ভারতীয় সিনেমায় নতুন ফর্মুলায় দ্বৈত চরিত্র— একই নায়কের ভেতরে দুই ব্যক্তিত্বের সংঘাত

আগের সিনেমায় দ্বৈত চরিত্র মানেই ছিল—দুই মানুষ। একজন ভালো, অন্যজন খারাপ; একজন অতীতের, অন্যজন বর্তমানের; একজন হারিয়ে গেছে, অন্যজন তাকে খুঁজে পেয়েছে। নতুন সিনেমায় এসে সমীকরণটা বদলে যাচ্ছে। এখন একই অভিনেতার দুই চরিত্র অনেক সময় হয়ে উঠছে একই মানুষের দুই সত্তা, দুই সময় কিংবা দুই মানসিক জগতের প্রতিচ্ছবি

ভারতীয় সিনেমার পর্দায় দ্বৈত চরিত্র নতুন কিছু নয়। একসময় ‘কুম্ভমেলায় হারিয়ে যাওয়া দুই ভাই’ কিংবা একই চেহারার নায়ক ও খলনায়কের চেনা ছকেই আটকে ছিল এর ব্যবহার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পুরোনো ফর্মুলারও বদল ঘটেছে। এখন একই অভিনেতার দুই চরিত্র শুধু গল্পের চমক নয়; বরং পৌরাণিকতা, সময়ের ভিন্ন স্তর, প্রজন্মের সংঘাত এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা প্রকাশেরও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

সত্তর থেকে নব্বইয়ের দশকে ‘রাম আউর শ্যাম’, ‘সীতা অউর গীতা’ কিংবা ‘ডন’-এর মতো বলিউডি ছবিতে দ্বৈত চরিত্রের রোমাঞ্চ তৈরি হয়েছে মূলত পরিচিত কিছু ছকে—শৈশবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দুই ভাই-বোনের ভুল বোঝাবুঝি ও প্রতিশোধ, অথবা অন্যায়ের শিকার বাবার অসমাপ্ত লড়াইয়ে একই চেহারার সন্তানের ফিরে আসা। দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমাতেও একই ধরনের গল্প বহুবার বক্স অফিসে সাফল্য পেয়েছে।

‘সীতা আউর গীতা’ চলচ্চিত্রে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন হেমা মালিনী

এক টিকিটে প্রিয় নায়ককে কখনো শান্ত, কখনো দুর্ধর্ষ; কখনো নিরীহ, কখনো প্রতিশোধপরায়ণ—দুই ভিন্ন অবতারে দেখার এ আকর্ষণই প্রজন্মের পর প্রজন্ম দর্শককে হলে টেনেছে। নব্বইয়ের দশক পেরিয়ে ২০০০-এর দশকেও এই ফর্মুলার আবেদন কমেনি। ‘কহো না... পেয়ার হ্যায়’-এ হৃতিক রোশনের রোহিত ও রাজ—দুই চরিত্রের মাধ্যমে দ্বৈত ভূমিকা আবারো বড় পর্দায় তারকা-আকর্ষণের অন্যতম উপাদান হয়ে উঠেছিল।

তবে আজকের প্যান-ইন্ডিয়ান সিনেমার যুগে সেই পুরনো কৌশল নতুন অর্থ পাচ্ছে। দ্বৈত চরিত্র এখন আর শুধু গল্পের টুইস্ট নয়; অনেক ক্ষেত্রে পুরো সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ভাষাই হয়ে উঠছে।

আগের সিনেমায় দ্বৈত চরিত্র মানেই ছিল—দুই মানুষ। একজন ভালো, অন্যজন খারাপ; একজন অতীতের, অন্যজন বর্তমানের; একজন হারিয়ে গেছে, অন্যজন তাকে খুঁজে পেয়েছে। নতুন সিনেমায় এসে সমীকরণটা বদলে যাচ্ছে। এখন একই অভিনেতার দুই চরিত্র অনেক সময় হয়ে উঠছে একই মানুষের দুই সত্তা, দুই সময় কিংবা দুই মানসিক জগতের প্রতিচ্ছবি।

এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হতে পারে রণবীর কাপুর।

সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গার ‘অ্যানিমেল পার্ক’-এ রণবীরকে একই সঙ্গে রণবিজয় ও আজিজের দুই মেরুর চরিত্রে দেখা যাবে। ‘অ্যানিমেল’-এর উন্মত্ততা থেকে ‘অ্যানিমেল পার্ক’-এর আরো অন্ধকার জগতে এই দ্বৈত চরিত্র রণবীরের নিজেরই এক বিকল্প সত্তার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে। এখানে দ্বৈততা শুধু গল্পের প্রয়োজন নয়; চরিত্রের ভেতরের হিংসা, ক্ষমতা ও পরিচয়ের সংঘাতকেও আরও তীব্র করে তুলছে।

‘কাহো না... পেয়ার হ্যায়’ সিনেমায় আমিশা প্যাটেলের বিপরীতে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন হৃতিক রোশান

