বাংলার কৃষি ঐতিহ্যে একসময় কাউন ছিল পরিচিত নাম। ছোট দানার এ শস্য দেখতে চালের মতো, কিন্তু আসলে এটি এক ধরনের মিলেট বা ক্ষুদ্র শস্য। এখন অবশ্য অনেকেই এর নামই শোনেননি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক ফসল ও বাজারনির্ভর কৃষির ভিড়ে কাউন চাল ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
একসময় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, নওগাঁ ও রাজশাহীর মাঠে কাউনের চাষ হতো ব্যাপকভাবে। শুকনো জমিতেও এই শস্য সহজে জন্মে, জল ও সার কম লাগে—তবু কৃষকরা এখন আর এটি ফলাতে আগ্রহী নন। এর পেছনের কারণটাও খুব বাস্তবসম্মত।
ধান, গম বা ভুট্টার মতো ফসলের ফলন বেশি, দাম তুলনামূলক ভালো, সরকারি সহায়তাও নিশ্চিত। ফলে কাউনের মতো প্রাচীন ফসলগুলো নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে।
শরীরের জন্য আশ্চর্য উপকারিতা
আজকের যুগে যখন সবাই ‘সুপারফুড’ খোঁজে, তখন কাউন চালের পুষ্টিগুণ শুনলে অবাক হতে হয়। এ শস্যে আছে প্রচুর প্রোটিন, খাদ্য আঁশ (ফাইবার), আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগ।
১. এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম — ফলে এটি রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ায়, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
২. ফাইবার ও ম্যাগনেসিয়াম হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে।
৩. লৌহসমৃদ্ধ হওয়ায় এটি রক্তাল্পতা দূর করতে সহায়ক।
৪. উচ্চ আঁশ থাকার কারণে হজমে সহায়ক, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে।
৫.সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এটি গ্লুটেন-মুক্ত। তাই গ্লুটেন অ্যালার্জি বা সিলিয়াক রোগে আক্রান্তদের জন্য নিরাপদ বিকল্প।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন আবার মিলেটকে আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে ‘মিলেট রেভল্যুশন’-এর ঢেউ উঠেছে, এমনকি ভারত ২০২৩ সালকে ‘আন্তর্জাতিক মিলেট বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
কাউনের বাহারি পদ
কাউন চাল দিয়ে নানা রকম খাবার তৈরি করা যায়—
- সাধারণ ভাতের মতো করে রান্না করে তরকারির সঙ্গে খাওয়া যায়। একসময় মঙ্গাপীরিত উত্তরাঞ্চলে সাদা চালের ভাতের পরিবর্তে কাউন চালের ভাত খাওয়া হতো।
- ডাল, সবজি ও হালকা মসলায় কাউন খিচুড়িও সুস্বাদু।
- দুধ, গুড় ও নারকেল যোগে বানানো কাউন পায়েস বাংলার মিষ্টানের ঐতিহ্য বহন করে।
- এ চাল গুঁড়ো করে রুটি, পিঠা বা ডোসা বানানো যায়। গ্লুটেন-মুক্ত খাবার হিসেবে শহুরে রেস্টুরেন্টগুলোতেও জনপ্রিয় হচ্ছে এ পদ।