পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে কমিয়ে ফেলতে হবে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক!

বিজ্ঞানীদের প্রস্তাব, কোনো জোরপূর্বক ব্যবস্থা নয়; বরং শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, স্বেচ্ছাসেবী পরিবার পরিকল্পনা ও দেরিতে বিয়ের মতো সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যমে আগামী ২২০০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা ধীরে ধীরে ৮০০ কোটির বেশি থেকে ৪০০ কোটি বা তার নিচে নামানো সম্ভব। তাদের দাবি, এতে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল পুনরুদ্ধার হবে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সহজ হবে, গ্রিনহাউস গ্যাস ও দূষণ কমবে, প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে সংঘাত হ্রাস পাবে এবং বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্যও কমবে বলে আশা করা যায়।

‘অ্যাভেঞ্জার্স: ইনফিনিটি ওয়ার’ সিনেমাটির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? সেখানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও সম্পদের ঘাটতি সামলাতে এক তুড়িতে পৃথিবীর অর্ধেক জীব বিলীন করে দিয়েছিলেন ভিলেন ‘থানোস’। সিনেমার থানোস খলনায়ক হলেও বাস্তব পৃথিবীর পরিবেশ সংকট মোকাবেলায় বিজ্ঞানীরা এবার প্রায় একই রকম এক পরামর্শ নিয়ে হাজির হয়েছেন।

তবে কোনো অলৌকিক ক্ষমতা বা এক তুড়িতে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে নয়, বিজ্ঞানীরা বলছেন আগামী দুই শতাব্দী ধরে ধীরগতিতে ও ন্যায়সংগতভাবে পৃথিবীর জনসংখ্যা অর্ধেক কমিয়ে আনা সম্ভব হলে ঘুরে দাঁড়াবে আমাদের এই ধরণী।

সম্প্রতি ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। এতে বলা হয়েছে, মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণেই আজ বিশ্বজুড়ে পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। তাই আগামী ২২০০ সালের মধ্যে পৃথিবীর বর্তমান ৮৩০ কোটি জনসংখ্যাকে ধীরে ধীরে কমিয়ে ৪০০ কোটিতে নামিয়ে আনা গেলে পৃথিবী অনেক বেশি বাসযোগ্য ও টেকসই হয়ে উঠবে।

গবেষকদের মতে, গত কয়েকশ বছরে মানুষের গড় আয়ু ও জীবনযাত্রার মান বেড়েছে, কমেছে শিশু মৃত্যুর হার। কিন্তু এই ইতিবাচক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর জনসংখ্যা ১৯২০ সালের ২০০ কোটি থেকে লাফিয়ে আজকের ৮৩০ কোটিতে পৌঁছেছে। বর্তমানে বছরে প্রায় ০.৮৫ শতাংশ হারে মানুষ বাড়ছে। সেই সঙ্গে উচ্চ আয়ের দেশের মানুষেরা নিম্ন আয়ের দেশের তুলনায় জনপ্রতি ১৩ গুণ বেশি শক্তি ব্যবহার করছে। অতিরিক্ত এই মানুষের খাদ্যের যোগান ও সম্পদ ব্যবহারের চাপ আর নিতে পারছে না পৃথিবী।

ছবি: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

তাই বিজ্ঞানীদের দল স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, পৃথিবীর প্রতিটি পরিবেশগত সংকটের পেছনে মূল ভূমিকা মানুষের। তাই জনসংখ্যা ও সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কমানো ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার আর কোনো উপায় নেই।

তারা জানিয়েছেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ করা যাবে, কমানো যাবে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে সম্ভাব্য বৈশ্বিক সংঘাত।

তবে কৃত্রিমভাবে নয়, বরং শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমেই এই জনসংখ্যা কমানোর স্বপ্ন দেখছেন বিজ্ঞানীরা। উদাহরণ হিসেবে ভারতের কেরালা রাজ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় তিন দশক আগে উচ্চশিক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন, দেরিতে বিয়ে ও পরিবার পরিকল্পনার সুযোগ বাড়িয়ে কেরালা তাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনে। ফলস্বরূপ এক সময়ের দরিদ্র এই রাজ্যটি বর্তমানে ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, একইভাবে অনেক দেশেই জনসংখ্যা কমার পাশাপাশি মানুষের মাথাপিছু আয় ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীর প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, বন্যপ্রাণী ও জলবায়ু রক্ষায় মানবজাতিকে এখন সচেতন হতে হবে। জনসংখ্যাকে যৌক্তিকভাবে ৮০০ কোটি থেকে ৪০০ কোটিতে নামিয়ে এনে একটি সুস্থ, সুন্দর ও দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব উপহার দেয়ার সুযোগ এখন মানুষের হাতের মুঠোয় রয়েছে।

—দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে

আরও