বিয়ের দিনটা সবার কাছেই বিশেষ। তবে নব্বইয়ের দশকে বিয়ের সেই বিশেষ দিনকে স্মৃতির পাতায় ধরে রাখার আয়োজন ছিল একটু অন্য রকম। তখন ডিজিটাল ক্যামেরা ছিল না, ছিল না হাতে হাতে স্মার্টফোন। বিয়ের অনুষ্ঠানে ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে হাজির হতেন ক্যামেরাম্যান। বরযাত্রা, বিয়ের সাজ, কনের বিদায়—সবকিছু ধারণ করা হতো ক্যামেরায়। এরপর সেই ভিডিও ক্যাসেটে বন্দি হয়ে পৌঁছে যেত বর ও কনের বাড়িতে।
ভিডিও ক্যাসেট হাতে পাওয়ার পর শুরু হতো আরেক আয়োজন। যে বাড়িতে টেলিভিশন আর ভিসিআর ছিল, সেখানে একদিন সবাই মিলে বসে বিয়ের ভিডিও দেখার ব্যবস্থা করা হতো। আর তা না থাকলে দোকান থেকে টেলিভিশন ও ভিসিআর ভাড়া করে আনা হতো। মুরব্বিরা বসতেন সোফায় বা বিছানায়, ছোটরা মেঝেতে।
বর-কনে হয়ে উঠতেন সেদিনের আসরের মধ্যমণি। পর্দায় নিজেদের বিয়ের দৃশ্য দেখে কখনো হাসতেন, কখনো লজ্জায় মুখ লুকাতেন। আত্মীয়স্বজনেরাও নিজেদের খুঁজে পেয়ে মজা করতেন।
ক্যামেরাম্যানের ধারণ করা দৃশ্যগুলো সিনেমার আদলে সম্পাদনা করা হতো। কখনো বরকে ঘোড়ার ওপর বসিয়ে দেয়া হতো, কখনো কনেকে পালকিতে। আবার বর-কনেকে ফুলের ওপর ভাসিয়ে কিংবা রঙিন দৃশ্যের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা হতো অভিনব সব দৃশ্য। অনেক ভিডিওতে দেখা যেত মেঘ থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছেন বর, আবার কোথাও দৃশ্য রূপক হয়ে কনে বের হচ্ছেন ফুলের কলি ফুটে!
হলুদ বাটা, সাজসজ্জা, বরযাত্রা, বধূবরণ, মেহমানদের খাওয়ার দৃশ্য—বিয়ের অনুষ্ঠানের বিভিন্ন অংশ জুড়ে দেয়া হতো একসঙ্গে। এমনকি ক্যামেরাম্যানকে দেখে খাওয়া থামিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকতেন মেহমানদের অনেকে। সম্পাদনার সময় ভিডিওগুলোয় জুড়ে দেয়া হতো জনপ্রিয় বাংলা সিনেমার গান কিংবা কখনো আবেগঘন কোনো সুর। থাকত জনপ্রিয় হিন্দি গানও। ভিডিওর শুরুতে বর-কনের নাম, মাঝখানে বিয়ের নানা মুহূর্ত, আর শেষে শুভেচ্ছা—সব মিলিয়ে তৈরি হতো একটি পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিচিত্র। এখনকার মতো ভিডিও সম্পাদনার এত সহজ ব্যবস্থা তখন ছিল না। তাই ক্যামেরাম্যানের দক্ষতা ও কল্পনাশক্তির ওপরই নির্ভর করত ভিডিওর সৌন্দর্য।
বছর কয়েক পর সেই ভিডিও আবার চালিয়ে দেখা হতো। তত দিনে বর-কনে গুছিয়ে সংসার করছেন, হয়তো তাদের কোলে এসেছে নতুন সন্তান। পর্দায় ফুটে উঠতেন প্রয়াত আত্মীয়স্বজনও। সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া চেহারা, হারিয়ে যাওয়া মানুষ আর পুরনো দিনের হাসিমুখ—সবকিছুই ফিরত কয়েক মিনিটের জন্য।
