বিষ্ময়কর প্রাণী আর্কটিক গ্রাউন্ড স্কুইরেল বা মেরু অঞ্চলের কাঠবিড়ালি। তীব্র শীতপ্রধান অঞ্চলের বৈরী প্রকৃতিতে টিকে থাকতে বছরের একটি বড় সময় এরা কাটায় মাটির নিচে, গভীর ঘুমে। তবে এটি সাধারণ কোনো ঘুম নয়; বিজ্ঞানীদের মতে, কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর পক্ষে এর চেয়ে কম তাপমাত্রায় বেঁচে থাকা অসম্ভব। এ অলৌকিক শীতনিদ্রার রহস্য উন্মোচন করতে পারলে বদলে যেতে পারে মানবদেহের জরুরি চিকিৎসাসেবা, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের চিকিৎসা, এমনকি দূরপাল্লার মহাকাশ অভিযানের ভবিষ্যৎও।
বরফশীতল ঘুম ও প্রকৃতির বিস্ময়
আগস্টের শেষভাগে যখন মেরু অঞ্চলের দিন ছোট হয়ে আসে, তখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করে নারী আর্কটিক গ্রাউন্ড স্কুইরেল। শীতের দীর্ঘ অবসাদের জন্য শরীরে চর্বি জমাতে ঘাস, লতাগুল্ম ও পাতা খেয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে। এরপর মাটির প্রায় এক মিটার গভীরে নিজের সুড়ঙ্গে প্রবেশ করে দীর্ঘ ও গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
মাটির নিচে ঘুমন্ত প্রাণীর শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দন এতটাই কমে যায় যে, বাইরে থেকে একে মৃত বলে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। ওপরের মাটি যখন জমে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তখন এ কাঠবিড়ালির শরীরের তাপমাত্রাও হু হু করে কমতে থাকে। আশ্চর্যজনকভাবে, এ অবস্থায় তার মস্তিষ্কের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি, পেটের তাপমাত্রা মাইনাস ২ ডিগ্রি এবং পেছনের পায়ের তাপমাত্রা মাইনাস ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায়। কোনো জীবিত স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে এটিই এ যাবৎকালের রেকর্ডকৃত সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। দীর্ঘ আটটি মাস কোনো খাবার ও পানি ছাড়াই অবলীলায় এরা কাটিয়ে দেয় এই হিমাঙ্কের নিচের সুষুপ্তিতে।
ছবি: সারা রাইস
মানব চিকিৎসায় বিপ্লবের সম্ভাবনা
ইউনিভার্সিটি অব আলাস্কা ফেয়ারব্যাংকসের বিজ্ঞানীরা ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাণীটির ওপর গবেষণা করছেন। গবেষকদের মতে, মানুষের বিপাক প্রক্রিয়া (মেটাবলিজম) যদি এভাবে নিরাপদে ধীর করে দেয়া যায়, তবে তা চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।
- জরুরি চিকিৎসায় সময়ক্ষেপণ: স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক বা মস্তিষ্কের গুরুতর আঘাতের পর চিকিৎসকেরা রোগীকে বাঁচানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় পান না। কৃত্রিম উপায়ে বিপাক প্রক্রিয়া ধীর করা গেলে ভাইটাল অর্গান বা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে অক্সিজেনহীনতা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
- অঙ্গ প্রতিস্থাপন ও ক্যানসার চিকিৎসা: মানবদেহের প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গগুলোকে শরীরের বাইরে দীর্ঘক্ষণ সতেজ রাখতে এবং ক্যানসার রোগীদের রেডিয়েশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচাতে এ পদ্ধতি ভূমিকা রাখতে পারে।
- যুদ্ধক্ষেত্র ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে জীবনরক্ষা: যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিক বা হাসপাতাল থেকে দূরে থাকা স্ট্রোকের রোগীদের বাঁচিয়ে রাখতে এ সাময়িক সুষুপ্তি ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা জীবনরক্ষাকারী সময় বাড়িয়ে দেবে। এ কারণেই মার্কিন সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা দপ্তর এই গবেষণায় অর্থায়ন করছে।
