কোহিনূর: ঔপনিবেশিক লুণ্ঠনের ‘পকেট সাইজ’ প্রতীক ও ইতিহাসের অমীমাংসিত বিতর্ক

১৮৪৯ সালে পাঞ্জাব দখলের পর মাত্র ১০ বছর বয়সী শিখ রাজা দুলীপ সিংকে ‘লাহোর চুক্তি’ সই করতে বাধ্য করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল কোহিনূর রানি ভিক্টোরিয়ার হাতে তুলে দেয়া। সমালোচকদের মতে, এটি কোনো উপহার ছিল না, ভয় দেখিয়ে এক শিশুর কাছ থেকে এটি জোরপূর্বক কেড়ে নেয়া হয়েছিল

টাওয়ার অব লন্ডনে সংরক্ষিত রত্নভাণ্ডারের মধ্যে ‘কোহিনূর’ হয়তো সর্ববৃহৎ বা সবচেয়ে মূল্যবান হীরা নয়, কিন্তু ঐতিহ্যের বিচারে এর সমকক্ষ আর দ্বিতীয়টি নেই। বছরের পর বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কাছে কোহিনূর কেবল একটি হীরা নয়, বরং ঔপনিবেশিক সহিংসতা, লুণ্ঠন ও যন্ত্রণার এক মূর্ত প্রতীক। দীর্ঘ আড়ালের পর নিউ ইয়র্কের মেয়রের সাম্প্রতিক এক মন্তব্যের জেরে ‘অভিশপ্ত’ হীরাটি আবারও বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

কুইন মাদারের কফিনের ওপর রক্ষিত কোহিনূর খচিত মুকুট

গত মাসে নিউ ইয়র্ক সফরে যান ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস। সেসময় এক সংবাদ সম্মেলনে শহরের মেয়র জোহরান মামদানিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—রাজার সঙ্গে দেখা হলে তিনি কী নিয়ে আলাপ করবেন। মামদানির সোজাসুজি উত্তর ছিল, ‘আমি সম্ভবত তাকে (রাজাকে) কোহিনূর হীরাটি ফেরত দেয়ার জন্য উৎসাহিত করব।’

তার এ মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মেয়রের সমালোচনা করে একে ‘অশালীন’ বলে অভিহিত করেছে ‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’। তবে এর জেরেই ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন জোহরান মামদানি। কোহিনূর ভারতবর্ষের সম্পদ, যদিও শতবর্ষের বেশি হতে চলল তা ব্রিটেনের রাজপরিবারের দখলে আছে। দীর্ঘদিন ধরেই হীরাটি ফেরত পাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে ভারত।

রাজমুকুটে কোহিনূর: ১৯৩৭ সালে রাজা ষষ্ঠ জর্জের রাজ্যাভিষেকের একটি দৃশ্য।

‘কোহিনূর: দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট ইনফামাস ডায়মন্ড’ বইয়ের সহ-লেখক উইলিয়াম ডালরিম্পল কোহিনূর নিয়ে চলমান বিতর্কে খুব একটা অবাক নন। তার মতে, কোহিনূর দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কাছে কেবল একটি পাথর নয়, বরং এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়কার পুঞ্জীভূত কষ্টের এক আবেগীয় বহিঃপ্রকাশ। দক্ষিণ ভারতে উৎপন্ন এ হীরার ইতিহাস যুদ্ধ, রক্তপাত ও বিশ্বাসঘাতকতায় ঠাসা।

মুঘল সম্রাট শাহজাহানের ময়ূর সিংহাসনে শোভা পাওয়া হীরাটি ১৭৯৩ সালে পারস্যের শাসক নাদির শাহ লুণ্ঠন করেন। তিনিই এর নাম দেন ‘কোহিনূর’, যার অর্থ ‘আলোর পাহাড়’। নাদির শাহের পর এটি আফগানিস্তান হয়ে শিখ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রণজিৎ সিংয়ের হাতে পৌঁছায়। তিনি হীরাটি বাহুতে পরিধান করতেন। রণজিৎ সিংয়ের মৃত্যুর পর হীরাটির মালিক হন তার কিশোর উত্তরাধিকারী দুলীপ সিং।

