জিলাপির যত মারপ্যাচ

জিলাপির দক্ষিণ এশিয়ায় আগমনের ইতিহাসও সমৃদ্ধ। দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতকে ‘সুফিবাদ’ নামে যে আধ্যাত্মিক ইসলামী ধারাটি বিকশিত হয়েছিল, তার সঙ্গে এই মিষ্টির যাত্রা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। সুফি আলেম, দরবেশ ও ভ্রাম্যমাণ সাধকেরা পারস্য, মধ্য এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশে ঘুরে খানকাহ ও দরগাহ প্রতিষ্ঠা করতেন।

মুড়িমাখায় আপনি জিলাপির পক্ষে নাকি বিপক্ষে? এ নিয়ে তর্ক-বিতর্কের কোনো শেষ নেই। বিশ্বে খুব কম মিষ্টান্নই আছে, যাকে নিয়ে এত বিতর্ক, যার ইতিহাস এত দীর্ঘ, সমৃদ্ধ আর বিস্তৃত। পৃথিবীতে প্রায় শ'খানেক আর শুধুমাত্র বাংলাদেশেই প্রায় ২০ রকমের জিলাপি তৈরি হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ মিষ্টি সাম্রাজ্য, ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং বাণিজ্যপথ অতিক্রম করে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ভ্রমণ করেছে। দীর্ঘ যাত্রাপথে এটি ধীরে ধীরে বদলেছে, গ্রহণ করেছে নতুন স্বাদ ও রূপ। আজ আমরা জানবো জনপ্রিয় এ মিষ্টান্নে আদ্যোপান্ত।

জিলাপির জন্ম

জিলাপির সবচেয়ে প্রাচীন পরিচিত সূত্র পাওয়া যায় দশম শতকের আরবীয় রন্ধনপুস্তক কিতাব আল-তাবিখে (খাবারের বই)। আব্বাসীয় খিলাফতের সময় সংকলিত এ রেসিপি-সংগ্রহে মিষ্টি ‘জালাবিয়া’ এর উল্লেখ আছে, যা আজকের জিলাপির সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়।

মধ্যযুগের বাগদাদের রান্নাঘরে রাঁধুনিরা গমের ময়দা ও ইস্ট দিয়ে পাতলা ব্যাটার তৈরি করতেন, যা গরম তেলের মধ্যে ঢেলে সর্পিল আকারে ভাজা হতো। সোনালি ও মচমচে হওয়া মাত্র তা মধু, চিনি এবং কখনো কখনো গোলাপজল দিয়ে তৈরি সিরায় ডুবানো হতো। সেই সময় চিনি ছিল বিরল ও বিলাসবহুল, যা মূলত রাজকীয় রান্নাঘরে ব্যবহার হতো। তাই জালাবিয়া পরিবেশিত হতো রাজদরবারের ভোজ, ধর্মীয় উৎসব ও শীতকালীন আনন্দে। ইরাক ও সিরিয়া থেকে এটি ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। পারস্যে পরিচিতি পায় 'জুলবিয়া' নামে, যা আজও ইরানে রমজানের বাজারে দেখা যায়।

জিলাপি ও সুফিদের সাংস্কৃতিক বিনিময়

জিলাপির দক্ষিণ এশিয়ায় আগমনের ইতিহাসও সমৃদ্ধ। দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতকে ‘সুফিবাদ’ নামে যে আধ্যাত্মিক ইসলামী ধারাটি বিকশিত হয়েছিল, তার সঙ্গে এ মিষ্টির যাত্রা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। সুফি আলেম, দরবেশ ও ভ্রাম্যমাণ সাধকেরা পারস্য, মধ্য এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশে ঘুরে খানকাহ ও দরগাহ প্রতিষ্ঠা করতেন। এ স্থানগুলো কেবল ধর্মীয় শিক্ষা ও সাধনার কেন্দ্রই ছিল না, বরং মানুষের মিলনস্থলও ছিল, যেখানে ধর্মীয় আলোচনা আর সম্মিলিতভাবে খাবার ভাগ করার সামাজিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল।

সেই সুফি কেন্দ্রগুলোয় মিষ্টি বিশেষ গুরুত্ব পেত। আনন্দ, বরকত ও উদারতার প্রতীক হিসেবে মিষ্টি পরিবেশন করা হতো ধর্মীয় সমাবেশ বা মিলাদের সময়। সিরায় ভেজানো ভাজা মিষ্টির মধ্যে জুলবিয়ার মতো রূপ ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। সুফি সাধকেরা যখন দিল্লি, বঙ্গ ও দাক্ষিণাত্যে পৌঁছান, তারা শুধু ধর্মীয় অনুশীলনই নয়, সঙ্গে নিয়ে আসেন খাদ্যসংস্কৃতির নানা উপাদানও। এ পথে ধীরে ধীরে জিলাপি দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক জীবনে প্রবেশ করে।

ভারতীয় উপমহাদেশে জিলাপির আগমন

তেরো ও চৌদ্দ শতকের মধ্যে এ মিষ্টান্ন প্রবেশ করে ভারতীয় উপমহাদেশের রন্ধনসংস্কৃতিতে দিল্লি সুলতানতের দরবারে কর্মরত পারস্যভাষী বণিক, সৈন্য ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উত্তর ভারতের বিভিন্ন শহরে এ মিষ্টিকে জনপ্রিয় করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

