ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন; নামটা শুনলেই চোখে কী ভাসে? চড়া গলা, ডান হাতটা সামনে বাড়িয়ে থাকা অনমনীয় এক বিপ্লবী, কোটি কোটি শ্রমিকের মুক্তির দূত কিংবা একটা বিশাল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের কড়া মেজাজের শাসক। ইতিহাসে লেনিনের যে ছবিটা আমরা দেখি, সেটা এক্কেবারে পাথরের মতো শক্ত, যেখানে আবেগ বা ব্যক্তিগত কান্নাকাটির কোনো জায়গা নেই।
কিন্তু মানুষটার মনের ভেতরে কী চলত? তিনি যখন রাতে একা ঘরে থাকতেন, তখন কি মন খারাপ হতো? কখনো প্রেমে পড়েছেন? ক্ষমতার চেয়ারে বসার পর কখনো কি ভীষণ নিঃসঙ্গ লেগেছে তার?
লেনিনের খুব কাছের বন্ধু ছিলেন মাক্সিম গোর্কি। লেনিন মারা যাওয়ার পর বিখ্যাত এ সাহিত্যিক আফসোস করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘লেনিনের ভেতরের মনোজগৎটা নিয়ে, তার রক্ত-মাংসের মানুষটাকে নিয়ে কেউ যদি চমৎকার উপন্যাস বা ফিকশন লিখতে পারত!’
প্রচলিত ইতিহাসে তো শুধু সাল আর ঘটনার হিসাব থাকে, কিন্তু মানুষের ভেতরের গল্পটা তো একমাত্র সাহিত্যই বলতে পারে।
বিশ্বসাহিত্যে গোর্কির সেই আফসোস পুরোপুরি মিটেছে কিনা জানি না, তবে বাংলা সাহিত্যে মানুষ লেনিনের একটা প্রতিরূপ তৈরি করার চেষ্টা করেছেন আশানুর রহমান। কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত তার উপন্যাস ‘লেনিন’ পড়তে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছিল— আচ্ছা, একজন ঔপন্যাসিক কতখানি ডুবে গেলে, কতটা ধারণ করলে এক শতাব্দী আগের ভিন্ন দেশের একজন মানুষ এভাবে জীবন্ত করে তুলতে পারেন! ‘লেনিন’-এ রাজনৈতিক মেনিফেস্টো প্রাসঙ্গিক, একইসঙ্গে এটি আসলে ইতিহাসের কঠিন বর্মের নিচে লুকিয়ে থাকা এক সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে উঠার গল্প।
২০২৪ সালে প্রকাশ হয় ৩৩৪ পৃষ্ঠার সুদীর্ঘ এ উপন্যাস। এটি বালক ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভের ধাপে ধাপে ভোলাদিয়া থেকে লেনিন হয়ে উঠার মনস্তাত্ত্বিক ও মানবিক আখ্যান। লেখক দীর্ঘ ছয় বছরের প্রস্তুতি ও নিবিড় গবেষণার পর উপন্যাসটি অবয়ব দাঁড় করিয়েছেন, যা বাংলা সাহিত্যে রাজনৈতিক জীবনীভিত্তিক উপন্যাসের ধারায় এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। পাতা উল্টাতে উল্টাতে দেখা যায়, লেখক শুধু চরিত্রের একক উত্থান-পতন আঁকেননি, বরং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের জরাজীর্ণ ও বিস্ফোরক রুশ সমাজ এবং একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেলবন্ধনকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
পটভূমি বুঝতে হলে তৎকালীন রাশিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে, যা উপন্যাসে সহায়ক হিসেবে এসেছে। উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের শুরুর দিকের রাশিয়া ছিল জারের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে পিষ্ট ভূখণ্ড। একদিকে রোমানভ রাজবংশের জাঁকজমক আর অসীম ক্ষমতা, অন্যদিকে সাধারণ কৃষক, মজুর আর উদীয়মান শ্রমিক শ্রেণীর চরম দারিদ্র্য ও শোষণ—এই দুই বৈপরীত্যের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল রুশ সাম্রাজ্য। সাইবেরিয়ার কনকনে ঠান্ডা আর সেন্ট পিটার্সবার্গের অন্ধকার কারখানাগুলোর যে বিবরণ লেখক দিয়েছেন, তা কেবল ভৌগোলিক দৃশ্য নয়, বরং তা ছিল তৎকালীন শোষণের মূর্ত প্রতীক। জারের গোপন পুলিশ বাহিনী ‘ওখরানা’র সার্বক্ষণিক নজরদারি, বাকস্বাধীনতাহীন এক দমবন্ধ পরিবেশ এবং বুদ্ধিজীবীদের নির্বাসনের নির্মম বাস্তবতাই ছিল কাহিনীর মূল চালিকাশক্তি। বারুদঠাসা এমন পটভূমিতেই গড়ে উঠে ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভের প্রথম জীবন, যেখানে সামান্য একটা আগুনের স্ফুলিঙ্গই পারতো গোটা সমাজকে বদলে দিতে।
আশানুর রহমানের ‘লেনিন’-এর নান্দনিক দিক হলো, তিনি ভ্লাদিমিরকে আকাশের তারা হিসেবে দেখাননি, বরং ভাইবোন এবং পারিবারিক পরিমণ্ডলের নিবিড় বন্ধনের মধ্য দিয়েই তার চরিত্রের কাঠামো স্থাপন করেছেন। উলিয়ানভ পরিবারের বড় ছেলে আলেকজান্ডার (সাশা), বোন আন্না, ওলগা, মারিয়া এবং ছোট ছেলে দিমিত্রি—প্রত্যেকের সঙ্গে ভ্লাদিমিরের সম্পর্ক ও বোঝাপড়া উপন্যাসটিতে চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। বড় ভাই সাশা ছিলেন লেনিনের প্রথম অনুপ্রেরণা। সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র সাশা যখন গোপনে জারের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিপ্লবী দলে যোগ দেন, তখন কিশোর ভ্লাদিমির ভাইয়ের সেই গভীর চিন্তাশীল চোখ দুটির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতেন। বড় বোন আন্না ছিলেন ভ্লাদিমিরের সার্বক্ষণিক ছায়ার মতো, যিনি ভাইয়ের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে সবসময় পাশে থেকেছেন এবং জারের পুলিশের হাতে বারবার বন্দী হয়েছেন। আদরের ছোট বোন ওলগার অকাল মৃত্যু তরুণ ভ্লাদিমিরের মনে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল, তাও লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন মমতায়। পারস্পরিক এই টান, টেবিল ঘিরে বসে গভীর রাতে নিষিদ্ধ ইশতেহার পড়া এবং মায়ের চোখের আড়ালে বিপ্লবের গোপন পরিকল্পনার দৃশ্যগুলো আখ্যানটিকে দারুণভাবে সচল রাখে।
পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে এসে ভ্লাদিমির কীভাবে প্রখর মেধা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং তাত্ত্বিক সততার জোরে বন্ধুদের বলয় পেরিয়ে গোটা জাতির নেতা হয়ে উঠলেন—সেই রূপান্তরটিই উপন্যাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। সেন্ট পিটার্সবার্গে আইন ব্যবসার আড়ালে তিনি যখন শ্রমিকদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেন, তখন তার চারপাশে একদল একনিষ্ঠ বন্ধু ও সহযোদ্ধা গড়ে ওঠে। ক্রুপস্কায়া (নাদিয়া), জুলিয়াস মার্টভ, প্লেখানভের মতো বন্ধুদের সঙ্গে তার সম্পর্ক উপন্যাসে নানা তাত্ত্বিক ও আবেগীয় জটিলতায় আবর্তিত হয়েছে। বিশেষ করে একসময়ের পরম বন্ধু মার্টভের সঙ্গে যখন মতাদর্শগত কারণে দল বিভাজিত হয়ে বলশেভিক ও মেনশেভিক নামের দুটি ধারার জন্ম হয়, তখন বন্ধুর চোখের দিকে তাকিয়ে লেনিনের যে নির্মোহ অথচ বিষণ্ণ চাউনি, তা লেখকের কলমে অসাধারণ ট্র্যাজিক রূপ পেয়েছে। লেনিন বন্ধুদের ভালোবাসতেন, কিন্তু বিপ্লবের প্রশ্নে, শোষিত মানুষের মুক্তির প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন।
মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান থেকে রুশ জাতির অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠার পেছনে লেনিনের দূরদর্শিতা ও চরম রাজনৈতিক উত্থান-পতনকে লেখক কয়েকটি ঐতিহাসিক মাইলফলকের মাধ্যমে দেখিয়েছেন। ১৯০৫ সালের ব্যর্থ রুশ বিপ্লব, দীর্ঘকাল ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাযাবরের মতো নির্বাসিত জীবন কাটানো এবং সবশেষে ১৯১৭ সালের এপ্রিলে দীর্ঘ প্রবাস জীবন ছেড়ে রাশিয়ার ফিনল্যান্ড স্টেশনে পা রাখা—এই প্রতিটি ঘটনা উপন্যাসের গতিকে তুঙ্গে নিয়ে যায়। ফিনল্যান্ড স্টেশনের বাইরে দাঁড়ানো সাঁজোয়া গাড়ির ওপর চড়ে যখন লেনিন বিখ্যাত ‘এপ্রিল থিসিস’ ঘোষণা করছেন, তখন তার কণ্ঠস্বর আর কোনো চার দেয়ালের বন্দি যুবকের নয়, বরং তা ছিল জারের অত্যাচারে পিষ্ট কোটি কোটি রুশ জনতার মনের ভাষা। রুটি, জমি আর শান্তির দাবিতে মুখরিত এক বুভুক্ষু জাতিকে তিনি প্রজ্ঞা দিয়ে এমন এক সুতোয় বাঁধলেন, যা রাশিয়ার শত বছরের জরাজীর্ণ জারের সিংহাসন উল্টে দিল। আশানুর রহমান নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে লেনিন অনন্য বাগ্মিতা আর অটল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বুর্জোয়া সরকারের সমস্ত ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে ১৯১৭ সালের অক্টোবরে প্রলেতারিয়েতদের ক্ষমতা দখল নিশ্চিত করেন এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের আদরের ‘ভলোদিয়া’ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘কমরেড লেনিন’ তথা বিশ্বজুড়ে মেহনতি মানুষের চিরকালের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে শুরু করে মার্ক্সীয় চেতনার দীক্ষা, বলশেভিক ও মেনশেভিকদের মধ্যকার তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এবং সাইবেরিয়ার কনকনে ঠান্ডায় দীর্ঘ নির্বাসন—এই পর্বগুলোয় উপন্যাস কখনো মন্থর, কখনো তীব্র গতিসম্পন্ন। কীভাবে চেনা লোকালয়, চেনা ঘরদোর এবং গর্ভধারিণী মাকে পেছনে ফেলে ইতিহাসের এক অনিশ্চিত কোলাহলে পা বাড়াচ্ছেন লেনিন। নির্বাসনে বসে মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার অংশটি উপন্যাসের অন্যতম আবেগঘন চূড়া। এই নিঃসঙ্গতা এবং স্বজন হারানোর বেদনা আখ্যানটিকে এক ধরনের বিষণ্ণ ও মহাকাব্যিক গাম্ভীর্য দান করেছে। সাইবেরিয়ার নির্বাসন পর্বের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে লেনিনের নিঃসঙ্গতার যে রূপ লেখক এঁকেছেন—হৃদয়কে স্পর্শ করে। সেখানে ফুটে উঠে, ভোলগা তীরের সেই চেনা শোরগোল আজ কত দূরে, মা হয়তো এখন জানালার ধারে বসে পথ চেয়ে আছেন, অথচ এই অন্তহীন বরফের দেশে তিনি একাকী এক পথিক, যার নিয়তি কেবিই সামনে হেঁটে যাওয়া এবং যার পেছনে ফেরার কোনো সেতু অক্ষত নেই। এখানে ‘লেনিন’ ঐতিহাসিক লৌহমানবের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন এক চিরন্তন নিঃসঙ্গ পুত্র, যে মায়ের জন্য ব্যাকুল।
