ডেড সি বা মৃত সাগরের বুক চিরে ছুটে চলছিল একটি ছোট মোটরবোট। পানির রঙ কোথাও গভীর নীল, কোথাও সবুজাভ ফিরোজা। চারদিকে সাদা লবণের স্তর যেন জমাট বাঁধা বরফের ভাস্কর্য। নৌকার চালক জ্যাক বেন জাকেন দূরে পানির মধ্যে একটি কালচে দাগ দেখিয়ে বললেন, ওখানে নিচে তৈরি হয়েছে নতুন একটি সিংকহোল। কয়েক বছর আগেও জায়গাটি ছিল স্বাভাবিক জলরাশি। এখন ডেড সির বুকজুড়ে এমন অদ্ভুত পরিবর্তন প্রতিদিনের বাস্তবতা। পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু ভূমিতে অবস্থিত এ বিখ্যাত জলাধার দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কীভাবে তাকে বাঁচানো যায়, তা নিয়ে এখনো একমত হতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।
ইসরায়েল, জর্ডান ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের সংযোগস্থলে অবস্থিত ডেড সি বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর প্রাকৃতিক অঞ্চল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ফুট নিচে অবস্থিত এ জলাধার পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু স্থলভাগ হিসেবে পরিচিত। এর পানিতে লবণের পরিমাণ সাধারণ সাগরের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি। এত বেশি ঘনত্বের কারণে মানুষ খুব সহজেই পানির ওপর ভেসে থাকতে পারে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি পর্যটন, ধর্মীয় ইতিহাস, খনিজ সম্পদ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এখন সেই মৃত সাগরই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর মৃত সাগরের পানির স্তর প্রায় ৩ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। গত ৫০ বছরে এর আয়তন কমেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হচ্ছে বিশাল বিশাল সিংকহোল। গবেষকরা বলছেন, এটি শুধু একটি পরিবেশগত সংকট নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয়।
জ্যাক বেন জাকেন ১২ বছরের বেশি সময় ধরে পর্যটকদের নিয়ে ডেড সি বা মৃত সাগরে নৌ ভ্রমণ করান। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর তীররেখা আরো কয়েক মিটার করে সরে যাচ্ছে। আগে যেখানে পর্যটকরা সহজেই পানিতে নামতেন, এখন সেখানে শুকনো মাটি আর ফাটল।’ একসময় তার পর্যটন ব্যবসা পরিচালিত হতো মিনারেল বিচ নামের একটি জনপ্রিয় সৈকত থেকে। কিন্তু ২০১৫ সালে হঠাৎ সিংকহোল তৈরি হওয়ায় সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন তিনি অন্য একটি স্থান থেকে পর্যটক নিয়ে যান, কিন্তু সেখানেও ভয় রয়ে গেছে। প্রতিদিন সকালে সৈকতে এসে তিনি প্রথমে খুঁজে দেখেন নতুন কোনো গর্ত তৈরি হয়েছে কি না। কারণ একটি সিংকহোলই মুহূর্তে তার পুরো ব্যবসা ধ্বংস করে দিতে পারে।
পানি কমে যাওয়ার ফলে মৃত সাগরের রাসায়নিক গঠনও বদলে যাচ্ছে। গবেষকদের ভাষায়, পানিতে লবণের ঘনত্ব এত বেড়ে গেছে যে তা আর সম্পূর্ণ দ্রবীভূত অবস্থায় থাকতে পারছে না। ফলে সাগরের তলদেশে সাদা স্ফটিকের মতো লবণের স্তর জমছে। কোথাও তা চিমনির মতো, কোথাও মাশরুমের মতো আকৃতি নিচ্ছে। এগুলো দেখতে আকর্ষণীয় হলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, এগুলো মূলত একটি মৃত্যুপথযাত্রী জলাধারের লক্ষণ