মধ্যযুগীয় ভারতীয় সাহিত্যেও এর উপস্থিতির স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। পঞ্চদশ শতকের একটি জৈন গ্রন্থ 'প্রিয়মকরনৃপকথা'য় (Priyamkarnrpakatha) জিলাপির উল্লেখ আছে একটি বিশেষ উপাদেয় মিষ্টি হিসেবে, যা রাজকীয় বা বৃহৎ ভোজসভায় পরিবেশন করা হতো। ষোড়শ শতকে এসে সংস্কৃত ভাষায় রচিত 'গুণ্যগুণবোধিনী'র (Gunyagunabodhini) মতো গ্রন্থেও এমন রেসিপির বর্ণনা পাওয়া যায়- যা আধুনিক জিলাপির সঙ্গে অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ।

পরবর্তীকালে মুঘল শাসনামলে এ মিষ্টির জনপ্রিয়তা আরো বৃদ্ধি পায়। মুঘল রান্নাশৈলী ছিল পারস্য, মধ্য এশিয়া এবং ভারতীয় রন্ধনপ্রণালীর এক অনন্য মিশ্রণ। জিলাপি এ সংমিশ্রিত খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে খুব সহজেই মানিয়ে যায়।

বাংলায় জিলাপির আগমন

ধীরে ধীরে বাংলায় জিলাপির বিস্তার ঘটে প্রথম মুসলিম প্রশাসনের মাধ্যমে। তেরো শতকের পর বাংলা মুসলিম শাসকগোষ্ঠী এবং পরে মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। ঢাকা, মুর্শিদাবাদ, সোনারগাঁওয়ের মতো শহরগুলো মুঘল স্বাদের প্রভাবিত প্রাণবন্ত খাদ্যসংস্কৃতি গড়ে তোলে। সিরায় ভেজানো মিষ্টি ক্রমে জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং জিলাপি তার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই স্থান করে নেয়। অষ্টাদশ ও উনিশ শতকে বাংলার শহরগুলোতে ব্যস্ত বাজার অর্থনীতি গড়ে ওঠে। মিষ্টির দোকানগুলো জনসাধারণের জন্য নানা ধরনের মিষ্টি তৈরি করতে শুরু করে। সহজে বানানো যায় এমন এবং আকর্ষণীয় জিলাপি শহরের রাস্তার মিষ্টিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় এর উচ্চারণও পরিবর্তিত হয়। পারস্য-আরবি 'জালেবি' ক্রমে হয়ে যায় 'জিলাপি' বা 'জিলিপি'।

ভুল থেকে যে জিলাপির জন্ম

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জিলাপি বাংলাদেশে অসংখ্য রূপে বিবর্তিত হয়েছে। খাদ্য ইতিহাসবিদ এবং খাবার লেখকরা প্রায়ই ১৫–২০টি স্বতন্ত্র ধরনের জিলাপি চিহ্নিত করেন। সর্বাধিক পরিচিত এবং জনপ্রিয় জিলাপিগুলো হল- শাহী জিলাপি যা পুরান ঢাকার রমজানের বাজারের বিশাল সর্পিল মিষ্টি। বোম্বাই জিলাপি, পাতলা খাস্তা জিলাপি, ছানার জিলাপি, গুড়ের জিলাপি, দুধের জিলাপি, রাবড়ি জিলাপি, মসলাযুক্ত জিলাপি, ময়মনসিংহের টক জিলাপি। বাংলাদেশের বিভিন্ন জিলাপির মধ্যে এ ময়মনসিংহের টক জিলাপি সম্ভবত সবচেয়ে ব্যতিক্রমী। সাধারণ জিলাপি যেখানে সম্পূর্ণ মিষ্টি স্বাদের হয়, সেখানে এ মিষ্টির সঙ্গে হালকা টক স্বাদও মিলিত হয়। স্থানীয় গল্প অনুযায়ী, কয়েক দশক আগে একজন স্থানীয় ময়রা বাসি ব্যাটার দিয়ে একবার জিলাপি তৈরি করেছিলেন। ব্যাটার বাসি হওয়ায় তার স্বাদ একটু টক হয়েছিল। কিন্তু মানুষের তা এত ভালো লেগে যায় যে এরপর থেকে ময়মনসিংহের এ জিলাপী পুরো বাংলাদেশে খ্যাতি লাভ করে। মূলত একটি ভুল থেকেই এ জিলাপির জন্ম।

মধ্যযুগীয় আরবি রেসিপি থেকে শুরু করে ঢাকার ব্যস্ত ইফতার বাজার পর্যন্ত, জিলাপির যাত্রা হাজার বছরেরও বেশি বিস্তৃত এটি ভাষা, সাম্রাজ্য ও ধর্ম অতিক্রম করেছে, প্রতিটি নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলেছে। তাই হয়ত আজও এ মিষ্টান্ন নিয়ে এত আলোচনা।

আরও