অধিকাংশ সংস্কৃতিতে আরোগ্যের মূলধারায় ছিলেন নারী

খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০ থেকে ১০৪৬ সালের মধ্যে, ‘উ’ নামে পরিচিত নারী শামানরা আরোগ্য আচার, ভেষজ চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করতেন। প্রাচীন চীনা লিপিতে ‘শামান’ শব্দটির প্রাথমিক রূপ নারীদের সঙ্গেই যুক্ত ছিল।

বহু বছর আগে, চিকিৎসা যখন কোনো পেশা ছিল না, বিজ্ঞান ছিল না, কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ছিল না, তখন এটি ছিল একটি দায়িত্ব। আর মানব ইতিহাসের অধিকাংশ সমাজে দায়িত্বটি বহন করেছেন নারীরা। এটি কোনো কল্পকাহিনী নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে জন্ম নেয়া একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা, যেখানে অসুস্থতা, জন্ম, মৃত্যু, ক্ষত সবকিছুর পরিচর্যা হত ঘরেই, কোনো প্রতিষ্ঠানে নয়।

প্রাচীন মানবসমাজে চিকিৎসার শুরু হয়েছিল রান্নাঘর, উঠান, প্রসূতি কক্ষ আর বনজঙ্গলের প্রান্তে, যেখানে নারীদের বিচরণ ছিল বেশি। নব্যপ্রস্তর যুগে, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ সালে, যখন মানুষ স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে, তখন পরিবারকেন্দ্রিক যত্নব্যবস্থার সূচনা হয়। অসুখ প্রথম ধরা পড়ত নারীদের চোখে, কারণ সন্তান পালন, খাদ্য প্রস্তুতি, বয়স্কদের দেখভাল এসব দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নারীরা শরীরের পরিবর্তন, দুর্বলতা ও সেরে ওঠার প্রক্রিয়া গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। জ্বর কখন বিপজ্জনক হয়, ক্ষত কখন ভালো হয় বা তাতে পচন ধরে, কোন খাবার শক্তি দেয় আর কোনটি ক্ষতি করে, এ জ্ঞান কোনো গ্রন্থ থেকে নয়, জন্ম নিত অভিজ্ঞতা থেকে।

প্রসব ছিল এ জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু। মানব ইতিহাসের অধিকাংশ সময়জুড়ে সন্তান জন্মের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াই নারীদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সালের দিকে কিউনিফর্ম লিপিতে ধাত্রীদের উল্লেখ পাওয়া যায়, যারা শুধু শারীরিক সহায়তা করতেন না, বরং ‘গুলা’ নামক আরোগ্যদেবীর উদ্দেশ্যে আচারও পালন করতেন। প্রাচীন মিশরে নারীদের চিকিৎসাগত ক্ষমতা আরো স্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৪০০ সালের ‘ওল্ড কিংডম’ যুগের সমাধিলিপিতে ‘পেসেশেত’ নামের এক নারীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যার উপাধি ছিল “নারী চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধায়িকা”। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৫৫০ সালের ‘ইবার্স প্যাপিরাস’-এ স্ত্রীরোগ, গর্ভধারণ, জন্মনিয়ন্ত্রণ ও প্রসূতি চিকিৎসার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়, যা মূলত ঘরোয়া ও মন্দিরভিত্তিক চিকিৎসাচর্চার প্রতিফলন, যেখানে নারীরা ছিলেন প্রধান অনুশীলনকারী।

ভারতীয় উপমহাদেশে খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ১০০০ সাল থেকে খ্রিস্টীয় ৫০০ সালের মধ্যে সংকলিত আয়ুর্বেদীয় গ্রন্থগুলো পুরুষ পণ্ডিতদের লেখা হলেও, বাস্তব জীবনের চিকিৎসা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে সন্তান জন্ম, প্রসবোত্তর পরিচর্যা, শিশুর অসুখ, হজমজনিত সমস্যা কিংবা জ্বর, সবই সামলাতেন নারীরাই। হলুদ, নিম, তুলসী, ঘি ও মসলা দিয়ে তৈরি ওষুধ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে শেখানো হতো। নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, আজও রাজস্থান কিংবা দক্ষিণ ভারতের বহু ঘরোয়া চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে প্রাচীন যুগের বিস্ময়কর মিল রয়েছে, যা প্রমাণ করে, লিখিত গ্রন্থের বাইরে নারীরাই ছিলেন ব্যবহারিক চিকিৎসাজ্ঞানের ধারক।

