কাফকা থেকে জীবনানন্দ— কেন নিজেদের সৃষ্টি লুকিয়ে রাখতে চাইতেন

প্রকাশের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি কাজকে স্থির করে দেয়। অপ্রকাশিত লেখা পরিবর্তনযোগ্য, বিকাশমান। যেসব শিল্পীরা তাদের কাজকে জীবন্ত, পরিবর্তনশীল বলে মনে করেন, তাদের কাছে প্রকাশ হওয়ার পরের স্থবিরতা অস্বস্তিকর হতে পারে।

সাহিত্য ভালোবাসেন আর না বাসেন, ফ্রান্ৎস কাফকার নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন? মৃত্যুর আগে বন্ধুকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি, যেন অপ্রকাশিত সব পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলা হয়। অথবা জীবনানন্দ দাশের কথাই ভাবুন। জীবদ্দশায় বেশিরভাগ লেখাই তিনি ট্রাংকের ভেতরে রেখে দিতেন, প্রকাশ করতে চাইতেন না। এমিলি ডিকসনের ঘটনাও অনেকটা এমন। যিনি জীবিত অবস্থায় হাতে গোনা কয়েকটি কবিতা প্রকাশ করেছিলেন, অথচ মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত হয় প্রায় আঠারো শত কবিতা।

স্বভাবগতভাবেই মানুষ তার নিজের যেকোনো সৃষ্টি কিংবা অর্জন উন্মোচিত করতে পছন্দ করে সেখানে কিছু মানুষ কেন নিজেকে আড়াল রাখতে চান? ভেবে দেখেছেন কখনো? এর পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক কিছু কারণ।

একান্ত ব্যক্তিগত প্রয়োজন

সৃজনশীল মানুষদের অনেকের ক্ষেত্রে লেখালেখি মূলত যোগাযোগের মাধ্যম নয়। বরং এক ধরনের অন্তর্গত প্রয়োজন। কাফকার ডায়েরি ইঙ্গিত দেয়, লেখালেখি ছিল তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক উপায়, এক ধরনের আত্মমুখী সংগ্রাম, যেখানে তিনি উদ্বেগ, নিঃসঙ্গতা সবকিছু নির্দ্বিধায় বলতে পারতেন। এমিলি ডিকিনসনের কবিতাগুলোর পড়লেই বোঝা যায় সেগুলো যেন নিজের সঙ্গেই এক অন্তরঙ্গ কথোপকথন। জীবনানন্দের কবিতাগুলোর বেশির ভাগই অন্তর্মুখী, নীরব, জনসমাজের জন্য নয়, বরং নিজের গভীর উপলব্ধির জন্য।

তারা লিখতেন পাঠকের জন্য নয়। বরং এক অভ্যন্তরীণ চাপ থেকে, যা না বললে থাকা যায় না। আবার কাউকে বলাও যায় না। নিজেদের কথা প্রকাশ করা মানেই তাদের মনে হত ব্যক্তিগতকে সামাজিক করে তোলা এবং সেটাই অনেক সময় ছিল তাদের কাছে অস্বস্তিকর।

আত্মসমালোচনা

এই ধরনের মানুষের মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো চরম আত্মসমালোচনা, যাকে মনোবিজ্ঞানে বলা হয় ম্যালঅ্যাডাপটিভ পারফেকশনিজম। কাফকা নিজের লেখাকে প্রায়ই অপূর্ণ, ব্যর্থ বা অপ্রতুল বলে মনে করতেন। তাই অসম্পূর্ণ কিছু প্রকাশ করার চেয়ে তিনি সেটিকে ধ্বংস করাই শ্রেয় মনে করতেন। ডিকিনসন তার কবিতা বারবার সংশোধন করতেন, সযত্নে গুছিয়ে রাখতেন, কিন্তু প্রকাশ করতেন না। জীবনানন্দের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।

জীবনানন্দ দাশ। ছবি: সংগৃহীত

ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ভুল ব্যাখ্যার ভয়। এ ধরনের মানুষরা স্বভাবতই জটিল চিন্তা করে। এবং জটিল ভাবনা সহজীকৃত হয়ে যেতে পারে, সূক্ষ্ম আবেগ হারিয়ে যেতে পারে এ ভয় তাদের ভেতরে তীব্রভাবে কাজ করে।

কাফকার অনেক রচনা বুঝতে মানুষের অনেক সময় লেগেছে। আর জীবনানন্দের চিত্রকল্প ছিল তার সময়ের পাঠকের কাছে অচেনা। একবার কোনো লেখা প্রকাশিত হলে তা আর পুরোপুরি লেখকের নিয়ন্ত্রণে থাকে না—পাঠকের ব্যাখ্যাই তখন প্রাধান্য পায়। আর এ ভয়টা তাদের এ ধরনের মানুষের ভেতরে প্রবলভাবে কাজ করে।

নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন

প্রকাশের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি কাজকে স্থির করে দেয়। অপ্রকাশিত লেখা পরিবর্তনযোগ্য, বিকাশমান। যেসব শিল্পীরা তাদের কাজকে জীবন্ত, পরিবর্তনশীল বলে মনে করেন, তাদের কাছে প্রকাশ হওয়ার পরের স্থবিরতা অস্বস্তিকর হতে পারে। তাই প্রকাশ এড়িয়ে যাওয়াটাকেই তারা শ্রেষ্ঠ উপায় মনে করেন।

কাফকার ডায়েরি। ছবি: সংগৃহীত

রোগ নয়, এক ধরনের মানসিক গঠন

এই প্রবণতাকে সহজভাবে ‘রোগ’ বলা যায় না। বরং এটি কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়। তীব্র আত্মসমালোচনা, উচ্চ সংবেদনশীলতা, জনসম্মুখে মূল্যায়নের অস্বস্তি, গভীর দার্শনিক সচেতনতা এ প্রবণতায় খুব শক্তভাবে কাজ করে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি প্রায়ই উচ্চ সৃজনশীলতা এবং আবেগগত তীব্রতার একটি সমন্বয়।

নিজের সৃষ্টিকে আড়াল করে রাখা কোনো ব্যর্থতার চিহ্ন নয়। বরং এটি এমন এক মানসিক গভীরতার প্রতিফলন, যেখানে মানুষ নিজেকে খুব তীক্ষ্ণভাবে অনুভব করে, এবং নিজের সৃষ্টির প্রতি অসীম দায়বদ্ধতা অনুভব করে। এ ধরনের মানুষ এক অদ্ভুত টানাপোড়েনে বাস করেন। তারা লেখেন কারণ না লিখে থাকা যায় না, আবার থেমে যান, কারণ প্রকাশের মূল্য তাদের জন্য বেশ চড়া।

আরও