স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও কম্পিউটার আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রযুক্তি শুধু মানসিক নয়, শরীরের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা ঘাড়ের গঠন পরিবর্তন, দৃষ্টিশক্তির অবনতি, হাতের শক্তি কমে যাওয়া এবং সূক্ষ্ম কাজ করার মতো দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিবিসির একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, ফোন ব্যবহারের সময় মাথা নিচু করে রাখার অভ্যাস থেকে তৈরি হয় ‘টেক নেক’। এ অবস্থায় ঘাড়ের ওপর প্রায় ২৭ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। দীর্ঘদিন এমন ভঙ্গিতে থাকলে মেরুদণ্ডের ডিস্ক, জয়েন্ট ও পেশিতে ক্ষতি হতে পারে, এমনকি ফুসফুসের সক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, ফোন বা কম্পিউটারের স্ক্রিন চোখের সমতলে রাখা এবং নিয়মিত বিরতি নেয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ঘাড় ভাঁজ করে থাকার কারণে ত্বকে বলিরেখাও পড়তে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে সারাক্ষণ স্মার্টওয়াচ পরে থাকলে ত্বকে ঘাম জমে ছত্রাক সংক্রমণ, অ্যালার্জি বা একজিমার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত ঘড়ি খুলে ত্বক পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
দৃষ্টিশক্তির ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির অপটোমেট্রি বিভাগের অধ্যাপক ডোনাল্ড মুত্তি জানান, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, কাছ থেকে স্ক্রিন দেখাই একমাত্র কারণ নয়; বরং বাইরে কম সময় কাটানোই মায়োপিয়া বা দূরের জিনিস ঝাপসা দেখার ঝুঁকি বাড়ায়। বাইরে প্রাকৃতিক আলো চোখের বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিদিন কিছু সময় খোলা পরিবেশে থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
হাতের শক্তিও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে কমে যেতে পারে। গবেষকদের মতে, গ্রিপ শক্তি মানুষের সামগ্রিক শারীরিক সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এটি কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আরো জানান, দীর্ঘ সময় বসে কম্পিউটারভিত্তিক কাজ এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ। নিয়মিত ব্যায়াম ও হাতের শক্তি বাড়ানোর অনুশীলন এ ঝুঁকি কমাতে পারে।
এছাড়া প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার হাতের সূক্ষ্ম ও নিখুঁত কাজ করার দক্ষতা কমিয়ে দিতে পারে। জার্মানির রেগেন্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সেবাস্টিয়ান সুগেট বলেন, স্ক্রিন ব্যবহারে ক্লিক বা সোয়াইপ করার দক্ষতা বাড়লেও হাতের সূক্ষ্ম নড়াচড়া ও সমন্বয় ক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি দেখা যায়, যা তাদের জ্ঞানগত ও শিক্ষাগত বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, প্রযুক্তি পুরোপুরি পরিহার করার প্রয়োজন নেই। বরং দৈনন্দিন জীবনে রান্না, ছবি আঁকা, বাদ্যযন্ত্র চর্চা, কাঠের কাজ বা হাতে লেখার মতো বাস্তবভিত্তিক কাজ বাড়ানো উচিত। পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা, বাইরে সময় কাটানো এবং সঠিক ভঙ্গিতে স্ক্রিন ব্যবহার করলে প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব।