গলির মুখে ফিরতেই ছুটে আসে কুকুরটি। আপনি হাসছেন, নাকি মন খারাপ- কিছু না বললেও যেন সে বুঝে ফেলে। মানুষ এবং অন্যান্য বন্য প্রাণীর বিবর্তনের ধারা আলাদা হলেও সামাজিকভাবে সংস্পর্শে আসার পর থেকে মানুষের সঙ্গে চলাফেরা ও যোগাযোগের বিশেষ সামাজিক ক্ষমতা অর্জন করেছে কুকুর।
এতদিন পর্যন্ত এসব পোষা প্রাণীর মালিকদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে মনে করা হতো। কিন্তু এবার তার পেছনে বৈজ্ঞানিক প্রমাণেরও সন্ধান মিলেছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মুখের অভিব্যক্তি দেখে কুকুরের মস্তিষ্কে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কার্যকলাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে আমাদের হাসিমুখ কুকুরের মস্তিষ্কের ইতিবাচক আবেগের সঙ্গে যুক্ত অংশকে সক্রিয় করে।
গবেষকরা মনে করেন, বাস্তবে একটি কুকুর মানুষের পুরো শরীরের ভাবভঙ্গি, কণ্ঠস্বর ও গায়ের গন্ধ শুঁকেও তার আবেগ সঠিকভাবে অনুভব করতে পারে।
ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক কুকুরের মস্তিষ্কের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এ তথ্য পেয়েছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘আইসায়েন্স’-এ।
হাসিমুখে কেন আলাদা প্রতিক্রিয়া?
প্রথম ধাপে ৮টি কুকুরকে মস্তিষ্কের স্ক্যান করা হয়। দলে ছিল ৬টি বর্ডার কলি, ১টি ল্যাব্রাডর ও ১টি গোল্ডেন রিট্রিভার। তাদের অপরিচিত মানুষের হাসিমুখ ও স্বাভাবিক মুখের ছবি দেখানো হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, হাসিমুখ দেখার সময় কুকুরের মস্তিষ্কের টেম্পোরাল কর্টেক্স ও কডেট নিউক্লিয়াসে কার্যকলাপ বেড়ে যায়। মস্তিষ্কের এ দুটি অংশ উচ্চতর চিন্তাপ্রক্রিয়া ও পুরস্কার অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক লরা কুয়ায়ার মতে, এর অর্থ হতে পারে অপরিচিত মানুষের হাসিও কুকুরের কাছে ইতিবাচক আবেগের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে কডেট নিউক্লিয়াসের সক্রিয়তা গবেষকদের কাছে ছিল উল্লেখযোগ্য। কুকুরের ক্ষেত্রে এ অংশ খাবারের পুরস্কারের পাশাপাশি প্রশংসার শব্দ শোনা বা পরিচিত মানুষের গন্ধ পাওয়ার মতো সামাজিক পুরস্কারের সঙ্গেও যুক্ত।
রাগ, ভয় ও দুঃখও কি বোঝে?
গবেষকরা এরপর ১২টি কুকুরের ওপর আরো বিস্তৃত পরীক্ষা চালান। তাদের সুখী, রাগান্বিত, ভীত ও দুঃখী মানুষের মুখের ছবি দেখানো হয়। মস্তিষ্কের কার্যক্রম বিশ্লেষণে যন্ত্রশিক্ষা পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়।
দেখা যায়, সুখী মুখের ক্ষেত্রে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, রাগ, ভয় বা দুঃখের মুখে ঠিক একই প্রতিক্রিয়া হয়নি। তবে পুরো মস্তিষ্কের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে নেতিবাচক আবেগের প্রতিটি ধরনের মুখের জন্য আলাদা আলাদা কার্যকলাপের ধরন দেখা গেছে।
গবেষণার প্রথম লেখক রাউল হার্নান্দেজ-পেরেজ বলেন, মানুষ যেমন মুখের ক্ষুদ্র পরিবর্তনও সহজে ধরতে পারে, কুকুরও তেমনটি করতে সক্ষম। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের সঙ্গে বসবাস ও গৃহপালনের মধ্য দিয়ে তাদের সামাজিক ও আবেগগত সংকেত বোঝার ক্ষমতা গড়ে উঠেছে বলে ধারণা করছেন গবেষকরা।
শুধু মুখ নয়, আরো অনেক কিছু
তবে গবেষকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, বাস্তব জীবনে কুকুর মানুষের আবেগ বোঝার জন্য শুধু মুখের দিকে তাকায় না। শরীরের ভঙ্গি, কণ্ঠস্বর এমনকি গন্ধও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
গবেষণায় অংশ নেয়া কুকুরগুলোও ছিল মানুষের ভালোবাসায় বেড়ে ওঠা পোষা প্রাণী। ফলে রাস্তায় থাকা বা মানুষের সঙ্গে কম যোগাযোগ থাকা কুকুর একইভাবে মানুষের সংকেত বুঝবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
গবেষণায় অংশ নেয়া কুকুর বাছাই ও প্রশিক্ষণও ছিল বেশ কঠিন। তাদের মাঝারি আকারের হতে হয়েছে, যাতে মস্তিষ্কের স্ক্যানের যন্ত্রে জায়গা হয়। পাশাপাশি তাদের সুস্থ এবং অতিরিক্ত শব্দভীতির মতো আচরণগত সমস্যা না থাকাও জরুরি ছিল।
গবেষণার সীমাবদ্ধতাও আছে
গবেষণায় কুকুরের সংখ্যা ছিল খুবই কম। আবার অংশ নেয়া প্রাণীদের বেশির ভাগই ছিল বর্ডার কলি ব্রিড্রের। অর্থাৎ এরা ছিল মানুষের সামাজিক সংকেত অনুসরণে দক্ষ একটি জাত। তাই অন্য জাতের কুকুর একইভাবে মানুষের মুখের অভিব্যক্তি বোঝে কি না, তা জানতে আরো বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষক লরা কুয়ায়া ও রাউল হার্নান্দেজ-পেরেজ ব্যক্তিগত জীবনেও সঙ্গী। তাদের নিজেদের দুই কুকুর— ওডিন ও কুন-কুন এ গবেষণায় অংশ নিয়েছে।
—সিএনএন, ইয়াহু নিউজ ও সাইন্স ডেইলি থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে