বাড়িতে রান্না করা খাবারের ছবি পারিবারিক গ্রুপ চ্যাটে পোস্ট করার আগমুহূর্তে থমকে যান কোকো লি। ছবিটি দেখলে তার মা হয়তো প্রশ্ন করতেন, ‘তুমি এই সময়ে অফিসে নেই কেন?’
৩২ বছর বয়সী কোকো লি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি প্রপার্টি ফার্মে চাকরি করতেন। প্রায় ছয় মাসে আগে কাজের অতিরিক্ত চাপ ও স্বীকৃতির অভাবে তিনি চাকরি ছাড়েন। চীনে এখন চাকরি পাওয়া এতটাই কঠিন যে তার মতো বহু বেকার নিজেদের কর্মহীনতার কথা পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখছেন। এই পরিস্থিতিতে তারা বেছে নিয়েছেন অভিনব এক পথ: ‘ফেইক কমিউট’ বা অফিসে যাওয়ার ভান।
কোকো লি বলেন, ‘মা জানতে পারলে তিনি উদ্বেগে পড়ে যেতেন; সেই দুশ্চিন্তা আমার ওপরও চাপিয়ে দিতেন। অথচ তার এই উদ্বেগ আমার কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারত না।’
কোকোর এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অবশ্য বিচ্ছিন্ন নয়। অনলাইনে এই প্রবণতা ইতিমধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সময় কাটানোর পরামর্শ, আত্মীয়দের প্রশ্ন এড়ানো কিংবা বেকারত্ব লুকানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে তৈরি পোস্টগুলো ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। ইনস্টাগ্রামের মতো অ্যাপ ‘রেডনোট’-এ এসব পোস্টের ভিউ ৭ কোটির বেশি। টিকটকের চীনা সংস্করণ ‘ডোইন’-এ ভিউ ৬১ কোটি। মাইক্রোব্লগিং সাইট ‘ওয়েইবো’-তে সংশ্লিষ্ট হ্যাশট্যাগগুলো পেয়েছে প্রায় ৩২ কোটি ভিউ।
বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইনে এই আলোচনার ঢেউয়ের পেছনে রয়েছে চীনের দুর্বল শ্রমবাজার। রফতানি-নির্ভর অর্থনীতিতে টিকে থাকতে উৎপাদন খাতে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। কোম্পানিগুলো কর্মী ছাঁটাই করছে, বেতন কমাচ্ছে ও কর্মীদের ওপর কাজের চাপ বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি আবাসন বাজারের সংকট, স্থানীয় সরকারের আর্থিক টানাপোড়েন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অটোমেশনের ব্যাপক বিস্তার।
শ্রমবাজারের এই চাপের মুখে পড়ে ‘ভুয়া’ কর্মীরা সময় কাটান পার্ক, লাইব্রেরি, ক্যাফে কিংবা শপিং মলে। সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টে এ নিয়ে নানা পরামর্শও শেয়ার করা হচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে এশিয়ার আর্থিক সংকটের সময় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মহীন ‘স্যালারিম্যানদের’ লুকিয়ে থাকার সঙ্গে এর মিল পাওয়া যায়।
এআই-এর বিস্তারের কারণে গত আগস্টে চাকরি হারানো ৩৬ বছর বয়সী ভিজ্যুয়াল এফেক্টস প্রোডিউসার ঝাং বলেন, ‘কাজের দিনে লাইব্রেরিগুলো যে এভাবে মানুষে পূর্ণ থাকতে পারে, তা আমি কখনো ভাবিনি।’
সামাজিক মাধ্যমে অনেকে তাদের দিনলিপি লিখছেন। ‘বেকারত্বের ৩০তম দিন: কাজ করার ভান করে কাটানো এক মাস’ শিরোনামে এক ব্যবহারকারী ৮০ বার চাকরির আবেদন করে ব্যর্থ হওয়ার গল্প তুলে ধরেছেন।
একইভাবে ২৮ বছর বয়সী সুসান সান গত বছরের শেষ দিকে চাকরি হারানোর বিষয়টি গোপন রেখেছেন। তবে গত মে মাসে তার মা ও সৎবাবা তার সঙ্গে থাকা শুরু করলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। বাবা-মায়ের নজর এড়াতে তাকে প্রতিদিন সকাল ৯টার আগে বাড়ি থেকে বের হতে হয় ও সন্ধ্যা ৬টার পর ফিরতে হয়। সুসান বেকার ভাতা ও জমানো অর্থ দিয়ে চলছেন। তিনি বলেন, কম খরচে ও কাজ না করে থাকতে তিনি খুশি। তার একমাত্র চাপ আসে বাবা-মায়ের কাছ থেকে।
ব্যক্তিগত এই সংকটের বাইরে প্রবণতাটিকে সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কর্নেল ইউনিভার্সিটির চীনা রাজনীতির সহযোগী অধ্যাপক ডায়ানা ফু মনে করেন, অফিসে যাওয়ার এই ভান মানুষকে সমাজে নিজেদের ‘মুখ রক্ষা’ করতে ও সম্মিলিত অসন্তোষ প্রশমিত করতে সাহায্য করে। তার মতে, ‘এই ভুয়া কর্মীরা চীনা সরকারকে অটোমেশনের দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং চাকরির সুরক্ষা—এই দুইয়ের মধ্যে কোনো একটি বেছে নেয়ার সংকট থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করছে।’
তবে এই ‘অভিনয়’ দীর্ঘ মেয়াদে কতটা টিকবে, তা নিয়ে সতর্ক করেছেন বাফেলো ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ইগে ডং। তিনি বলেন, ১৯৯০-এর দশকের জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় চীনের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে এই অভিনয় ধরে রাখা বেকারদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
— রয়টার্স