বিয়ের ভিডিওর পাশাপাশি ভিসিআর ঘিরে গ্রামাঞ্চলে আরেক ধরনের উন্মাদনা ছিল। তখনো গ্রামগুলোয় বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। বিনোদনের জন্য তখন রেডিও ছিল একমাত্র ভরসা। অবস্থাসম্পন্নদের ঘরে সাদা-কালো টেলিভিশন কেবল আসতে শুরু করেছে। ব্যাটারিচালিত সেই টেলিভিশন দেখতে আশপাশের কয়েক গ্রাম থেকে মানুষ জড়ো হতেন। বিটিভিতে মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার রাতের বাংলা সিনেমা ছিল বিশেষ আকর্ষণ। টেলিভিশনের সামনে বসে গভীর রাত পর্যন্ত সিনেমা দেখতেন দর্শকরা। তারপর আবার চলত মাসজুড়ে অপেক্ষা।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে গ্রামে-গঞ্জে ভিসিআরের আগমন সেই অপেক্ষার অবসান ঘটায়। উপজেলা শহর কিংবা গঞ্জ থেকে ভিসিআর ভাড়া করে আনা হতো। সঙ্গে থাকত টেলিভিশন ও সিনেমার ক্যাসেট। কোথাও টিকিট কেটে, কোথাও চাঁদা তুলে আয়োজন করা হতো সিনেমা দেখার।
সন্ধ্যার পর মাইকে ঘোষণা শোনা যেত। তা শুনে গ্রামের মানুষ নগদ টাকা কিংবা কোচরে চাল নিয়ে জড়ো হতেন সিনেমা দেখার আসরে। রাতভর চলত সিনেমা প্রদর্শনী। শাবানা, ববিতা, আলমগীর, কবরী, ফারুক, ইলিয়াস কাঞ্চন, চম্পা কিংবা দিতির অভিনয় দেখতে দর্শকদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে।
ভিসিআর দেখার সেই রাতগুলোয় গ্রামের কিশোরদের আনন্দ ছিল অন্য রকম। সিনেমা দেখে সন্তান বখে যাওয়ার আশঙ্কায় বাবা-মায়ের অনুমতি মিলত না। তাই অনেকেই করত গোপন পরিকল্পনা। রাতের খাবার খেয়ে পড়া তৈরি করে ঘুমাতে যাওয়ার ভান করত। বাবা-মা ঘুমিয়ে গেলে পাড়ার সমবয়সীরা মিলে দল বেঁধে সিনেমার আসরে যাত্রা! এমন গল্প নব্বইয়ের দশকে গ্রামে বেড়ে ওঠা অনেকের স্মৃতিতে আছে।
ভিসিআরের যুগ এখন শেষ। একসময় যে যন্ত্রের জন্য গ্রামের মানুষ রাত জাগত, চাঁদা তুলত কিংবা ভাড়া করে আনত, সেটি আজ আর সচরাচর দেখা যায় না। যন্ত্রাংশের সংকট ও চাহিদা কমে যাওয়ায় থেমে যায় এর উৎপাদন।
তবে ভিসিআরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো এখনো রয়ে গেছে। অনেকের আলমারিতে পড়ে আছে পুরনো ভিএইচএস ক্যাসেট। কোনো ক্যাসেটে বিয়ের ভিডিও, কোনো ক্যাসেটে জন্মদিন, পিকনিক কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানের দৃশ্য। ক্যাসেট আছে, কিন্তু চালানোর যন্ত্র নেই। প্রযুক্তির পরিবর্তনের ধাক্কায় সেই ভিডিওগুলোও হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে। তবে পুরনো ক্যাসেট থেকে ভিডিও উদ্ধার করে ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকায় বহু বছর আগের বিয়ের ভিডিও কিংবা পারিবারিক স্মৃতি আবার দেখার সুযোগ পাচ্ছেন অনেকে।