একাডেমিক জীবনে ক্রিস্টোফার মার্লোর ‘ড. ফস্টাস’ পড়েছিলাম। তখন শুধু একাডেমিক প্রয়োজনে পড়লেও এর বেশকিছু বিষয়ে নিজের মধ্যে কৌতুহল সৃষ্টি করেছিল। একইভাবে অনেকদিন পর কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে ওয়েব সিরিজ ‘চক্র’ সিজন ১ ও ২ দেখার পর। কেননা মার্লোর ফস্টাস আর ভিকি জাহিদের চক্রের চরিত্রগুলোর মধ্যে অদ্ভুত মিল রয়েছে।
ময়মনসিংহের আলোচিত ‘আদম পরিবারের’ ৯ সদস্যের আত্মহত্যার ওপর ভিত্তি করে ওয়েব সিরিজটি নির্মিত। ‘চক্র’ প্রথম ও দ্বিতীয় সিজনে তিনটি পরিবারের স্যাটানিজমে আকৃষ্ট হওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়। একইভাবে মার্লোর নাটকে ফস্টাসের স্যাটানিজমে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা বর্ণনা করেন। ‘ডক্টর ফস্টাস’ ও ‘চক্র’ উভয়ই মূলত মানুষের মধ্যে অন্তর্নিহিত অন্ধকার, নিষিদ্ধ জ্ঞান ও অশুভ শক্তির প্রতি আকর্ষণের ওপর ভিত্তি করে বর্ণিত ও নির্মিত।
ষোড়শ শতাব্দীর রেনেসাঁ যুগের প্রেক্ষাপট আর বাংলাদেশের ময়মনসিংহের আদম পরিবারের সত্য ঘটনার মধ্যে কয়েকশ বছরের ব্যবধান থাকলেও, স্যাটানিজম বা শয়তানবাদের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি অভিন্ন। এ লেখায় ডক্টর ফস্টাস ও চক্রের সামাঞ্জস্য দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব।
‘চক্র’ সিরিজের মূল চরিত্র খুঁজতে গেলে সামনে আসে আব্দুল দরবেশ। সিরিজে এ চরিত্রটি ফস্টাসের প্রতিরূপ। আব্দুল দরবেশ দীর্ঘদিন মারেফতি ও আধ্যাত্মিক সাধনায় যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এক ধর্মীয় বাহাসে তাকে ‘বেদাতি’ আখ্যা দিয়ে চরমভাবে অপমান করা হয়। দরবেশ যখন বাহাসে অপমানিত হয়ে রাগে-ক্ষোভে বাড়িতে এসে অন্ধকারে বসে কাঁদছিলেন, তখন এক অদৃশ্য কণ্ঠের আহ্বান শুনতে পায়। সেই কণ্ঠ তার মারেফতি সাধনাকে ভুল ও ব্যর্থ বলে আখ্যা দেয় এবং তাকে প্রতিশোধ, ক্ষমতা ও দুনিয়ার জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়
ক্রিস্টোফার মার্লো
‘চক্র’ সিরিজের মূল চরিত্র খুঁজতে গেলে সামনে আসে আব্দুল দরবেশ। সিরিজে এ চরিত্রটি ফস্টাসের প্রতিরূপ। আব্দুল দরবেশ দীর্ঘদিন মারেফতি ও আধ্যাত্মিক সাধনায় যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এক ধর্মীয় বাহাসে তাকে ‘বেদাতি’ আখ্যা দিয়ে চরমভাবে অপমান করা হয়। দরবেশ যখন বাহাসে অপমানিত হয়ে রাগে-ক্ষোভে বাড়িতে এসে অন্ধকারে বসে কাঁদছিলেন, তখন এক অদৃশ্য কণ্ঠের আহ্বান শুনতে পায়। সেই কণ্ঠ তার মারেফতি সাধনাকে ভুল ও ব্যর্থ বলে আখ্যা দেয় এবং তাকে প্রতিশোধ, ক্ষমতা ও দুনিয়ার জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়। দরবেশ তার মারেফতি সাধনা জলাঞ্জলি দিয়ে অদৃশ্য শব্দের আহ্বানে সাড়া দেয়। এ চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দুর্বলতার সময় ব্যক্তির ভেতরে আকস্মিক রাগ-ক্রোধ-প্রবৃত্তিকে কাজ লাগিয়ে শয়তান বশীভূত করে নেয়।