উপন্যাসের চূড়ান্ত উত্থান ঘটে ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের সময়, যখন লাল পতাকায় পৃথিবী কম্পমান। আশানুর রহমান এখানে এসে বিজয়ের উল্লাসে মত্ত হননি। ক্ষমতার চূড়ায় আরোহণ করার পর লেনিনের যে একাকীত্ব, নাদিয়া এবং ইনেসা আরমান্দের মধ্যকার ত্রিভুজ টানাপড়েন এবং শেষ জীবনে ইনেসার মৃত্যুর পর পঞ্চাশ বছর বয়সী লেনিনের কান্না—গল্পের শেষ ভাগের এ পতন পাঠককে এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করায়। উপন্যাসে নাদিয়া এবং ইনেসা আরমান্দের উপস্থিতি রাজনৈতিক সহযোদ্ধা হিসেবে নয়, বরং লেনিনের জীবনের বসন্ত ও ধূসরতার প্রতীক হিসেবে এসেছে। পঞ্চাশ বছর বয়সে ইনেসার অকালপ্রয়াণে লেনিনের যে কান্না, তা উপন্যাসের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক মোড়। তিনি তখন উপলব্ধি করেন— লাল পতাকার নিচে লাখো মানুষের কুচকাওয়াজ, মস্কোর রাজপথ আজ তার নামে মুখরিত হলেও এই কোলাহলের মাঝে তিনি ভীষণ একা; যে মানুষটি শত দুঃখের পাহাড়েও এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেনি, আজ সে এক নারীর চিতার পাশে দাঁড়িয়ে শিশুর মতো অসহায়। এই অংশটি উপন্যাসের শিল্পমানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় এবং প্রমাণ করে— চরম একনায়কতান্ত্রিক বা বৈপ্লবিক কাঠামোর ভেতরেও একটি গোপন, কোমল এবং ট্র্যাজিক মানবিক হৃদয় স্পন্দিত হতে পারে।
আশানুর রহমানের লিখনশৈলীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো মূল প্রোটাগনিস্টকে মেদহীন রাখার লক্ষণীয় প্রচেষ্টা। রাজনৈতিক উপন্যাসে অনেক ক্ষেত্রে লেখকরা কোনো না কোনো আদর্শের পক্ষে বা বিপক্ষে অতি-আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কিন্তু এখানে লেখক এনিরপেক্ষ দ্রষ্টা হিসেবে লেনিনের চরিত্রকে মানবিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ভাষা একইসঙ্গে গীতিময় ও সংহত। তিনি মেদহীন বাক্যে পরিবেশ ও মানসিক অবস্থা ফুটিয়ে তুলতে পারেন।
কোনো লেখা-ই তো নিখুঁত হয় না, এই উপন্যাসের ক্ষেত্রেও ছোট আফসোস আছে। শুরুর দিকে এবং মাঝখানের পর্বে লেখক যেভাবে প্রতিটি চরিত্র আর ঘটনাকে সময় নিয়ে, ডিটেইলিং দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন, শেষের দিকে এসে গতিটা হঠাৎ একটু বেশি বেড়ে গেছে বলে মনে হয়। ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের পরের যে সময়টা, অর্থাৎ লেনিন যখন রাশিয়ার ক্ষমতায় বসলেন, চারপাশ থেকে যখন গৃহযুদ্ধ আর চক্রান্ত শুরু হলো—সেই পর্ব এবং লেনিনের একেবারে শেষ জীবনের অসুস্থতার দিনগুলো আরেকটু বড় পরিসরে আসতে পারত। স্তালিন বা ট্রটস্কির সঙ্গে সম্পর্কের যে জটিলতা, সেগুলো যদি আরো কয়েকটা অধ্যায় নিয়ে লিখতেন, তবে হয়তো উপন্যাসটি আরো পূর্ণ আখ্যান হয়ে উঠতো। উপন্যাসের কিছু কিছু অংশে বলশেভিক, মেনশেভিক বা পপুলেশনিস্টদের দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্ক এবং লিফলেট-পুস্তিকার তাত্ত্বিক আলোচনা সাধারণ পাঠকের কাছে কিছুটা দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি করতে পারে। ইতিহাসের সব খুঁটিনাটি ধারণ করতে গিয়ে কোনো কোনো অধ্যায়ে উপন্যাসের শৈল্পিক গতি কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। আর উপন্যাসে রুশ বিপ্লবের এত চরিত্র একসঙ্গে ভিড় করেছে যে, রুশ নামের জটিলতার কারণে সাধারণ বাঙালি পাঠকের পক্ষে মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলা অস্বাভাবিক নয়।