হাইবারনেশনের আণবিক রহস্য ও ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা
যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, ‘অ্যাডেনোসিন’ নামের একটি প্রাকৃতিক অণু কাঠবিড়ালিদের এ ঘুমের জন্য দায়ী। তারা ল্যাবরেটরিতে এ অণুর সমজাতীয় একটি রাসায়নিক কাঠবিড়ালির মস্তিষ্কে পুশ করে কৃত্রিমভাবে তাদের হাইবারনেশন বা শীতনিদ্রা মোড সক্রিয় করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে দেখা যায়, এ রাসায়নিকের প্রভাবে তাদের শরীরের তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি থেকে ২৮ ডিগ্রিতে নেমে আসে এবং তাদের মস্তিষ্কের তরঙ্গ ও হৃৎস্পন্দন হুবহু হাইবারনেটিং কাঠবিড়ালির মতো আচরণ করে।
নতুন থেরাপির সন্ধান: থার্মোরেগুলেটরি ইনভার্সন
সরাসরি মানুষের মস্তিষ্কে ইনজেকশন দেয়া ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিজ্ঞানীরা বিকল্প উপায় খুঁজছেন। বিজ্ঞানী টুপোনে ইঁদুরের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের একটি নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের গুচ্ছ সাময়িকভাবে ব্লক করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। সাধারণত এই অংশটি শরীরকে কাঁপুনির মাধ্যমে উষ্ণ রাখে। কিন্তু এটিকে ব্লক করলে শরীরের পুরো তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উল্টে যায়, যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন"থার্মোরেগুলেটরি ইনভার্সন। এর ফলে শরীর নিজে থেকেই তাপমাত্রা কমিয়ে দেয় এবং বিপাক প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। মানুষের মধ্যেও এই সার্কিট থাকলে ভবিষ্যতে ওষুধের মাধ্যমে কৃত্রিম শীতনিদ্রা তৈরি করা সম্ভব হবে।
ছবি: সারা রাইস
মানব ট্রায়াল ও অন্যান্য ওষুধের সম্ভাবনা
হাইবারনেশন থেকে জেগে ওঠার পর যখন শরীরে হঠাৎ রক্ত ও অক্সিজেন ফিরে আসে, তখন সাধারণ প্রাণীদের কোষে মারাত্মক প্রদাহ ও ক্ষতি হয়। কিন্তু আর্কটিক গ্রাউন্ড স্কুইরেল এই ক্ষতি অনায়াসে প্রতিরোধ করতে পারে। ২০২০ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, শীতনিদ্রার সময় এদের রক্তে 'আয়োডাইড'-এর মাত্রা তিন গুণ বেড়ে যায়, যা কোষকে রক্ষা করে।
এই সূত্র ধরে বিজ্ঞানী মার্ক রথ এবং তার প্রতিষ্ঠান 'ফ্যারাডে ফার্মাসিউটিক্যালস' ২০২২ সালে মানুষের ওপর একটি দ্বিতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। হার্ট অ্যাটাকের পর এনজিওপ্লাস্টি করা রোগীদের ওপর আয়োডাইড-ভিত্তিক ওষুধ প্রয়োগ করে দেখা গেছে, তাদের হৃৎপিণ্ডের ক্ষতি ও ধকল অনেক কম হয়েছে।
এছাড়া, এই কাঠবিড়ালিরা আট মাস শুয়ে থেকেও কীভাবে পেশির ক্ষয় রোধ করে, তা নিয়ে গবেষণা করছেন সারা রাইস। এটি দীর্ঘমেয়াদে বিছানায় থাকা অবশ রোগীদের পেশি সুরক্ষায় ওষুধ তৈরিতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে, শীতনিদ্রার ঠিক আগে এদের অতিরিক্ত ক্ষুধা এবং শীতনিদ্রার সময় ক্ষুধা পুরোপুরি দমে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি স্থূলতা বা ওবেসিটি নিয়ন্ত্রণের ওষুধ তৈরিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
মহাকাশ অভিযানের স্বপ্ন
ভবিষ্যতের দূরপাল্লার মহাকাশ মিশনে নভোচারীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে নাসাও কেলি ড্রিউ-এর এ গবেষণায় অর্থায়ন করছে। নভোচারীদের যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য এমন কৃত্রিম সুষুপ্তিতে রাখা যায়, তবে মহাকাশযানে খাবারের প্রয়োজন ও বর্জ্যের পরিমাণ কমবে। একই সঙ্গে শূন্য মহাকর্ষে পেশির ক্ষয় রোধ এবং মহাশূন্যের ক্ষতিকর বিকিরণ বা রেডিয়েশন থেকে নভোচারীদের রক্ষা করা সম্ভব হবে। এমনকি ক্ষুদ্র মহাকাশযানে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার মানসিক ধকল থেকেও এটি মুক্তি দেবে।
বিবিসি অবলম্বনে