও?

এই প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা কিছুটা মুশকিলের। কারণ বাংলার প্রশাসনিক সমস্যা ছিল তা সবাই জানত। তবে বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা কীভাবে চূড়ান্ত হয়েছিল, এর ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে কী পরিবর্তন এসেছিল এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠী কীভাবে সিদ্ধান্তটিকে গ্রহণ করেছিল— সে সব বিবেচনায় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বেঙ্গল ছিল ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম বৃহৎ প্রশাসনিক অঞ্চল। প্রায় আট কোটি মানুষের বসবাস ছিল এ অঞ্চলে। এত বড় জনপদ পরিচালনা ঔপনিবেশিক সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। এছাড়া পূর্ববঙ্গ কলকাতার প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে দূরে হওয়ায় অঞ্চলটির শাসন ও উন্নয়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। ১৮৯৯ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত ভারতের ভাইসরয় ছিলেন লর্ড কার্জন। তার সরকার দাবি করেছিল, বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরো কার্যকর করা সম্ভব হবে এবং পূর্ববঙ্গ ও আসামের প্রতি অধিক মনোযোগ দেয়া যাবে। এছাড়া নতুন প্রদেশ গঠনের ফলে ঢাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ঐতিহাসিক জন আর ম্যাকলেনের ১৯৬৫ সালের গবেষণাপত্র ‘দ্য ডিসিশন টু পার্টিশন বেঙ্গল ইন ১৯০৫’-এ সরকারি নথি ও চিঠিপত্রের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন, বঙ্গভঙ্গের প্রাথমিক প্রস্তাবগুলোর পেছনে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনা ছিল। তবে পরিকল্পনাটি এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনাও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ, প্রশাসনিক সমস্যার যুক্তিকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশাসনিক সমস্যা ছিল বলেই যে তার সমাধান হিসেবে গৃহীত সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ছিল, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।

১৯০৫ সালের আগেই কলকাতা ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। সেখানকার সংবাদপত্র, রাজনৈতিক সংগঠন এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিভিন্ন অংশ ব্রিটিশ শাসনের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছিল। বঙ্গভঙ্গের ফলে কলকাতাকেন্দ্রিক প্রশাসনিক পরিসর ছোট হয়ে যায় এবং ঢাকাকে কেন্দ্র করে নতুন প্রাদেশিক প্রশাসন গড়ে ওঠে। এর মধ্য দিয়ে কলকাতার রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক সুযোগ এবং আঞ্চলিক স্বার্থের বিন্যাসেও পরিবর্তন আসে। ম্যাকলেনের গবেষণায় দেখা যায়, বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার আগে রাজনৈতিক বিবেচনার গুরুত্ব বেড়েছিল। তবে তিনি এটিও মনে করিয়ে দেন, এই পরিস্থিতিকে জাতীয়তাবাদ দমনের পরিকল্পনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।

ঐতিহাসিক ডেভিড লুডেন ‘স্পেইশাল ইনইকুইটি অ্যান্ড ন্যাশনাল টেরিটরি: রিম্যাপিং ১৯০৫ ইন বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম’ প্রবন্ধে বঙ্গভঙ্গকে ভূখণ্ড পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপট হিসেবে বিশ্লেষণ করেন। তার আলোচনায় উঠে এসেছে, নতুন সীমানা আঞ্চলিক রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল। তার বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, বঙ্গভঙ্গ কেবল প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তন ছিল না। এটি রাজনৈতিক, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ক্ষেত্রকেও বদল এনেছিল।

বঙ্গভঙ্গের ফলে গঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। কিছু মুসলিম নেতা ও এ পাশের জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নতুন প্রদেশকে স্বাগত জানিয়েছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিল, ঢাকাকেন্দ্রিক প্রশাসন গড়ে উঠলে শিক্ষা, সরকারি চাকরি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের সুযোগ বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে। শিক্ষিত ও প্রভাবশালী এ শ্রেণির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কলকাতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাদের অনেকের আশঙ্কা ছিল, বঙ্গভঙ্গের ফলে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর ঐক্য দুর্বল হবে এবং কলকাতাকেন্দ্রিক তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে এ সাংঘর্ষিক অবস্থানকে হিন্দু বনাম মুসলমানের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা ঠিক নয় বলেও মতামত দেন অনেক ঐতিহাসিক। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মত, আঞ্চলিক স্বার্থ ও প্রত্যাশা ছিল। বঙ্গভঙ্গের পক্ষে অবস্থান নেয়া মানেই বাঙালি পরিচয় প্রত্যাখ্যান করা নয়; একইভাবে এর বিরোধিতা করলেই সব জনগোষ্ঠীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা হয় না।

সেমন্তী ঘোষের ‘ডিফারেন্ট ন্যাশনালিজমস: বেঙ্গল, ১৯০৫-১৯৪৭’গ্রন্থে বাংলার জাতীয়তাবাদী ধারণা ও রাজনৈতিক পরিচয়ের এ জটিল অবস্থা নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তার আলোচনা থেকে বোঝা যায়, বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানদের জাতীয়তাবাদী চিন্তা একরকম ছিল না। তাদের আঞ্চলিক পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় এবং জাতি ও রাষ্ট্র সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা ছিল।

অপর দিকে, বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাদের কাছে বেঙ্গল বা বাংলা কেবল একটি প্রশাসনিক অঞ্চল ছিল না; এটি ছিল ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ভূখণ্ড। তাই বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা স্বদেশি আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক দাবি বা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের বিরোধিতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্রিটিশ পণ্য বর্জন, দেশীয় পণ্যের ব্যবহার, জনসভা, মিছিল, গান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আন্দোলনটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। গবেষক সুমিত সরকার ‘দ্য স্বদেশী মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল, ১৯০৩-১৯০৮’ গ্রন্থে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের বিকাশ, রাজনৈতিক সংগঠন এবং প্রতিবাদগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন, সামাজিক সীমাবদ্ধতা এবং এর রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলোর পরিবর্তনও তুলে ধরেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ভূমিকা বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনকে ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সূত্রে গেঁথে দেয়। তবে এ আন্দোলন শুধু সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদেরও সীমাবদ্ধতা ছিল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। বঙ্গভঙ্গ তাই একদিকে ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সংঘাতকে সামনে এনেছিল, অন্যদিকে বাংলা কার প্রতিনিধিত্ব করবে সেই প্রশ্নও সামনে এনেছিল।

বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে কয়েক বছর ধরে চলা আন্দোলনের পর ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্তটি রদ করে। বাংলার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠিত হয় এবং একই বছর ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরের ঘোষণা দেয়া হয়। বঙ্গভঙ্গ রদের ঘটনা দেখিয়ে দেয়, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে উপস্থাপিত একটি সিদ্ধান্ত কীভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। বাংলার সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রশ্নটি তত দিনে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।

তাই ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে নিছক প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য আড়ালে থেকে যায়। প্রশাসনিক সমস্যার বাস্তবতা, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, আঞ্চলিক বৈষম্য, ধর্মীয় পরিচয় এবং বিভিন্ন শ্রেণির স্বার্থ—সব মিলিয়েই বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও জাতীয়তাবাদী চেতনা এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে বিস্তৃত রাজনৈতিক তাৎপর্য দিয়েছিল।

আরও