ওয়েলসের তেল বিপর্যয়ের ৩০ বছর

যে বিপর্যয় বদলে দিয়েছিল বিশ্বকে

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এই বিশালা জাহাজটি পেমব্রোকেশায়ারের মিলফোর্ড হ্যাভেন জলপথের প্রবেশমুখে পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আটকে যায়। এই দুর্ঘটনার ফলে প্রায় ৭২ হাজার টন অপরিশোধিত তেল সমুদ্রে মিশে কালো হয়ে গিয়েছিল

তিন দশক আগে যুক্তরাজ্যের ওয়েলস উপকূলে ঘটে যাওয়া ‘সি এমপ্রেস’ নামক অপরিশোধিত জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের দুর্ঘটনা আজও বিশ্ববাসীকে পরিবেশগত বিপর্যয়ের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এই বিশালা জাহাজটি পেমব্রোকেশায়ারের মিলফোর্ড হ্যাভেন জলপথের প্রবেশমুখে পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আটকে যায়। এই দুর্ঘটনার ফলে প্রায় ৭২ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সমুদ্রে মিশে কালো হয়ে গিয়েছিল। এতে প্রাণ হারায় হাজার হাজার সামুদ্রিক পাখি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় গুরুত্বপূর্ণ জলজ জীববৈচিত্র্য যা ব্রিটেনের ইতিহাসে অন্যতম বড় পরিবেশগত বিপর্যয় হিসেবে পরিচিত।

তৎকালীন সংবাদের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিরল সামুদ্রিক পাখিদের অভয়ারণ্য স্কোমার ও স্কোকহোম দ্বীপের ঠিক পাশেই মিলফোর্ড হ্যাভেনে 'সি এমপ্রেস' জাহাজটি আটকা পড়েছিল।

৩০ বছর আগের সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এক সময়ের মনোরম সোনালি সমুদ্র সৈকতটি রাতারাতি ঘন কালো আঠালো তেলের স্তরে ঢেকে গিয়েছিল। এই বিপর্যয়ে হাজার হাজার সামুদ্রিক পাখি প্রাণ হারায় এবং উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল একটি দুর্ঘটনাই ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ‘সতর্কবার্তা’। এই বিপর্যয়ের পরেই আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা এবং পরিবেশ রক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়নে ‘ওয়েক-আপ কল’ বা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছে।

২৭৪ মিটার লম্বা এই জাহাজটি যখন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, তখন উদ্ধারকাজ শুরু করতে গিয়ে কালবৈশাখীর মতো প্রচণ্ড ঝড় আর ঢেউয়ের মুখে পড়তে হয় উদ্ধারকারীদের। টানা এক সপ্তাহ ধরে উদ্ধার কাজ চললেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে জাহাজটি থেকে জ্বালানি তেল নিঃসরণ ঠেকানো সম্ভব হয়নি। ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় ৭২ হাজার টনের বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সাগরে ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রায় ২০০ কিলোমিটার উপকূল মারাত্মকভাবে দূষিত হয়। এটি ছিল যুক্তরাজ্যের একমাত্র উপকূলীয় জাতীয় উদ্যান, যেখানে রয়েছে ৩৫টি ‘বিশেষ সংরক্ষিত এলাকা’ বা ‘পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা’ (এসএসএসআই), একটি সামুদ্রিক প্রকৃতি সংরক্ষণাগার এবং বেশ কিছু দ্বীপ, যা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পাখিদের অন্যতম প্রধান আবাসস্থল।

আন্তর্জাতিক প্রাণী কল্যাণ দাতব্য সংস্থা আরএসপিসিএ মিলফোর্ড হেভেনের একটি পুরোনো শিল্প ভবনে অস্থায়ী হাসপাতালের ব্যবস্থা করেছিল, যেখানে তেল থেকে উদ্ধার করা পাখিগুলোকে এনে পরিচর্যা ও পরিষ্কার করা হতো।

পরিবেশবাদীরা সেই সময়ের ভয়াবহ বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, সাগরের পানিতে ভাসমান তেলের স্তরে আটকে পড়া পাখিরা আর উড়তে পারছিল না। উদ্ধারকর্মীরা প্রায় ৭ হাজার তেলযুক্ত মৃত পাখি উদ্ধার করেছিলেন, তবে প্রকৃত সংখ্যাটি ছিল এর চেয়েও অনেক বেশি। পেমব্রোকেশায়ারের মৎস্য শিল্প এই ঘটনার কারণে টানা ১৮ মাস বন্ধ ছিল। পাথুরে উপকূলের স্টারফিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী তেলের স্তরে দমবন্ধ হয়ে মারা গিয়েছিল।

পরবর্তীতে তদন্তে উঠে আসে, জাহাজটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা চালকের অভিজ্ঞতার অভাব ছিল এবং বন্দরের রাডার ব্যবস্থাও কয়েক মাস ধরে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এই অবহেলার দায়ে মিলফোর্ড হ্যাভেন বন্দর কর্তৃপক্ষকে সে সময়ে ৫৪ লাখ ৫৮ হাজার ৩৬৬ ডলার (৪০ লাখ পাউন্ড) জরিমানা করা হয়েছিল, যা ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ইতিহাসে পরিবেশ দূষণের দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি। এ ঘটনার পর জনরোষ এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর চাপের মুখে জাহাজ চলাচল শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

সি এমপ্রেস দুর্ঘটনার পরই বিশ্বজুড়ে ‘ডাবল-হাল’ বা দ্বি-স্তর বিশিষ্ট তেলবাহী জাহাজ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার প্রক্রিয়া গতি পায়, যাতে ধাক্কা লাগলেও তেল সহজে বাইরে না আসতে পারে। এছাড়া জরুরি অবস্থায় জাহাজ টেনে নেয়ার আধুনিক প্রযুক্তি এবং পরিবেশগত ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়ার আন্তর্জাতিক কাঠামো আরো শক্তিশালী করা হয়।

সি এমপ্রেস নামক তেলবাহী জাহাজের দুর্ঘটনা সেসময় ‘ওয়েক-আপ কল’ বা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছে।

তবে বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘনঘন শক্তিশালী ঝড় এবং সাগরে জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় আবারো এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা দেশগুলোর জন্য ব্যবহৃত অননুমোদিত বা ‘ডার্ক ফ্লিট’ জাহাজগুলো আধুনিক নিয়ম নীতি মানে না, যা সমুদ্রের জন্য বড় হুমকি।

ওয়েলসের মানুষ মনে করেন, এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। সমুদ্রের পরিবেশ রক্ষা যে কতটা জরুরি এবং সামান্য অবহেলায় কত বড় মূল্য দিতে হতে পারে, তা এই ঘটনা বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ৩০ বছর পর এসেও এই কাহিনী বারবার বলা প্রয়োজন যাতে মানুষ অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

বিবিসি অবলম্বনে

আরও