জমিদারের নাটমন্দির থেকে বেরিয়ে যেভাবে সার্বজনীন হলেন দেবীদুর্গা

রাজশাহীর তাহিরপুরের জমিদার বাংলার ‘বারোভুঁইয়া’র অন্যতম কংস নারায়ণ তার মনোবাসনা পূরণের লক্ষ্যে প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। প্রথম দুর্গাপুজোটি হয়েছিল ১৪৮০ সালে রাজবাড়ি সংলগ্ন প্রধান ফটকের পাশেই একটি বেদীতে। পূজার রীতি-মন্ত্র ও সামগ্রিক নির্মাণ করেন কংসনারায়ণের কুল পুরোহিত রমেশ শাস্ত্রী।

দুর্গাপূজা বাঙালি সনাতনীদের প্রধান ও সর্ববৃহৎ পূজা। আর আজ মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হলো শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। শ্রীশ্রী চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আহ্বান জানানোই মহালয়া হিসেবে পরিচিত। এ ‘চণ্ডী’তেই রয়েছে দেবী দুর্গার সৃষ্টির বর্ণনা ও দেবীর প্রশস্তি। পুরাণ শাস্ত্রমতে, মহালয়ায় পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়।

ফুল, তুলসী ও বেলপাতা দিয়ে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে আহ্বান

পূজার সূচনা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও বাংলায় ষোড়শ শতাব্দীতে সম্রাট আকবরের শাসনামলে প্রথম পূজা শুরু হয়। রাজশাহীর তাহিরপুরের জমিদার বাংলার ‘বারোভুঁইয়া’র অন্যতম কংস নারায়ণ তার মনোবাসনা পূরণের লক্ষ্যে প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। ধীরে ধীরে বাঙালি জমিদারদের মধ্যে এই দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয়।

রাজা কংস নারায়ণ ছিলেন মনুসংহিতার টীকাকার কুল্লুক ভট্টের পুত্র। ঐতিহাসিক এবং স্থানীয় সূত্র মতে, কংস নারায়ণের প্রথম দুর্গাপূজাটি হয়েছিল ১৪৮০ সালে রাজবাড়ী সংলগ্ন প্রধান ফটকের পাশেই একটি বেদীতে। পূজার রীতি-মন্ত্র ও সামগ্রিক নির্মাণ করেন কংসনারায়ণের কুল পুরোহিত রমেশ শাস্ত্রী। দেবী দুর্গার সমস্ত গহনা করা হয়েছিল সোনা ও মণি-মুক্তা দিয়ে। পরে সেখানে নদীর পাশেই তিনি নির্মাণ করেন প্রথম দুর্গা মন্দির। লোকশ্রুতি অনুসারে, সম্রাট আকবরের আমলে এই পূজায় কংস নারায়ণ ব্যয় করেন প্রায় ৯ লক্ষ টাকা।

তবে শরৎকালীন দুর্গাপূজার সর্বোচ্চ প্রসার ও প্রচার লাভ করে ১৭৫৭ সালে কৃষ্ণনগরের অধিপতি নবকৃষ্ণ দেব বাহাদুরের মাধ্যমে। সেসময় শোভাবাজার রাজবাড়ীতে পূজা আয়োজন করেন। জনপ্রিয়তা এমন জায়গায় পৌঁছায় যে পলাশীর যুদ্ধ জয়ের পরে ক্লাইভ গির্জায় না গিয়ে আনন্দ উৎসবের জন্য দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। ইংরেজদের সন্তুষ্ট করার জন্য সেই সময়েই প্রথম দুর্গা পূজায় অহিন্দুসুলভ আচরণ ঢুকে পড়ে, আয়োজন করা হয় বাইজি নাচের। মাঝে ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে কোচবিহারের রাজা বিশ্ব সিংহের প্রতিষ্ঠিত ‘দুর্গাবাড়ি’ বা ‘দেবীবাড়ি’র দুর্গাপূজা অন্যতম প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠেছিল।

বাংলায় পারিবারিক দুর্গাপূজার প্রচলন মোটামুটি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে বড়িশার সাবর্ন রায়চৌধুরী বাড়ির পূজা আয়োজনের মাধ্যমে। সেই জমিদার বাড়ির লক্ষীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের পূজা তাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল। যদিও এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অন্যমতে, পারিবারিক দুর্গাপূজার সূচনা হয় ১৬০৯ সালে কাশীশ্বর দত্ত চৌধুরীর হাত ধরে। তখনও দুর্গাপূজা ছিল পুরোপুরি জমিদারের ঠাকুরদালান অথবা নাটমন্দিরে সীমাবদ্ধ।

১৭৯০ সালে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ার বারো জন ব্রাহ্মণ যুবকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল দুর্গাপূজার। বারো ইয়ার বা বন্ধু মিলে ওই পূজা ‘বারোইয়ারি’ বা ‘বারোয়ারি’ পূজা নামে খ্যাত হয়ে আছে। সেই থেকেই আজকের বারোয়ারি পূজার বিবর্তন। আর কলকাতায় ‘বারোয়ারি’ দুর্গাপূজার প্রচলন রাজা হরিনাথ রায়ের হাত ধরে কাশিমবাজার রাজবাড়িতে। সেদিনের সেই ‘বারোয়ারি’ কথাটি ধীরে ধীরে আজকের ‘সর্বজনীন’ কিংবা ‘সার্বজনীন’ এ রূপ পেয়েছে।

তথ্যসূত্র: দুর্গাপূজার দু-এক কথা- স্বামী দিব্যানন্দ, ড. শ্যাম প্রসাদ মুর্খাজী রিসার্চ ফাউন্ডেশন ও বিভিন্ন পত্র পত্রিকা

আরও