আজ গোলাম কাসেম ড্যাডির ১৩২তম জন্মবার্ষিকী

একটি মেয়ের বিদ্রূপ, ছয়টি নেগেটিভ এবং গোলাম কাশেম ড্যাডি

ব্রিটিশ সরকারের অধীনে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে চাকরি করতেন তিনি। অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হতো। পাশাপাশি রাজনৈতিক সংঘাত ও দাঙ্গা থেকে সচেতনভাবেই দূরে থাকতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রশিক্ষণ শিবিরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল, তাই সেখানকার অনেক ছবি তুলতে পেরেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক হানাহানি কিংবা সংঘর্ষের ছবি তোলা তাকে আকৃষ্ট করেনি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রশিক্ষণ শিবির থেকে শুরু করে দেশভাগ ও দুর্ভিক্ষের উত্তাল সময়-একটি ক্যামেরা নিয়ে ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছিলেন একজন আলোকচিত্রী। কিন্তু ইতিহাসের এত বড় বড় ঘটনার সাক্ষী হয়েও কেন তার ক্যামেরা হয়ে ওঠেনি যুদ্ধ কিংবা রাজনৈতিক সংঘাতের দলিল?

একটি বিদ্রূপ কখনো কখনো মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। আর একটি ক্যামেরা হয়ে উঠতে পারে সেই বদলে যাওয়া জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী। গোলাম কাসেম ড্যাডির জীবনে এই দুটিই ঘটেছিল।

১৯১২ সাল। কলকাতার এক পরিচিতের বাড়িতে বসে একটি ছবি তোলার চেষ্টা করছিলেন ১৮ বছরের এক কিশোর। ছবির নেগেটিভ তৈরির সময় প্লেটের ইমালশন গলে নষ্ট হয়ে গেল। সেখানে উপস্থিত এক তরুণী এলসি তাঁকে প্রশ্ন করলেন, তিনি নিজে আদৌ ছবি তুলতে পারবেন কি না। কথাটি হয়তো নিছক ঠাট্টা, কিন্তু কিশোর গোলাম কাসেমের কাছে তা হয়ে উঠল নিজের সামর্থ্য প্রমাণের চ্যালেঞ্জ। তখনো তিনি জানতেন না, এই সামান্য বিদ্রূপই তাঁকে এমন এক জগতের দিকে ঠেলে দেবে, যার সঙ্গে কাটবে জীবনের প্রায় আট দশক।

ক্যামেরার প্রতি তার আকর্ষণ অবশ্য একেবারে নতুন ছিল না। কিন্তু সেদিনের চ্যালেঞ্জ যেন সেই আকর্ষণকে একরোখা সংকল্পে পরিণত করল। ফটোগ্রাফির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, হাতে-কলমে শেখানোর মতো শিক্ষকও ছিল না। কীভাবে নেগেটিভ তৈরি করতে হয়, কীভাবে ছবির রাসায়নিক প্রক্রিয়া সামলাতে হয়-এসব জানতে তাকে ঘুরতে হয়েছে কলকাতার বিভিন্ন ফটোগ্রাফির দোকানে। কোথাও খুব একটা সহযোগিতা পাননি। শেষ পর্যন্ত এক পরিচিতের কাছ থেকে জানতে পারেন, প্লেটের ইমালশন গলে যাওয়া ঠেকাতে হার্ডনার ব্যবহার করতে হয়। সেই কৌশল কাজে লাগিয়ে তৈরি করেন ছয়টি গ্লাস প্লেট নেগেটিভ। ছবিগুলো এলসির হাতে তুলে দেওয়ার পর তার বিস্ময় ও প্রশংসা কিশোরটির আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়।

পরবর্তী সময়ে নিজের স্মৃতিচারণে ড্যাডি এই ঘটনার জন্য এলসির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। কারণ, তার ভাষ্যে, সেই চ্যালেঞ্জই তাঁকে ফটোগ্রাফির পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তবে ঘটনাটিকে নিছক প্রেমের গল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি ছিল আত্মসম্মান, কৌতূহল এবং নিজের হাতে কিছু শিখে নেওয়ার দুর্দমনীয় ইচ্ছার গল্প।

সেই সময়ের গোলাম কাসেমের কাছে ফটোগ্রাফি ছিল না কোনো প্রতিষ্ঠিত শিল্পচর্চার সহজ পথ। প্রযুক্তি ছিল ব্যয়বহুল, প্রয়োজনীয় বইপত্র ও নির্দেশনার অভাব ছিল, আর বাঙালি মুসলমান সমাজেও ছবি তোলার আগ্রহ তখন খুব বেশি বিস্তৃত হয়নি। নিজের স্কুলে যাতায়াতের বাসভাড়া বাঁচিয়ে ক্যামেরা কেনার কথাও তাঁর জীবনের এই অধ্যবসায়ের পরিচয় দেয়। প্রাণী, ফুল, শিশু ও চারপাশের স্বাভাবিক দৃশ্য তাঁকে টানত। ক্যামেরা হাতে নেওয়ার পর তিনি শুধু ছবি তুলতে শেখেননি, শিখেছিলেন কীভাবে নিজের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখতে হয়।

১৯১৫ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফ্যানট্রি কোরের প্রশিক্ষণে যোগ দেন তিনি। যুদ্ধের প্রশিক্ষণ, সামরিক শিবিরের জীবন এবং সেই সময়কার পরিবেশ তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়তে শুরু করে। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম থেকে বিহারের মধুপুর-বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা তাঁর আলোকচিত্র সংগ্রহে জায়গা করে নেয়। মধুপুরে কয়েক শ শিক্ষার্থীর সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ চলছিল। প্রতিদিন প্যারেড, বন্দুক চালনা, শত্রুর আক্রমণ মোকাবিলার কৌশল-সবকিছুর মধ্যেও ক্যামেরার জন্য সময় বের করতেন তিনি। প্রশিক্ষক ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন গ্রের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বও হয়েছিল। ক্যামেরা থাকার সুবাদে এমন কিছু জায়গায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, যেখানে অন্যদের প্রবেশ সহজ ছিল না।

এভাবেই যুদ্ধের প্রস্তুতির ভেতর দাঁড়িয়ে একজন তরুণ আলোকচিত্রী নিজের চারপাশের সময়কে ধরে রাখতে শুরু করেন। তার তোলা ছবিতে দেখা যায় সামরিক প্রশিক্ষণ, ইউনিফর্ম পরা সৈনিক, শিবিরের পরিবেশ এবং তৎকালীন সামরিক জীবনের নানা অনুষঙ্গ। বিশেষ করে গ্লাস প্লেট নেগেটিভে ধারণ করা এসব ছবি আজ কেবল একজন আলোকচিত্রীর ব্যক্তিগত সংগ্রহ নয়, এগুলো উপমহাদেশের ইতিহাসের দুর্লভ দৃশ্যমান দলিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় একজন বাঙালি মুসলমান তরুণের এমন নিবিড় আলোকচিত্রচর্চা ছিল নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।

কিন্তু এখানেই গোলাম কাসেম ড্যাডির জীবন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়। যিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রশিক্ষণ শিবিরে ক্যামেরা নিয়ে ঘুরেছেন, যিনি ইতিহাসের একটি বড় সংঘাতের সময়কে ছবিতে ধরে রেখেছেন, তাঁর ক্যামেরা পরবর্তী দশকগুলোতে কেন একইভাবে সক্রিয় থাকল না? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ কিংবা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-এত বড় ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের সময় তাঁর ক্যামেরায় সেসব ঘটনার প্রত্যক্ষ ছবি খুব বেশি পাওয়া যায় না কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ১৯৮৮ সালের জুলাইয়ে ফিরে যেতে হয়। আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন তখন গোলাম কাসেমের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন। জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে দাঁড়ানো ড্যাডিকে তিনি সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ ও দাঙ্গার মতো এত বড় ঘটনা তাঁর ক্যামেরায় কেন অনুপস্থিত?

ড্যাডির উত্তর ছিল বেশ সরল। ব্রিটিশ সরকারের অধীনে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে চাকরি করতেন তিনি। অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হতো। পাশাপাশি রাজনৈতিক সংঘাত ও দাঙ্গা থেকে সচেতনভাবেই দূরে থাকতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রশিক্ষণ শিবিরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল, তাই সেখানকার অনেক ছবি তুলতে পেরেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক হানাহানি কিংবা সংঘর্ষের ছবি তোলা তাকে আকৃষ্ট করেনি।

নাসির আলী মামুনকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে নিজের আলোকচিত্রের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ড্যাডি বলেছিলেন, প্রকৃতিই তাকে সবচেয়ে বেশি টানত। মানুষের ছবিও তুলেছেন, তবে সচেতনভাবে কখনো ফটোসাংবাদিক হতে চাননি। রাজনৈতিক সংঘাতের চেয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সাধারণ মানুষের জীবন এবং চারপাশের স্বাভাবিক দৃশ্যই ছিল তার আগ্রহের জায়গা। তার নিজের কথায়, রাজনৈতিক হানাহানি-মারামারির মধ্যে তিনি ফটোগ্রাফি করেননি, প্রকৃতির সৌন্দর্যই তাঁকে মুগ্ধ করেছে।

