ব্রিটেনের রাজনীতিতে সরকার ও প্রধানমন্ত্রী বদল হয়েছে বহুবার, কিন্তু ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে একটি বিষয় গত ১৫ বছর ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। সেটি কোনো রাজনৈতিক নীতি বা আইন নয়, বরং চার পা আর লম্বা গোঁফওয়ালা এক বিড়াল, নাম তার ল্যারি। ব্রিটিশ সরকারের অফিসিয়াল ‘চিফ মাউসার টু দ্য ক্যাবিনেট অফিস’ বা ইঁদুর শিকারি হিসেবে ল্যারি গত রোববার ডাউনিং স্ট্রিটে ১৫ বছর পূর্ণ করল। দীর্ঘ এ সময়ে ব্রিটেনের ছয়জন প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় নিতে দেখলেও ল্যারি তার নিজের জায়গায় অটল রয়েছে।
ল্যারির জীবনকাহিনী অনেকটা সিনেমার মতো। লন্ডনের রাস্তায় এক সময় ঘুরে বেড়ানো এ ধূসর-সাদা রঙের বিড়ালটিকে ২০১১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্যাটারসি ডগস অ্যান্ড ক্যাটস হোম থেকে দত্তক নিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। এরপর থেকে সে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়ের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে দিনযাপন করছে। এ ঘটনার পর রাস্তার সাধারণ এক বিড়াল থেকে রাতারাতি ব্রিটিশ ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছে যায় সে। ডাউনিং স্ট্রিটের ওয়েবসাইটে ল্যারির কাজের একটি তালিকাও দেয়া আছে। তার কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অতিথিদের স্বাগত জানানো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকি করা এবং ডাউনিং স্ট্রিটের প্রাচীন আসবাবপত্রগুলো ঘুমানোর জন্য কতটা আরামদায়ক তা পরীক্ষা করা। তবে বাস্তবে তার উপস্থিতি রাজনীতির ব্যস্ত পরিবেশে এক ধরনের স্থিরতা ও স্বাভাবিকতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ও তার স্বামী ফিলিপ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়াকে কার্যালয়ের সামনে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন
লন্ডনে সফরে আসা অনেক বিশ্বনেতার সঙ্গেই ল্যারির দেখা হয়েছে। অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ছবি তোলার সময় হঠাৎ হাজির হয়ে সে ফটোগ্রাফারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে হুটহাট হাজির হয়ে ছবি নষ্ট করায় বা ‘ফটো-বম্বিং’ করায় তার বেশ খ্যাতি রয়েছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লন্ডন সফরে এলে ল্যারি আনুষ্ঠানিক ছবির সময় সামনে এসে দাঁড়ায় এবং পরে প্রেসিডেন্টের গাড়ির নিচে শুয়ে পড়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।
ল্যারি শুধু মানুষের সঙ্গেই নয়, ডাউনিং স্ট্রিটে থাকা অন্যান্য পোষা প্রাণীর সঙ্গেও সময় কাটিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সময় একটি কুকুরের সঙ্গে এবং পরে ঋষি সুনাকের সময় আরেকটি ল্যাব্রাডরের সঙ্গে একই এলাকায় বসবাস করেছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পরিবারের বিড়ালগুলো আলাদা আবাসিক অংশে থাকলেও ল্যারি অফিস অংশেই নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
১০ ডাউনিং স্ট্রিটের রাস্তার হেঁটে যাচ্ছে ব্রিটিশ সরকারের অফিসিয়াল বিড়াল ল্যারি
বর্তমানে ল্যারির বয়স প্রায় ১৮ বা ১৯ বছর। বয়সের কারণে সে কিছুটা ধীর হয়ে গেলেও এখনও নিয়মিত নিজের এলাকা ঘুরে দেখে এবং প্রায়ই দাউনিং স্ট্রিটের কালো প্রধান দরজার কাছের উষ্ণ জায়গায় ঘুমাতে দেখা যায়। ব্রিটেনের সাধারণ মানুষের কাছে ল্যারি স্থিতিশীলতার এক প্রতীক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিটেনে ল্যারির জনপ্রিয়তা অনেক সময় বড় বড় নেতাদের চেয়েও বেশি। ইঁদুর ধরার দক্ষতা নিয়ে মতভেদ থাকলেও, রাজনীতির ব্যস্ত অঙ্গনে শান্ত উপস্থিতি বজায় রেখে ল্যারি এখন ব্রিটেনের সবচেয়ে পরিচিত সরকারি ‘অফিসিয়াল পোষা প্রাণী’ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। আর তাই ডাউনিং স্ট্রিটের এই বিশেষ সদস্যকে ছাড়া ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু কল্পনা করা এখন প্রায় অসম্ভব।