মাঝে-মধ্যে মনে হয়েছে, লেনিনের ব্যক্তিত্বের প্রতি ঔপন্যাসিকের ব্যক্তিগত অনুরাগ রয়েছে। ইতিহাসের পাতায় লেনিন যেমন একজন সফল বিপ্লবী, তেমনি তার অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। লেখক সেই রাজনৈতিক ভুলভ্রান্তি বা তার কঠোর সিদ্ধান্তগুলোকে যেভাবে কিছুটা নমনীয় বা ক্ষেত্রবিশেষে ‘বিপ্লবের প্রয়োজনে অনিবার্য’ বলে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেছেন, তা কিছুটা পক্ষপাতদুষ্ট মনে হতে পারে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পর ভিন্নমত দমন, চেকা (গোপন পুলিশ বাহিনী) গঠন এবং ‘লাল সন্ত্রাস’ বা রেড টেররের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের সমর্থক ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দলের কর্মীদের ওপর যে কঠোর নিপীড়ন চালানো হয়েছিল, তা লেনিনের ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায়। আশানুর রহমান বিষয়গুলো এনেছেন ঠিকই, কিন্তু এর ভয়াবহতাকে কিছুটা এড়িয়ে গেছেন বলেই আমার অভিমত। বলশেভিকদের চরমপন্থী রূপটির আরো গভীর ও নির্মোহ বিশ্লেষণ দাবি করা যায়।
লেনিনের রাজনৈতিক দর্শন যেমন ‘সাম্রাজ্যবাদ: পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর’ বা ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’—এই বইগুলোর ভেতরের মূল তাত্ত্বিক বিতর্কগুলো নিয়ে খুব বেশি একটা গভীর আলোচনা করা হয়নি। যারা লেনিনের দর্শন নিয়ে গভীর পড়াশোনা করতে চান, তাদের তৃষ্ণা উপন্যাসটি পুরোপুরি মেটাতে পারবে না।
তা সত্ত্বেও বড় সার্থকতা হলো, আশানুর রহমান বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক বিশ্বাসগুলোয় লেনিনকে নিয়ে এক পক্ষের ‘অত্যাচারী স্বৈরশাসক’ বা অন্য পক্ষের ‘সব ভুল ত্রুটির ঊর্ধ্বে এক মহানায়ক’ হিসেবে উপস্থাপন করার যে বাইনারি, তার বাইরে এসে অনেকটাই ভারসাম্যপূর্ণভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। তিনি লেনিনের ভেতরের বৈপরীত্য ও দ্বন্দ্বগুলোকে স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। লেখকের মূল লক্ষ্য যেহেতু ছিল একটা সাধারণ ছেলের ‘লেনিন’ হয়ে উঠার ভেতরের গল্পটা বলা, সেই ফিকশনাল ক্যারেক্টারকে তিনি যথাযথভাবেই তুলে ধরতে পেরেছেন।
প্রযুক্তিময় এ যুগে আমরা যখন ক্যারিয়ার, টাকা-পয়সা আর আত্মকেন্দ্রিক জীবন নিয়ে ব্যস্ত, তখন এক শতাব্দী আগের একজন মানুষের গল্প কেন পড়ব? রাশিয়ার এক নেতার গল্প কেন একজন বাঙালি পাঠককে টানবে?
উত্তরটা খুব সহজ। উপন্যাসটি আসলে শুধু লেনিনের গল্প নয়, এটা মানুষের স্বপ্নের গল্প। একজন মানুষ কীভাবে নিজের সব ব্যক্তিগত সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে কোটি কোটি সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন দেখতে পারেন, এই বইটা তা শেখায়। আমাদের শেখায় যে, চরম বিপদে বা নির্বাসনের একাকীত্বেও মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারাতে হয় না, ধারণ করতে হয় ‘গণমানুষ’-এর চেয়ে বড় কোনো রাজনৈতিক শক্তি নেই পৃথিবীতে।
আশানুর রহমান দীর্ঘ ছয় বছরের পরিশ্রম আর গভীর ভালোবাসা দিয়ে উপন্যাসটি লিখেছেন, যা পাতা উল্টালেই টের পাওয়া যায়। কোনো রকম কৃত্রিম বা বানানো ঢং ছাড়া, একদম সহজ-সরল ভাষায় ইতিহাসের এক মহানায়ককে ঘরের মানুষের মতো করে চেনার জন্য এই উপন্যাসটি এক চমৎকার সুযোগ।
সাইদ খান সাগর: লেখক, সংগঠক ও নির্মাতা