এখানে ড্যাডির আলোকচিত্রীসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি ইতিহাসের প্রতিটি বড় ঘটনার ছবি তুলে রাখার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেননি। তার কাছে ক্যামেরা ছিল না কেবল সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাবলি নথিবদ্ধ করার যন্ত্র। বরং চারপাশের সৌন্দর্য, মানুষের উপস্থিতি এবং জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত আবিষ্কারের মাধ্যম। তাই তাঁর ছবিতে ইতিহাসের অনুপস্থিতি যতটা চোখে পড়ে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তিনি কী দেখতে চেয়েছিলেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁর ছবিতে সেই সময়ের ইতিহাসের কোনো চিহ্ন নেই। সরাসরি দুর্ভিক্ষ কিংবা দাঙ্গার ছবি না তুললেও তাঁর আলোকচিত্রে ধরা পড়েছে সেই সময়ের মানুষ, জীবনযাপন, স্থাপনা, পরিবহন ও সামাজিক পরিবেশের নানা অনুষঙ্গ। কলকাতার বন্দর, পুরোনো বাষ্পচালিত ইঞ্জিন, সৈনিকদের প্রশিক্ষণ, সাধারণ মানুষের প্রতিকৃতি-এসব ছবির মধ্য দিয়ে হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের দৃশ্যমান উপস্থিতি পাওয়া যায়। অর্থাৎ, তিনি হয়তো ইতিহাসের সংঘাতকে সামনে থেকে ধারণ করেননি, কিন্তু তাঁর ছবির ভেতর দিয়ে ইতিহাসের একটি সময়কে আজও পড়া সম্ভব।

এ কারণেই গোলাম কাসেম ড্যাডির আলোকচিত্রের মূল্য শুধু তার সময়ের বিচারে নয়, তার দেখার ধরনেও। যে সময়ের মানুষ রাজনৈতিক সংঘাত, ঔপনিবেশিক শাসন ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, সেই সময়ের একজন আলোকচিত্রী নিজের ক্যামেরায় খুঁজেছেন প্রকৃতি ও জীবনের স্বাভাবিক সৌন্দর্য। এটি তার ব্যক্তিগত পছন্দ, আবার তার শিল্পীসত্তারও পরিচয়।

এই দীর্ঘ যাত্রায় তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ছবি তোলার পাশাপাশি ছবিগুলো সংরক্ষণ করার অসাধারণ অভ্যাস। সারাজীবনে আনুমানিক আট থেকে দশ হাজার ছবি তুলেছিলেন তিনি। প্রতিটি নেগেটিভ নম্বর দিয়ে, প্রয়োজনীয় তথ্য লিখে আলাদা খামে যত্ন করে রাখতেন। তাঁর সংগ্রহে পাওয়া যায় ১৯১৮ সাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ের গ্লাস প্লেট নেগেটিভ। পুরোনো কাগজের খামে সযত্নে রাখা সেই ছবিগুলো যেন তাঁর নিজের হাতে তৈরি এক ব্যক্তিগত সময়ের আর্কাইভ। ২০২০ সালে দৃকের 'When The Mind Says Yes' প্রদর্শনীতে তার সংরক্ষিত ছবির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নতুন করে দর্শকের সামনে আসে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, তার মৃত্যুর পর ইন্দিরা রোডের বাড়িটি দীর্ঘদিন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় বিপুলসংখ্যক নেগেটিভ হারিয়ে যায় বা বেহাত হয়। যে মানুষটি সারাজীবন স্মৃতি সংরক্ষণ করেছেন, তার নিজের সংগ্রহই শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকেনি।

তবু তার রেখে যাওয়া ছবিগুলো আজও এক শতাব্দী আগের পৃথিবীর দিকে তাকানোর জানালা খুলে দেয়। বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রশিক্ষণ শিবিরের ছবিগুলো প্রমাণ করে, একজন তরুণ বাঙালি মুসলমান কীভাবে প্রতিকূল পরিবেশে নিজের উদ্যোগে ফটোগ্রাফির চর্চা চালিয়ে গিয়েছিলেন। আর পরবর্তী সময়ের ছবিগুলো দেখায়, ইতিহাসকে দেখার একাধিক পথ আছে। কেউ যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ ধারণ করেন, কেউ মানুষের প্রতিবাদ, কেউবা সেই অস্থির সময়ের মাঝেও বেঁচে থাকা সাধারণ জীবনের সৌন্দর্য খুঁজে ফেরেন।

১৮৯৪ সালের ৫ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন গোলাম কাসেম ড্যাডি। প্রায় এক শতাব্দীর আলোকচিত্রময় জীবন শেষে ১৯৯৮ সালের ৯ জানুয়ারি ঢাকায় ১০৩ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। যে কিশোর একদিন একটি মেয়ের বিদ্রূপের জবাব দিতে ছয়টি নেগেটিভ তৈরি করেছিলেন, তিনিই পরবর্তী জীবনে ক্যামেরাকে নিজের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের ৯ জানুয়ারি তাঁর জীবনের অবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর তোলা ছবিগুলো রয়ে যায় সময়ের ওপারে।

আরও