মৃত সাগরের এ সংকটের পেছনে প্রধান কারণ মানবসৃষ্ট। মৃত সাগর আসলে একটি বিশাল লবণাক্ত হ্রদ। এর প্রধান পানির উৎস জর্ডান নদী। সিরিয়া-লেবানন সীমান্ত থেকে উৎপন্ন হয়ে নদীটি গ্যালিলি সাগর পেরিয়ে দক্ষিণে মৃত সাগরে গিয়ে মিশেছে। কিন্তু কয়েক দশক ধরে ইসরায়েল, সিরিয়া ও জর্ডান নদীটির পানি বাঁধ ও খাল নির্মাণের মাধ্যমে নিজেদের কৃষি, নগরায়ন ও পশুপালনের জন্য ব্যবহার করছে। ফলে মৃত সাগরে পৌঁছানো পানির পরিমাণ ভয়াবহভাবে কমে গেছে। একসময় বছরে প্রায় ১৩০ কোটি ঘনমিটার পানি মৃত সাগরে প্রবাহিত হতো। এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ১০ কোটি ঘনমিটারে।
আরেকটি বড় কারণ খনিজ উত্তোলন শিল্প। ১৯৭০-এর দশকের শেষদিকে মৃত সাগর দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। উত্তর অংশটি প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে টিকে থাকলেও দক্ষিণ অংশকে শিল্পাঞ্চলে রূপান্তর করা হয়েছে। ইসরায়েলের ডেড সি ওয়ার্কস ও জর্ডানের আরব পটাশ কোম্পানি মৃত সাগরের পানি পাম্প করে বাষ্পীভবন পুকুরে নিয়ে যায়। সেখানে সূর্যের তাপে পানি শুকিয়ে গেলে অবশিষ্ট লবণাক্ত খনিজ থেকে পটাশ, ম্যাগনেশিয়ামসহ বিভিন্ন শিল্প উপাদান সংগ্রহ করা হয়। এ শিল্প মৃত সাগরের পানির স্তর দ্রুত কমিয়ে দিচ্ছে।
দেখতে সুন্দর হলেও জমাটবদ্ধ এ লবণের স্তর একটি মৃত্যুপথযাত্রী জলাধারের লক্ষণ
জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে। খরা দীর্ঘ হচ্ছে, বৃষ্টিপাত কমে যাচ্ছে, তাপমাত্রা বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও মৃত সাগর ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যেত, তবে মানুষের হস্তক্ষেপ সেই প্রক্রিয়াকে বহুগুণ দ্রুত করেছে। ওয়েইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের ভূ-রসায়নবিদ ইয়ায়েল কিরো বলেন, ‘বর্তমান সংকটের পেছনে মানুষের ভূমিকা সবচেয়ে বড় হলেও জলবায়ু পরিবর্তন এটিকে আরো ত্বরান্বিত করছে।’
মৃত সাগরকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা বহু বছর ধরে আলোচনায় রয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত পরিকল্পনাগুলোর একটি ছিল লোহিত সাগর থেকে পানি এনে মৃত সাগরে প্রবাহিত করা। ২০১৩ সালে জর্ডান, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরও করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জর্ডানের উপকূলে একটি বিশাল লবণমুক্তকরণ কারখানা নির্মাণ করে সেখান থেকে উৎপন্ন অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পাইপলাইনের মাধ্যমে মৃত সাগরে আনা হতো
পানি কমে যাওয়ার ফলে মৃত সাগরের রাসায়নিক গঠনও বদলে যাচ্ছে। গবেষকদের ভাষায়, পানিতে লবণের ঘনত্ব এত বেড়ে গেছে যে তা আর সম্পূর্ণ দ্রবীভূত অবস্থায় থাকতে পারছে না। ফলে সাগরের তলদেশে সাদা স্ফটিকের মতো লবণের স্তর জমছে। কোথাও তা চিমনির মতো, কোথাও মাশরুমের মতো আকৃতি নিচ্ছে। এগুলো দেখতে আকর্ষণীয় হলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, এগুলো মূলত একটি মৃত্যুপথযাত্রী জলাধারের লক্ষণ।
তবে সবচেয়ে ভয়ংকর পরিবর্তন ঘটছে সিংকহোলের মাধ্যমে। মৃত সাগরের পানি সরে যাওয়ার ফলে মাটির নিচে থাকা প্রাচীন লবণের স্তরে মিঠাপানি প্রবেশ করছে। এতে লবণ গলে ভূগর্ভে ফাঁপা গহ্বর তৈরি হচ্ছে। একসময় ওপরের মাটি ধসে বিশাল গর্ত তৈরি হয়। এসব সিংকহোল হঠাৎ করেই সৃষ্টি হয় এবং আগে থেকে বোঝার সুযোগ প্রায় নেই। বর্তমানে মৃত সাগরের চারপাশে ৬ হাজারের বেশি সিংকহোল তৈরি হয়েছে। এগুলো পর্যটন, ব্যবসা, রাস্তা ও বসতিকে হুমকির মুখে ফেলছে।