আর একই সময়ে রণবীর সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে প্রবেশ করছেন নিতীশ তিওয়ারির ‘রামায়ণ’-এ। সেখানে তিনি ভগবান রামের পাশাপাশি পরশুরামের চরিত্রেও অভিনয় করছেন। দুজনই বিষ্ণুর অবতার হলেও তাদের স্বভাব ও উপস্থিতির মধ্যে রয়েছে তীব্র বৈপরীত্য। একজনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধৈর্য, সংযম ও ন্যায়বোধ; অন্যজনের পরিচয়ে রয়েছে ক্রোধ, তেজ ও প্রতিশোধের প্রবল আবেগ।

ফলে ‘রামায়ণ’-এ দ্বৈত চরিত্রের অর্থ আরো বিস্তৃত। একই অভিনেতার দুই চেহারা নয়, একই পৌরাণিক ধারার দুই ভিন্ন শক্তি ও মানসিকতাকে একই শরীরে ধারণ করছেন একজন অভিনেতা। অর্থাৎ দ্বৈত চরিত্র এবার গল্পের কৌশল থেকে বেরিয়ে চরিত্রের দর্শনেও প্রবেশ করছে।

এখানে রণবীরের ক্যারিয়ারের দুই ছবিকে পাশাপাশি রাখলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। ‘অ্যানিমেল পার্ক’-এ তিনি একই মানুষের হিংস্র ও অন্ধকার দুই সম্ভাবনার মুখোমুখি হচ্ছেন; আর ‘রামায়ণ’-এ একই অভিনেতা ধারণ করছেন সংযম ও রুদ্রতার দুই পৌরাণিক রূপ। একদিকে আধুনিক অপরাধজগত, অন্যদিকে মহাকাব্যিক দেবত্ব—দুই ক্ষেত্রেই দ্বৈততা হয়ে উঠছে চরিত্রের গভীরতা তৈরির মাধ্যম।

এই পৌরাণিক বিস্তার আবার অন্য রূপে হাজির হচ্ছে এস এস রাজামৌলির ‘বারাণসী’-তে। ছবিতে মহেশ বাবু অভিনয় করছেন রুদ্র চরিত্রে—এক আন্তর্জাতিক অ্যাডভেঞ্চারের কেন্দ্রে থাকা এক আধুনিক অভিযাত্রী। ছবিটির প্রচার-সামগ্রীতে রুদ্রর সঙ্গে পৌরাণিক ইঙ্গিতের যে যোগ তৈরি করা হয়েছে, তাতে বোঝা যায় আধুনিক অ্যাকশন ও অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গে ভারতীয় পুরাণের সম্পর্কও নতুনভাবে নির্মিত হচ্ছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারতীয় সিনেমা এখন পৌরাণিক চরিত্রকে শুধু অতীতের গল্প হিসেবে ব্যবহার করছে না। বরং সেই মিথকে আধুনিক অ্যাডভেঞ্চার, অ্যাকশন ও আন্তর্জাতিক পরিসরের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছে। ‘রামায়ণ’-এ পৌরাণিক সময়ের ভেতর দুই ভিন্ন অবতারকে একই অভিনেতার মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে; ‘বারাণসী’-তে পৌরাণিক অনুষঙ্গ ঢুকে পড়ছে আধুনিক অ্যাডভেঞ্চারের জগতে।

অর্থাৎ সময়ের ব্যবধান যতই থাকুক, ভারতীয় সিনেমার নির্মাতারা এখন পুরাণকে অতীতের বন্দী করে রাখতে চাইছেন না। বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের গল্পের সঙ্গে তার নতুন সংযোগ তৈরি করছেন। আর এই সংযোগ তৈরির ক্ষেত্রেও একজন অভিনেতার একাধিক রূপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এই ধারার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—দ্বৈততা এখন শুধু একই সময়ের দুই চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সেখানে যুক্ত হচ্ছে প্রজন্মের ব্যবধান।

‘টক্সিক: আ ফেয়ারি টেল ফর গ্রোন-আপস’-এ যশের চরিত্রকে ঘিরে যে অন্ধকার ও মনস্তাত্ত্বিক আবহ তৈরি হয়েছে, তাতে পারিবারিক সম্পর্ক, ক্ষমতা ও পরিচয়ের সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অন্যদিকে ‘সরদার ২’-এ কার্তির চরিত্রে দুই প্রজন্মের উপস্থিতি দ্বৈততার ধারণাটিকে অন্য মাত্রা দেয়। প্রবীণ গোয়েন্দা সরদার এবং তার ছেলে বিজয় প্রকাশ—একজন অভিজ্ঞতার প্রতীক, অন্যজন নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি। ফলে একই গল্পে অতীত ও বর্তমানের সংঘাতও হয়ে ওঠে নাটকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

