গ্রীষ্মকালীন মার্কিন বক্স অফিসে রীতিমতো ঝড় তুলে দিয়েছে বড় দুই রিলিজ ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ ও ‘দ্য ওডিসি’। ওপেনিং উইকেন্ড’সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিনেমাগুলো নতুন নতুন রেকর্ড গড়েছে। ফুলেফেঁপে উঠছে প্রযোজকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট।
বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, আয় বাড়লেও সিনেমা শিল্পের এ পুনরুদ্ধারের মূল চালিকা শক্তি এখন আর দর্শকসংখ্যা নয়। বরং টিকিটের বাড়তি দাম, আইম্যাক্সের মতো প্রিমিয়াম ফরম্যাটের প্রদর্শনী এবং হাতে গোনা কয়েকটি ব্লকবাস্টার সিনেমেই পাচ্ছে এ অর্থের বেশির ভাগ। ফলে কভিড মহামারীর পর চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের বক্স অফিস আয় সর্বোচ্চ হওয়ার পথে থাকলেও সিনেমা হলে দর্শকের সংখ্যা আগের তুলনায় কমে গেছে।
পরবর্তী বড় বাজেটের সিনেমাগুলো এ বছরের এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে পারে কিনা, সেটিই হলিউডের জন্য বড় পরীক্ষা। কারণ আগের তুলনায় কম মানুষ সিনেমা হলে গেলেও তারা বেশি দাম দিয়ে টিকিট কিনছেন।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ৩০ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ৪৭ কোটি ৯ লাখ টিকিট বিক্রি হয়েছে। একই সময়ে ২০১৯ সালে বিক্রি হয়েছিল ৭৪ কোটি ৭৩ লাখ টিকিট।
সংস্থাটির বিশ্লেষক ওয়েড হোলডেন বলেন, মূলত অনেক দিন ধরেই টিকিটের গড় মূল্য বৃদ্ধি এবং খাবার-দাবারের দাম বাড়ার কারণে সিনেমা হলগুলোর আয় বাড়ছে।
ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক নয় ‘অবসেশন’ ও ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’র মতো সফল সিনেমাও চলতি বছর হলিউড বক্স অফিসের প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে
’অবসেশন’ চলচ্চিত্রের দৃশ্য
ফুট ট্রাফিক বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান প্লেসার ডট এআই-এর তথ্যেও একই চিত্র দেখা গেছে। জুলাই পর্যন্ত হিসাবে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সিনেমা হলে দর্শক উপস্থিতি ২০২৫ সালের তুলনায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু ২০১৯ সালের তুলনায় এখনো ২৭ শতাংশ কম।
ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক নয় ‘অবসেশন’ ও ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’র মতো সফল সিনেমাও চলতি বছর হলিউড বক্স অফিসের প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। মিডিয়া বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান রেন্ট্রাকের তথ্যানুযায়ী, ২ আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বক্স অফিস আয় ৬২০ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। তবে ২০১৯ সালের একই সময়ে আয় ৭০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মার্ভেল বা স্টার ওয়ার্সের মতো জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজির সিক্যুয়েলগুলোই বক্স অফিসে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তবে চলতি বছর সর্বাধিক আয় করা সিনেমাগুলোর মধ্যে মৌলিক বা স্বতন্ত্র গল্পের সিনেমার হিস্যাও বেড়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দর্শক এখন আরো বৈচিত্র্যময় সিনেমা দেখতে আগ্রহী।
টিকিট বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ফ্যান্ডাঙ্গোর চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক এবং বক্স অফিস থিওরির প্রতিষ্ঠাতা শন রবিনস বলেন, বৈচিত্র্যময় সিনেমা সূচির কারণেই এ বছরের বক্স অফিসে সাফল্য এসেছে। এতে প্রায় সব ধরনের দর্শকের জন্যই কিছু না কিছু রয়েছে।