মৃত সাগরকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা বহু বছর ধরে আলোচনায় রয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত পরিকল্পনাগুলোর একটি ছিল লোহিত সাগর থেকে পানি এনে মৃত সাগরে প্রবাহিত করা। ২০১৩ সালে জর্ডান, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরও করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জর্ডানের উপকূলে একটি বিশাল লবণমুক্তকরণ কারখানা নির্মাণ করে সেখান থেকে উৎপন্ন অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পাইপলাইনের মাধ্যমে মৃত সাগরে আনা হতো।
কিন্তু এ পরিকল্পনা ঘিরে বিতর্কও রয়েছে। অনেক পরিবেশবিদ আশঙ্কা করছেন, ভিন্ন রাসায়নিক গঠনের পানি মৃত সাগরে প্রবেশ করলে শৈবাল বৃদ্ধি, পানির রং পরিবর্তন বা সাদা জিপসাম স্ফটিক তৈরি হতে পারে। আবার প্রকল্পটির ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার হওয়ায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে সেটি এখন কার্যত স্থবির হয়ে আছে।
আরেকটি প্রস্তাব হলো জর্ডান নদীকে পুনরুজ্জীবিত করা। নদীতে আরো বেশি পানি প্রবাহ নিশ্চিত করলে মৃত সাগরও কিছুটা পুনরুদ্ধার হতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এ শুষ্ক অঞ্চলে পানি এত মূল্যবান যে মানুষকে বিকল্প না দিয়ে নদীর জন্য পানি ছেড়ে দেয়া প্রায় অসম্ভব। জর্ডানের সাবেক পানিমন্ত্রী হাজিম এল-নাসের বলেন, ‘মানুষের প্রয়োজন মেটানোর বিকল্প না থাকলে এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন।’
কিছু পরিবেশবিদ আবার সরাসরি শিল্পকারখানাগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, খনিজ উত্তোলনের জন্য মৃত সাগরের পানি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তবে অন্যরা বলছেন, পুরো শিল্প বন্ধ করা সম্ভব নয়, কারণ এটি হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্রীয় আয়ের সঙ্গে জড়িত। তাই অন্তত পানির ব্যবহার কমানো উচিত।
ইসরায়েলের পরিবেশবাদী আইনজীবী মেইরাভ আবাদি বলেন, ‘মৃত সাগরের পানি ব্যবহার করে যেসব প্রতিষ্ঠান লাভ করছে, সেই অর্থের একটি অংশ আবার মৃত সাগর রক্ষায় ব্যয় করা উচিত। যদি মানুষ এ জলাধার থেকে আয় করতে পারে, তবে সেটিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্বও তাদের নিতে হবে।’
ডেড সি ওয়ার্কস পরিচালনাকারী আইসিএল গ্রুপ জানিয়েছে, তারা বছরে প্রায় ১৬ কোটি ঘনমিটার পানি ব্যবহার করে এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার নতুন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, বাস্তবে এখনো কার্যকর কোনো বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক জরুরিতার অভাব। সবাই জানে মৃত সাগর ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে, কিন্তু তা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য, অর্থায়ন ও সমন্বয় এখনো তৈরি হয়নি। অনেকেই মনে করেন, মৃত সাগরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত এর পতন অন্তত স্থিতিশীল করা।