বিড়ালের রঙের জিনগত রহস্য

অরেঞ্জ বিড়াল মানেই ছেলে, আর ক্যালিকো হলেই মেয়ে!

এ কারণেই প্রায় ৮১ শতাংশ কমলা বিড়ালই পুরুষ। কারণ শুধুমাত্র একটি এক্স ক্রোমোজোমে কমলা জিন থাকলেই সে কমলা রঙের হয়ে যায়। কিন্তু একটি মেয়ে বিড়ালকে কমলা রঙের হতে হলে তার দুটি ক্রোমোজোমেই এই রঙের জিন থাকতে হবে, যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম ঘটে। তাই ক্যালিকো বিড়াল প্রায় সবসময়ই মেয়ে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, হাজারে একটি ক্যালিকো বিড়ালও পুরুষ হয় না।

আবার একটি কমলা মা বিড়ালের সব ছেলে বাচ্চাই কমলা হবে, বাবা যে রঙেরই হোক না কেন। আবার মিশ্র রঙের মা বিড়ালের ক্ষেত্রে তার ছেলে বাচ্চাদের অর্ধেক কমলা, অর্ধেক অন্য রঙের হতে পারে।

পাশের বাসার জানালায় বসে থাকা ক্যালিকো বিড়ালটাকে দেখে অনেকেই ধরে নেন, এটা নিশ্চয়ই মেয়ে বিড়াল। আবার রিকশায় যেতে যেতে রাস্তায় হেঁটে যাওয়া কোনো কমলা রঙের বিড়ালকে দেখে মনে হয়, এটা বোধহয় ছেলে বিড়াল। যদিও এসবই আমাদের অনুমান। তবে অবাক করার মতো হলেও, অধিকাংশ সময় এ ধারণাগুলো সত্যি হয়। কিন্তু কেন এমন হয়, তার পেছনে আছে মানুষের মতোই বিড়ালদের ক্রোমোজোমের কারসাজি।

কমলা রঙের বিড়ালগুলোকে 'জিঞ্জার ক্যাট' বলা হয়। ছবির বিড়ালের নাম বব। ছবি: সাকের উজ্জামান

টকটকে কমলা রঙের ‘জিঞ্জার ক্যাট’ এবং কালো, সাদা ও কমলা রঙের মিশেলে ‘ক্যালিকো ক্যাট’ মূলত তাদের গায়ের রঙের বিন্যাস ও লিঙ্গভেদে আলাদা হয়ে থাকে। এরা জিনগত লিঙ্গ, আচরণ ও বৈশিষ্ট্যভেদে একে অন্যের থেকে আলাদা হয়।

একটি ক্যালিকো বিড়াল। ছবি: সংগৃহীত

বিড়ালের লোমের রং শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এটি অনেকটা নির্ভর করে তার লিঙ্গের ওপর। অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো বিড়ালের ক্ষেত্রেও দুটি লিঙ্গ নির্ধারণকারী ক্রোমোজোম থাকে। মেয়ে বিড়ালের ক্ষেত্রে দুটি এক্স ক্রোমোজোম (XX) এবং ছেলে বিড়ালের ক্ষেত্রে একটি এক্স ক্রোমোজোম ও একটি ওয়াই ক্রোমোজোম (XY)। আর বিড়ালের রং নির্ধারণকারী জিনও থাকে এই এক্স ক্রোমোজোমেই।

এখানেই শুরু হয় আসল গল্প। বিড়ালের একটি এক্স ক্রোমোজোমে হয় কালো রঙের জিন থাকবে, নয়তো কমলা রঙের জিন থাকবে। কিন্তু দুটো রং কখনো একসঙ্গে থাকবে না। তাই যেসব বিড়ালের একটি মাত্র এক্স ক্রোমোজোম (মানে ছেলে বিড়াল) থাকে, তারা হয় পুরোপুরি কমলা রঙের হয়, নয়তো অন্য কোনো রঙের হয়। পুরোপুরি কমলা রঙের হলে আমরা তখন তাদের অরেঞ্জ বা জিঞ্জার ক্যাট বলি।

কিন্তু মেয়ে বিড়ালের ক্ষেত্রে যেহেতু দুটি এক্স ক্রোমোজোম থাকে, তাই এদের একটিতে কালো আর অন্যটিতে কমলা রঙের জিন থাকায় মিশ্র রং নিয়ে বিড়াল জন্মায়। আর এ মিশ্র রঙের বিড়ালদের আমরা ‘ক্যালিকো’ বা ‘টরটয়েসশেল’ নামে চিনি।

মিষ্টি রোদে ঘুমিয়ে আছে আদুরে একটি ক্যালিকো বিড়াল। ছবি: ব্রিটানিকা

এ কারণেই প্রায় ৮১ শতাংশ কমলা বিড়ালই পুরুষ। কারণ শুধুমাত্র একটি এক্স ক্রোমোজোমে কমলা জিন থাকলেই সে কমলা রঙের হয়ে যায়। কিন্তু একটি মেয়ে বিড়ালকে কমলা রঙের হতে হলে তার দুটি ক্রোমোজোমেই এই রঙের জিন থাকতে হবে, যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম ঘটে। তাই ক্যালিকো বিড়াল প্রায় সবসময়ই মেয়ে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, হাজারে একটি ক্যালিকো বিড়ালও পুরুষ হয় না।

সাধারণত ছেলে বিড়ালের 'XY' ক্রোমোজোম থাকে। কিন্তু কোনো কারণে যদি একটি বাড়তি 'X' ক্রোমোজোম থাকে (XXY), কেবল তখনই একটি ছেলে বিড়াল ক্যালিকো হতে পারে। এটি প্রকৃতিতে অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা। ছবি: এআইনির্মিত

তবে প্রকৃতি সবসময় নিয়ম মেনে চলে না। খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে পুরুষ ক্যালিকো বিড়াল দেখা যায়। এর পেছনে থাকতে পারে ভ্রূণ বিকাশের সময় জিনগত পরিবর্তন। দুটি ভ্রূণ কোনো কারণে মিশে গেলে বা অতিরিক্ত একটি এক্স ক্রোমোজোম থাকলে এ ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু পুরুষ ক্যালিকো বিড়াল সত্যিই বিরল। আরেকটি মজার বিষয় হলো, পুরুষ ক্যালিকো বিড়ালগুলো সাধারণত বংশবিস্তার করতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন রিটেইল প্ল্যাটফর্ম Chewy (চিউই) তাদের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানিয়েছে।

ক্রোমোজোমের মিউটেশনের কারণে জিঞ্জার ক্যাট কমলা রঙের ও ক্যালিকোরা মিক্সড রঙের হয়। ছবি: সাইন্স নিউজ

আবার একটি কমলা মা বিড়ালের সব ছেলে বাচ্চাই কমলা হবে, বাবা যে রঙেরই হোক না কেন। আবার মিশ্র রঙের মা বিড়ালের ক্ষেত্রে তার ছেলে বাচ্চাদের অর্ধেক কমলা, অর্ধেক অন্য রঙের হতে পারে।

সব মিলিয়ে, বিড়ালের রং শুধু চোখের আরামই দেয় না। বরং তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে জিনতত্ত্বের এক চমৎকার গল্প। পরেরবার হঠাৎ কোনো কমলা বা ক্যালিকো বিড়াল দেখলে, নিশ্চয়ই তার রঙের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্রোমোজোমের কারসাজি নতুন করে ভাবাবে।

আরও