ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সারাজীবন কাটানোর স্বপ্ন অধিকাংশ মানুষই দেখে। তবে কিছু মানুষ এর ব্যতিক্রম। যারা সম্পর্কের নাম শুনলেই দূরে পালায়। কারো কারো কাছে ‘প্রতিশ্রুতি’ বা ‘সারাজীবনের বন্ধন’ শব্দগুলো কোনো রোমান্টিক স্বপ্ন নয়, বরং এক বিভীষিকার নাম। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'গ্যামোফোবিয়া' (Gamophobia)।
গ্যামোফোবিয়া আসলে কী?
সহজ কথায়, গ্যামোফোবিয়া হলো দীর্ঘমেয়াদী কোনো সম্পর্কে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া বা বিয়ের প্রতি তীব্র ও অস্বাভাবিক ভয়। এটি সাধারণ ‘নার্ভাসনেস’ বা বিয়ের আগে সামান্য দুশ্চিন্তার চেয়ে অনেক বেশি গভীর। গ্রিক শব্দ ‘গ্যামোস’ (বিয়ে) এবং ‘ফোবোস’ (ভয়) থেকে এ শব্দের উৎপত্তি। যাদের এ ফোবিয়া আছে, তারা কোনো মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসলেও সম্পর্কের চূড়ান্ত পরিণতি বা আইনি বন্ধনে জড়াতে গেলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
গ্যামোফোবিয়া কতজনের আছে তা সঠিকভাবে জানা কঠিন। অনেকেই এ ভয় নিজের মধ্যে চেপে রাখেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১ জন এবং ৫ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে ১ জন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এ ধরণের ফোবিয়ায় আক্রান্ত হন।
এটি কেন হয়?
'গ্যামোফোবিয়া' রাতারাতি জন্ম নেয় না। এর পেছনে থাকতে পারে অতীত বা শৈশবের কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা। শৈশবের ট্রমা যেমন বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ বা প্রতিনিয়ত ঝগড়া দেখে বড় হওয়া শিশুরা মনে করে সব সম্পর্কের শেষটাই বুঝি কষ্টের। হৃদয় ভাঙার ভয় এর পেছনে অন্যতম কারণ। অতীতে কোনো প্রিয়জনের কাছে মারাত্মকভাবে প্রতারিত হলে মানুষ নিজেকে বাঁচাতে একটি মানসিক দেয়াল তৈরি করে। বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (BPD) বা আত্মবিশ্বাসের অভাব অনেক সময় প্রতিশ্রুতির ভয় বাড়িয়ে দেয়। পরিত্যক্ত হওয়ার ভয়ও গ্যামোফোবিয়ার কারণ হতে পারে।
এছাড়া অন্য ভীতিগুলো যেমন ফিলোপোবিয়া (Philophobia) বা ভালোবাসার প্রতি ভয়, পিস্টানথ্রোফোবিয়া (Pistanthrophobia) অর্থাৎ অন্যকে বিশ্বাস করা বা প্রিয়জনের কাছে আঘাত পাওয়ার ভয় এবং জেনোফোবিয়া (Genophobia) মানে যৌন সম্পর্ক বা শারীরিক ঘনিষ্ঠতার ভয় থেকেও গ্যামোফোবিয়া হতে পারে।
তবে অনেকক্ষত্রে সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় চাপও ভূমিকা রাখে। অনেক সংস্কৃতিতে আবেগ বা ভালোবাসার গুরুত্ব না দিয়ে বিয়ে দেয়া হয়, যা ভয় তৈরি করতে পারে।
লক্ষণ
যখনই সম্পর্কের গভীরতা বা বিয়ের প্রসঙ্গ আসে, গ্যামোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে কিছু শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে যেমন- কাঁপুনি, মাথা ঘোরা বা হালকা অনুভব করা, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, বুক ধড়ফড় করা, বমি বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট, পেটে অস্বস্তি বা বদহজম। এছাড়া সুখি দম্পতিদের দেখলে অযথা বিরক্ত হওয়া বা অস্থির বোধ করা।
গ্যামোফোবিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিরা যা করতে পারেন
দীর্ঘস্থায়ী অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তুলতে অক্ষম হওয়া। সম্পর্কে থাকা অবস্থায় চরম উদ্বেগ অনুভব করা এবং সম্পর্কটি ভেঙে যাওয়ার ভয়ে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা করা। সুখি বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কোনো দম্পতিকে দেখলে অস্থিরতা অনুভব করা। মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়া বা হঠাৎ সম্পর্ক শেষ করে দেয়া।
ফোবিয়া বনাম স্বাধীনতা
অনেকে গ্যামোফোবিয়াকে কেবল ‘ব্যাচেলর লাইফ’ এনজয় করার বাহানা মনে করেন। কিন্তু দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। একজন স্বাধীনচেতা মানুষ স্বেচ্ছায় একা থাকতে পছন্দ করেন। অন্যদিকে, গ্যামোফোবিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি ভেতরে ভেতরে সঙ্গী চাইলেও তার অবচেতন মনের ভয়ের কাছে হেরে যান। এর ফলে তারা অনেক সময় অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রিয় মানুষকে দূরে ঠেলে দেন।
চিকিৎসকের পরামর্শ কখন নেবেন?
যদি আপনি নিয়মিত প্যানিক অ্যাটাক অনুভব করেন বা আপনার উদ্বেগ দৈনন্দিন জীবন ও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
মুক্তির উপায় কী?
সঠিক চিকিৎসায় গ্যামোফোবিয়া সম্পূর্ণ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
১. সিবিটি (CBT): কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির মাধ্যমে নেতিবাচক চিন্তার ধরণ পরিবর্তন করা হয়।
২. এক্সপোজার থেরাপি: ধাপে ধাপে প্রতিশ্রুতির ভয়কে জয় করতে সাহায্য করা হয়।
৩. যোগাযোগ: সঙ্গীর সঙ্গে নিজের ভয় নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা চিকিৎসার একটি বড় অংশ।
সম্পর্কে জড়ানোর ভয় মানেই আপনি খারাপ মানুষ নন। এটি একটি মানসিক অবস্থা যা প্রতিকারযোগ্য। নিজেকে সময় দিন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, ভয়কে পাশ কাটিয়েই সুন্দর আগামীর পথ তৈরি হয়।
[ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) ও ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের সহায়তায় লেখা]