বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের গল্প মানেই সাধারণত হাহাকার আর বিলুপ্তির আশঙ্কার কথা। কোথাও বরফ গলে সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ছে, কোথাও বা সময়ের আগে ফুল ফুটে পরাগায়নের ছন্দ নষ্ট হচ্ছে। প্রকৃতির এ বিশৃঙ্খলার মাঝে অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলের ‘কিং পেঙ্গুইন’ যেন এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। তপ্ত হতে থাকা পৃথিবীতেও তারা নিজেদের মানিয়ে নিয়ে এক অভাবনীয় সাফল্যের গল্প লিখছে।
সম্প্রতি সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা বলছে, ১৯ হাজার কিং পেঙ্গুইনের ওপর চালানো পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে তারা ২০০০ সালের তুলনায় এখন প্রায় ১৯ দিন আগে প্রজনন শুরু করছে। প্রজনন সময়ের আগাম পরিবর্তনের ফলে তাদের বংশবৃদ্ধির হার অভাবনীয়ভাবে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। বিজ্ঞানের ভাষায় প্রকৃতির এ সময়ের হিসাবকে বলা হয় ‘ফেনোলজি’, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অন্য অনেক পাখি ও পতঙ্গ খাদ্যের সঙ্গে সময়ের তাল মেলাতে না পেরে হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে কিং পেঙ্গুইনদের ঘুরে দাঁড়ানো বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় বিস্ময়।
গবেষণার সহ-লেখক এবং ফরাসি বিজ্ঞান সংস্থা সিএনআরএসের বাস্তুসংস্থানবিদ সেলিন লে বোহেক বলেন, ‘কিং পেঙ্গুইনদের এ মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা নজিরবিহীন।’
ক্রোজেট দ্বীপপুঞ্জের পজেশন আইল্যান্ডে একটি কিং পেঙ্গুইন ছানা ডিম ফুটে বের হচ্ছে, ছবি: গ্যায়েল বার্ডন/এপি
গবেষণার তথ্যানুযায়ী, অন্য অনেক পেঙ্গুইন যখন প্রজনন ও খাদ্যের অভাবে ধুঁকছে, তখন কিং পেঙ্গুইনরা নমনীয় স্বভাবের কারণে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত লম্বা সময় প্রজনন চালিয়ে যেতে পারছে। তারা শুধু নির্দিষ্ট মাছের ওপর নির্ভর করে বসে থাকে না; বরং পরিস্থিতি বুঝে উত্তর বা দক্ষিণ—যেকোনো দিকে গিয়ে খাবার জোগাড় করে নিতে পারে। এ নমনীয়তাই তাদের সারপ্রাইজ উইনার বা অভাবনীয় বিজয়ী করে তুলেছে।
তবে এ রাজকীয় জয়ের পেছনে একটি প্রচ্ছন্ন সতর্কবার্তাও আছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এ সাফল্য হয়তো সাময়িক। সমুদ্রের তাপমাত্রা যে দ্রুতগতিতে বাড়ছে এবং খাদ্যচক্রের যে আমূল পরিবর্তন ঘটছে, তাতে এ ভারসাম্য যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী ইগনাসিও জুয়ারেজ মার্টিনেজ বলেন, ‘কিং পেঙ্গুইনরা আপাতত জিতছে ঠিকই, কিন্তু সমুদ্রস্রোত ও তাপমাত্রার ভবিষ্যৎ পরিবর্তন এ অর্জনকে নিমিষেই ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।’
উষ্ণ হতে থাকা এ গ্রহে কিং পেঙ্গুইনরা আজ প্রকৃতির এক বিরল আশার আলো। তবে তাদের এ ‘রাজকীয়’ টিকে থাকা কতদিন স্থায়ী হবে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের উত্তাল সমুদ্রের গভীরে।
এপি অবলম্বনে