প্রাচীন চীনেও চিকিৎসা ও আধ্যাত্মিকতা ছিল পরস্পরসম্পৃক্ত। ‘শাং’ রাজবংশের সময়কালে, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০ থেকে ১০৪৬ সালের মধ্যে, ‘উ’ নামে পরিচিত নারী শামানরা আরোগ্য আচার, ভেষজ চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করতেন। প্রাচীন চীনা লিপিতে ‘শামান’ শব্দটির প্রাথমিক রূপ নারীদের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যা ইঙ্গিত দেয়, চিকিৎসা ও আচারগত মধ্যস্থতার প্রাথমিক ভূমিকা ছিল নারীকেন্দ্রিক। পরবর্তী সময়ে কনফুসীয় সামাজিক কাঠামো নারীদের প্রকাশ্য ক্ষমতা সীমিত করলেও, পরিবারভিত্তিক চিকিৎসায় তাদের ভূমিকা কখনো বিলুপ্ত হয়নি।

মধ্যযুগীয় ইউরোপেও একই চিত্র দেখা যায়। দ্বাদশ শতকের আগে, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তখন সাধারণ মানুষের চিকিৎসা করতেন নারী ধাত্রী, ভেষজবিদ ও তথাকথিত ‘ওয়াইজ উইমেন’। তারা ক্ষত, সংক্রমণ, জ্বর ও প্রসবজনিত জটিলতায় ব্যবহার করতেন ইয়ারো, ক্যামোমাইল, উইলো বার্ক ও রসুন। দক্ষিণ ইতালির সালার্নো চিকিৎসা বিদ্যালয়, যা একাদশ শতক থেকে সক্রিয় ছিল, এটিও নারীচিকিৎসকদের অবদান স্বীকার করেছিল। ‘ট্রোটুলা অব সালার্নো’-এর নামে প্রচলিত গ্রন্থগুলো স্ত্রীরোগ জ্ঞানের প্রতিফলন। কিন্তু ত্রয়োদশ থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যে চিকিৎসা যখন লাইসেন্স ও প্রতিষ্ঠাননির্ভর হয়ে ওঠে, তখন নারীদের এ ভূমিকা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যায়।

আফ্রিকার বহু সমাজে প্রবীণ নারীরা ছিলেন চিকিৎসার কেন্দ্র। পশ্চিম আফ্রিকার ইয়োরুবা কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার ‘খোসা’ সমাজে নারীরা প্রসব, শিশুস্বাস্থ্য ও ভেষজ চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করতেন। শিয়া বাটার, তিতা পাতা, বাওবাব ফল, এসব উপাদান দিয়ে তৈরি চিকিৎসা পদ্ধতি নথিবদ্ধ হয় উনবিংশ ও বিংশ শতকের নৃতাত্ত্বিক গবেষণায়, যা মৌখিক ঐতিহ্যের দীর্ঘস্থায়িত্ব প্রমাণ করে।

নারীদের চিকিৎসাগত ক্ষমতার অবক্ষয় ঘটেছিল দক্ষতার অভাবে নয়, বরং ক্ষমতার কাঠামো বদলে যাওয়ায়। যখন চিকিৎসা ঘর থেকে প্রতিষ্ঠানে আর মুখের কথা থেকে লিখিত গ্রন্থে রূপান্তরিত হলো, তখন নারীদের ঠেলে দেয়া হলো এক প্রান্তে। তবু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি ভেষজ ঔষধ, ধাত্রীবিদ্যা, প্রতিরোধমূলক যত্ন, শরীর ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক, এসব গড়ে উঠেছিল সেই পরিসরে, যেটি নারীরাই হাজার বছর ধরে পরিচালনা করেছেন।

কেন নারীরা অধিকাংশ সংস্কৃতিতে প্রধান চিকিৎসক ছিলেন, এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে একটি সরল ঐতিহাসিক সত্যে। চিকিৎসা প্রথমে কোনো পেশা ছিল না, ছিল যত্ন, যা চর্চার মাধ্যমে জ্ঞান হয়ে উঠা এক কৌশল। আর মানব ইতিহাসের দীর্ঘতম সময়জুড়ে সেই যত্নের ভার ছিল নারীদের হাতেই।

আরও