১৮৪৯ সালে পাঞ্জাব দখলের পর মাত্র ১০ বছর বয়সী শিখ রাজা দুলীপ সিংকে ‘লাহোর চুক্তি’ সই করতে বাধ্য করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল কোহিনূর রানি ভিক্টোরিয়ার হাতে তুলে দেয়া। সমালোচকদের মতে, এটি কোনো উপহার ছিল না, ভয় দেখিয়ে এক শিশুর কাছ থেকে এটি জোরপূর্বক কেড়ে নেয়া হয়েছিল।

রানি এলিজাবেথের কফিনের ওপর রাখা কোহিনূর খচিত মুকুট

লোকগাথা অনুযায়ী, কোহিনূর পুরুষদের জন্য ‘অভিশপ্ত’। এটি যার কাছে থাকে সে বিশ্বের অধিপতি হয়, কিন্তু তার সাথে আসে অবর্ণনীয় দুর্ভাগ্যের ভার। ইতিহাস বলে, এ হীরার পুরুষ মালিকরা প্রায়ই হত্যা বা যুদ্ধের শিকার হয়েছেন। সম্ভবত সে কারণেই ব্রিটিশ রাজপরিবারে গত দেড়শ বছরে কোনো রাজা এটি পরিধান করেননি; এটি কেবল রানিদের মুকুটে স্থান পেয়েছে। এমনকি রাজা চার্লসের অভিষেকেও বিতর্ক এড়াতে এটি ব্যবহার করা হয়নি।

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ডালরিম্পল মনে করেন, কোহিনূর কেবল একটি কাঁচের বাক্সে বন্দি পাথর নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের পুঞ্জীভূত আবেগ। কোহিনূরকে রাজকীয় আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ব্রিটিশরাই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। রানি ভিক্টোরিয়ার হাতে তুলে দেয়ার পর এটি জনসম্মুখে প্রদর্শনীতে রাখা হয়। এমনকি ইউরোপীয় রুচির সাথে মেলানোর জন্য হীরাটিকে নতুন করে কাটা হয়েছিল (যদিও সেই প্রচেষ্টা খুব একটা সফল ছিল না)। এরপর এটি ব্রিটিশ রাজমুকুটে স্থান পায় এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

শিখ রাজা দুলীপ সিং

১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর থেকেই হীরাটি ফেরত দেয়ার দাবি উঠতে থাকে। ভারত সরকার দশকের পর দশক ধরে বেশ কয়েকবার আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। গ্রিসের ‘পার্থেনন মার্বেলস’ বা ‘বেনিন ব্রোঞ্জ’-এর মতো কোহিনূরও এখন বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিক লুণ্ঠনের একটি আন্তর্জাতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। টাওয়ার অব লন্ডনে কোহিনূর দেখতে যাওয়া অনেক ভারতীয় পর্যটককে হীরাটি দেখে ‘চোর, চোর’ বলে চিৎকার করতেও শোনা যায়।

সবসময়ই হীরাটি ফেরত দিতে অস্বীকার করেছে ব্রিটেন সরকার। তাদের দাবি, এটি একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়েছিল। ২০১০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছিলেন, এভাবে সব ফেরত দিতে শুরু করলে ব্রিটিশ মিউজিয়াম একদিন খালি হয়ে যাবে।

কোহিনূরের জনসম্মুখে প্রদর্শন

কোহিনূর নিয়ে বিতর্ক কেবল ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান এ হীরা দাবি করে, কারণ এটি লাহোর থেকে নেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান এমনকি তালেবান নেতারাও এর মালিকানা দাবি করেছেন। ঐতিহাসিক অড্রে ট্রুশকে যেমনটি বলেছেন, ‘উপনিবেশবাদের ক্ষতি পূরণ করা যে কতটা জটিল, কোহিনূর তার বড় উদাহরণ। ব্রিটেন এটি ফেরত দিতে চাইলেও কাকে দেবে, তা নিয়ে বড় সংশয় আছে।’

সম্প্রতি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কোহিনূর ফেরানোর তোড়জোড় কিছুটা স্তিমিত মনে হলেও ডালরিম্পল মনে করেন, ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এটি একটি ‘বারগেইনিং চিপ’ বা কূটনৈতিক তুরুপের তাস হতে পারে। ব্রিটিশদের জন্য যখন ভারতের সমর্থন বা সদিচ্ছা বেশি প্রয়োজন হবে, তখন কোহিনূর একটি বড় ধরণের ‘ডিপ্লোমেটিক গ্রেনেড’ পরিণত হতে পারে।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে

আরও