সমুদ্রে ডলফিন ও কিলার হোয়েলের অদ্ভুত বন্ধুত্ব

বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ এ প্রকাশিত একটি রিসার্চে সমুদ্রে ডলফিন ও কিলার হোয়েল বা অর্কাদের এমন অদ্ভুত বন্ধুত্বের রহস্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

এ বন্ধুত্বে অর্কাদের লাভটা স্পষ্ট, সহজে খাবার পাওয়া। কিন্তু ডলফিনদের কী লাভ? ডলফিনরা মূলত বড় অর্কাদের সঙ্গে থেকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ওই এলাকায় অন্য এক ধরনের চঞ্চল অর্কা (ট্রানজিয়েন্ট অর্কা) ঘুরে বেড়ায়। তারা আবার ডলফিন শিকার করে খায়। কিন্তু ডলফিনরা যখন এই স্যালমনভোজী অর্কাদের সাথে থাকে, তখন অন্য হিংস্র অর্কারা আবার তাদের আক্রমণ করার সাহস করে না।

মাঝ সমুদ্রে বিশাল এক জাহাজের ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে ছোটবেলায় দেখা কোনো এক সিনেমার দৃশ্য মনে পড়ে যেতে পারে। যেন জাহাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লাফিয়ে চলছে একঝাঁক ডলফিন। ঐ সময়টায় বাবা যখন তার দীর্ঘ 'সী টাস্ক' শেষ করে ঘরে ফিরতেন, তার মুখে এমন গল্প শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে যেতাম। মনে হতো, বড় হয়ে আমিও মাঝ সমুদ্রে যাব আর ডলফিনদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করব। ভাগ্যের চাকা আমাকে সাংবাদিকতার টেবিলে বসিয়ে দিলেও, সমুদ্রের সেই রোমাঞ্চ আর ডলফিনদের প্রতি ভালোবাসা আজও অমলিন। আর তাই যখন সমুদ্রের ত্রাস হিসেবে পরিচিত ‘কিলার হোয়েল’ বা দাঁতালো তিমির সঙ্গে ডলফিনের বন্ধুত্বের গল্পের খোঁজ পাই, তখন সেই রোমাঞ্চ আরো বহুগুণে বেড়ে যায়।

জাহাজের সঙ্গে সাঁতারের প্রতিযোগিতায় এক ঝাঁক ডলফিন। এটা তাদের এক ধরনের খেলা। ছবি: সংগৃহীত

নীল পানিতে ডলফিন ও অর্কার মিতালি

প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী, সাগরের নীল পানিতে কিলার হোয়েল আর ডলফিনের হওয়ার কথা চিরশত্রু। কিন্তু সম্প্রতি ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উপকূলে বিজ্ঞানীদের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে এক অভাবনীয় দৃশ্য। সেখানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় সাদা-পার্শ্বযুক্ত ডলফিনদের দেখা যাচ্ছে বিশালদেহী উত্তর নিবাসী অর্কাদের সঙ্গে মিলেমিশে ঘুরে বেড়াতে। শুধু ঘুরে বেড়ানোই নয়, তারা রীতিমতো একে অপরকে সাহায্য করে শিকারও ধরছে। বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এ অদ্ভুত বন্ধুত্বের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে।

শিকারের খোঁজে একজোট

অর্কারা সাধারণত গ্রেট হোয়াইট শার্ক বা বিশালাকার তিমির যম হিসেবে পরিচিত। কিন্তু উত্তর নিবাসী এই বিশেষ অর্কা গোষ্ঠী মূলত স্যালমন মাছ খেয়ে জীবন ধারণ করে। ড্রোনের সাহায্যে পানির নিচের ক্যামেরা দিয়ে দেখা গেছে, অর্কারা ডলফিনদের পেছনে পেছনে গভীর সমুদ্রে ডুব দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখানে ডলফিনরা অর্কাদের জন্য অনেকটা ‘স্কাউট’ বা পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে। ডলফিনদের চমৎকার শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে শিকার শনাক্ত করার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে অর্কারা সহজেই স্যালমন মাছের সন্ধান পেয়ে যাচ্ছে। আর এভাবে প্রায় ১৯৬ ফুট গভীরে গিয়ে তারা একসঙ্গে স্যালমন শিকার করেছে।

ড্রোন ক্যামেরায় কিলার হোয়েল ও ডলফিনের একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য ধারণ করছেন হাকাই ইনস্টিটিউটের কিথ হোমস ও গবেষক ট্যারিন স্কার্ফ। ছবি: সিএনএন

পারস্পরিক স্বার্থের সমীকরণ

এ বন্ধুত্বে অর্কাদের লাভটা স্পষ্ট, সহজে খাবার পাওয়া। কিন্তু ডলফিনদের কী লাভ? ডলফিনরা মূলত বড় অর্কাদের সঙ্গে থেকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ওই এলাকায় অন্য এক ধরনের চঞ্চল অর্কা (ট্রানজিয়েন্ট অর্কা) ঘুরে বেড়ায়। তারা আবার ডলফিন শিকার করে খায়। কিন্তু ডলফিনরা যখন এই স্যালমনভোজী অর্কাদের সাথে থাকে, তখন অন্য হিংস্র অর্কারা আবার তাদের আক্রমণ করার সাহস করে না। এছাড়া অর্কারা স্যালমন খাওয়ার পর যে অবশিষ্টাংশ ফেলে দেয়, ডলফিনরা আবার সেগুলো খেয়ে নিজেদের উদরপূর্তি করে।

প্রশান্ত মহাসাগরের একটি সাদা-পার্শ্বযুক্ত ডলফিনকে সাঁতরাতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: সিএনএন

গবেষণার নতুন দিগন্ত

এ গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সারা ফরচুন। তিনি জানান, অর্কা ও ডলফিনের এ সমন্বয় তাদের আগের ধারণাকে একেবারেই বদলে দিয়েছে। আগে মনে করা হতো, ডলফিনরা হয়তো অর্কাদের বিরক্ত করে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তারা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। পানির নিচে রেকর্ড করা শব্দে স্যালমন মাছ ধরার পর সেই হাড়গোড় চিবিয়ে খাওয়ার শব্দ শোনা গেছে। এটি তাদের যৌথ শিকারের অকাট্য প্রমাণ দেয়।

সমুদ্রের বিশালতায় দুই ভিন্ন প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর বন্ধুত্ব আমাদের শেখায় যে, বেঁচে থাকার লড়াইয়ে চরম শত্রুও কখনো কাছের বন্ধু হয়ে উঠতে পারে। ডলফিনদের সেই জলকেলি আর অর্কাদের রাজকীয় উপস্থিতি আমাদের মানুষকে শেখায়, পৃথিবীটা কারো একার নয়। এখানে টিকে থাকতে হলে একসঙ্গেই সব প্রতিকূলতার বিপক্ষে লড়তে হবে।

—সিএনএন থেকে কিছু তথ্য নেয়া হয়েছে

আরও