গ্রীষ্মকালীন বড় মুক্তি ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ এবং ক্রিস্টোফার নোলানের হোমারের মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত ‘দ্য ওডিসি’ মহামারীর পর মার্কিন প্রদর্শকদের অন্যতম সেরা ব্যবসা এনে দিয়েছে। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের আইম্যাক্স প্রদর্শনীগুলো প্রায় পুরোপুরি বুকড ছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় স্ট্রিমিং পরিষেবার বিস্তৃত সিনেমা হলের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কভিড মহামারীর দর্শক রুচির পরিবর্তনকেও আরো গতিশীল করেছে। এখন অনেক দর্শক শুধুমাত্র বড় আয়োজনের সিনেমা বা জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজির ছবি দেখতেই হলে যান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মার্ভেল বা স্টার ওয়ার্সের মতো জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজির সিক্যুয়েলগুলোই বক্স অফিসে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তবে চলতি বছর সর্বাধিক আয় করা সিনেমাগুলোর মধ্যে মৌলিক বা স্বতন্ত্র গল্পের সিনেমার হিস্যাও বেড়েছে
বছরের অন্যতম সফল চলচ্চিত্র ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’
এই প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিনেমা হলগুলো বড় পর্দার প্রিমিয়াম ফরম্যাট বাড়ানো এবং হলের দর্শক অভিজ্ঞতা উন্নত করার দিকে জোর দিয়েছে। তাদের আশা— ঘরে বসে টেলিভিশনে যে অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় না, সেই অভিজ্ঞতার জন্য দর্শক বেশি অর্থ দিতে রাজি হবেন।
এর প্রাথমিক ফল ইতিবাচক। বিশ্বের বৃহত্তম সিনেমা হল চেইন এএমসি এন্টারটেইনমেন্ট জানিয়েছে, প্রিমিয়াম পর্দার উচ্চ চাহিদার কারণে তাদের ১০৬ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ এক সপ্তাহান্তের আয় হয়েছে এ গ্রীষ্মে। একই সঙ্গে এটি ছিল গত এক দশকের সর্বোচ্চ দর্শকসমাগমের সপ্তাহান্ত। ওই সময়ে এএমসি ও ওডিয়ন হলগুলোতে এক কোটি দুই লাখের বেশি দর্শক সিনেমা দেখেছেন।
মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ব্যয় কিছুটা সীমিত হলেও বাড়তি টিকিটমূল্য বড় স্টুডিওগুলোর জন্য লাভজনক হয়েছে। রেন্ট্রাকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের মোট বক্স অফিস আয়ের ৬৮ শতাংশই এসেছে ইউনিভার্সাল, ওয়াল্ট ডিজনি, সনি, ওয়ার্নার ব্রাদার্স এবং প্যারামাউন্ট পিকচার্স—এই পাঁচ বড় স্টুডিওর সিনেমা থেকে।
হলিউডে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে নিয়ন্ত্রকদের উদ্বেগও বাড়ছে। ক্যালিফোর্নিয়াসহ ১২টি অঙ্গরাজ্য ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের চুক্তিতে প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি অধিগ্রহণ ঠেকাতে মামলা করেছে। রেন্ট্রাকের হিসাবে, এই একীভূতকরণ হলে নতুন প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের যুক্তরাষ্ট্রের বক্স অফিস আয়ের প্রায় ১১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত।
‘দ্য ওডিসি’ ও ‘দ্য সুপার মারিও গ্যালাক্সি মুভি’র মতো সিনেমার সাফল্যে ইউনিভার্সালের বাজার অংশীদারত্ব বেড়ে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, হাতে গোনা কয়েকটি ব্লকবাস্টার সিনেমাই ক্রমশ সিনেমা হলগুলোর আর্থিক সাফল্যের প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠছে।
এন্টটেলিজেন্সের তথ্যানুযায়ী, ৩০ জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে একজন প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকের গড় টিকিট মূল্য ছিল ১৩ ডলার ৪৬ সেন্ট। আর আইম্যাক্সের মতো প্রিমিয়াম ফরম্যাটের গড় টিকিট মূল্য ছিল ১৮ ডলার ২২ ডলার সেন্ট।
রয়টার্স অবলম্বনে