‘জওয়ান’ সিনেমায় বাবা-ছেলে দুই ভূমিকায় অভিনয় করেন শাহরুখ খান

এখানে দ্বৈত চরিত্র আর শুধু ‘ডাবল রোল’ নয়। বরং দুই প্রজন্মের চিন্তাধারা, মূল্যবোধ ও কাজের ধরনকে পাশাপাশি দাঁড় করানোর কৌশল। একজন চরিত্র যা জানে, অন্যজন তা জানে না; একজন যে পৃথিবীতে বড় হয়েছে, অন্যজন তার সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায় বেড়ে উঠেছে। একই অভিনেতার উপস্থিতি তাই শুধু দর্শকের চমক তৈরি করছে না, বরং গল্পের ভেতরে সময়ের দূরত্বও দৃশ্যমান করছে।

দ্বৈততার এই বিস্তার আরও এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে সায়েন্স ফিকশন ও মহাজাগতিক কল্পনার দিকে। ‘জওয়ান’-এর সাফল্যের পর অ্যাটলি ও অল্লু অর্জুনের ‘রাকা’ নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেখানে একাধিক রূপ বা সত্তার ব্যবহার শুধু পারিবারিক সংঘাত কিংবা অতীতের ছায়া হিসেবে নয়, বৃহত্তর রহস্য ও ভবিষ্যৎ-নির্ভর গল্পের অংশ হিসেবেও হাজির হতে পারে।

অর্থাৎ ভারতীয় সিনেমায় দ্বৈত চরিত্রের পরিসর এখন একাধিক জঁর পেরিয়ে যাচ্ছে—পারিবারিক নাটক থেকে গ্যাংস্টার সিনেমা, স্পাই-থ্রিলার থেকে পৌরাণিক মহাকাব্য, সেখান থেকে সায়েন্স ফিকশন। জঁর বদলালেও একটি জায়গায় মিল থাকছে—একজন তারকার একাধিক সত্তাকে গল্পের কেন্দ্রে নিয়ে আসা।

এর পেছনে অবশ্যই তারকাখ্যাতির একটি বাণিজ্যিক হিসাব আছে। একজন মেগাস্টারকে এক চরিত্রে দেখার চেয়ে দুই বা একাধিক রূপে দেখার আকর্ষণ এখনও দর্শকের কাছে বড়। বিশেষ করে প্যান-ইন্ডিয়ান সিনেমার যুগে, যখন বড় বাজেটের ছবিকে শুধু একটি অঞ্চলের দর্শক নয়, একাধিক ভাষা ও বাজারের দর্শকের কাছে পৌঁছাতে হয়, তখন তারকার বহুরূপী উপস্থিতি বাড়তি আগ্রহ তৈরি করে।

‘অ্যানিমেল পার্ক’ চলচ্চিত্রে নায়ক-খলনায়ক দু্ই ভূমিকায় থাকবেন রণবীর কাপুর

কিন্তু শুধু বাণিজ্যিক চমক দিয়ে এই প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ বর্তমানের বড় ছবিগুলোতে দ্বৈত চরিত্র অনেক বেশি পরিকল্পিতভাবে গল্পের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। একজন অভিনেতার দুই চরিত্রের মধ্যে শুধু চেহারার মিল থাকছে না; তৈরি হচ্ছে সময়, স্মৃতি, পরিচয়, উত্তরাধিকার ও মানসিকতার সম্পর্ক।

এই জায়গাতেই নতুন দিনের ভারতীয় সিনেমার দ্বৈত চরিত্রের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ধরা পড়ে।

আগে প্রশ্ন ছিল—কে আসল, কে নকল? কে ভালো, কে খারাপ? কে হারিয়ে গেছে, আর কে ফিরে এসেছে?

এখন প্রশ্ন অনেক বেশি জটিল—একজন মানুষ কি একই সঙ্গে একাধিক সত্তা ধারণ করতে পারে? একই শরীরে কি দুটি সময়, দুটি প্রজন্ম কিংবা দুটি দর্শনকে ধারণ করা সম্ভব? একটি চরিত্রের ছায়া কি অন্য চরিত্রের ভেতর দিয়ে নতুন অর্থ পেতে পারে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই যেন ভারতীয় সিনেমা আবার ফিরে যাচ্ছে দ্বৈত চরিত্রের কাছে—তবে পুরোনো ছক নিয়ে নয়, নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে।

রণবীরের রাম ও পরশুরাম, ‘অ্যানিমেল পার্ক’-এর রণবিজয় ও আজিজ, মহেশ বাবুর রুদ্র কিংবা নতুন প্রজন্মের অ্যাকশন ও স্পাই ইউনিভার্সে তৈরি হওয়া বিভিন্ন চরিত্র—সব মিলিয়ে একই প্রবণতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ভারতীয় মেগাস্টাররা এখন আর শুধু একটি চরিত্রের গল্প বলছেন না; তারা একই শরীরে একাধিক সত্তা, সময় ও জগতকে ধারণ করছেন।

ফলে দ্বৈত চরিত্রের পুরোনো বাণিজ্যিক চমক হয়তো হারিয়ে যায়নি। বরং সেটিই এখন হয়ে উঠছে আরো বড় এক সিনেমাটিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার অংশ—যেখানে নায়ক বনাম খলনায়কের লড়াইয়ের চেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে একই নায়কের ভেতরের দুই পৃথিবীর সংঘাত।

আরও