এমন চিত্র দেখা যায় মার্লোর ফস্টাসে। ফস্টাস যখন জীবন নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল তখন মেফিস্টোফিলিস তাকে সীমাহীন ক্ষমতা ও পৃথিবীর সমস্ত সুখ বা ‘দুনিয়ার জান্নাত’-এর লোভ দেখায়। এক সময় ফস্টাস ও আব্দুল দরবেশ উভয়েই নিজের হাত কেটে রক্ত দিয়ে শয়তানের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হয় এবং নিজেদের আত্মা বিক্রি করে দেয়।
মেফিস্টোফিলিস ফস্টাসকে অধঃপতিত করতে তার সামনে মানবচরিত্রের সাতটি আদি ও মারাত্মক পাপকে মূর্ত করে তুলেছিল। ভিকি জাহিদও ‘চক্র’ সিরিজের দুই সিজনজুড়ে বিভিন্ন চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক স্খলনের মাধ্যমে সাতটি পাপকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এ পাপগুলো ধীরে ধীরে চক্রের চরিত্রগুলোকে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে নিয়েছে।
সাত পাপের অন্যতম ‘ক্রোধ’। ফস্টাসের অবাধ্যতা ও ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মূলে ছিল এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রোধ, যা মেফিস্টোফিলিস ক্রমাগত উস্কে দিয়েছিল। অন্যদিকে, চক্রে আব্দুল দরবেশের স্যাটানিক পথে পা বাড়ানোর প্রধান নিয়ামক ছিল বাহাসের অপমান থেকে জন্মানো তীব্র ক্রোধ। এ ক্রোধ তাকে অন্ধকারে নিয়ে যায়।
ষোড়শ শতাব্দীর রেনেসাঁ যুগের প্রেক্ষাপট আর বাংলাদেশের ময়মনসিংহের আদম পরিবারের সত্য ঘটনার মধ্যে কয়েকশ বছরের ব্যবধান থাকলেও, স্যাটানিজম বা শয়তানবাদের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি অভিন্ন
ভিকি জাহেদ
এ সিরিজের দ্বিতীয় সিজনে মেঘলা চরিত্রটি ছিল একটি স্যাটানিক কাল্টের সদস্য। সে একটি পরিবারকে টার্গেট করে। পরে ওই পরিবারের সদস্যদের সাতটি পাপের কয়েকটির মাধ্যমে প্ররোচিত করতে থাকে। ওই পরিবারের এক সদস্য জেনি। মেঘলা জেনির ভেতরে অবদমিত ক্রোধকে বিভিন্নভাবে জাগিয়ে তোলে। জেনি যখন জানতে পারে প্রেমিক তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তখন মেঘলার প্ররোচনায় ক্রোধের বশবর্তী হয়ে সে প্রেমিককে নৃশংসভাবে হত্যা করে। শুধু তাই নয়, মেঘলা এ ক্রোধকে কাজে লাগিয়ে জেনিকে দিয়ে আপন ভাইয়ের মেয়ে ছোট্ট অপ্সরাকেও হত্যা করায় এবং তার মুখ পুড়িয়ে দেয়। এগুলো প্রত্যেকটি ছিল স্যাটানিক টাস্ক; করা হয় ক্রোধকে কাজে লাগিয়ে।
দ্বিতীয় পাপ হলো ‘লালসা বা কামাসক্তি’। ফস্টাস তার আদিম ও শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য মেফিস্টোফিলিসের কাছে গ্রিক পুরাণের সুন্দরী ‘হেলেন অব ট্রয়’কে কামনা করে। ‘চক্র’ সিরিজের দুই সিজনেই এমন লালসার চিত্র দেখা যায়। সিজন-১-এ লুবনার বাবার কামার্ত দৃষ্টি ছিল তাদের গৃহকর্মীর দিকে এবং সেই লালসার বশবর্তী হয়ে তাকে বিয়ে করার সংকল্প করে। সিজন-২ এ জেনির প্রেমিক তার নিজের ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া ও অবৈধ শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়।
এছাড়া লালসার চিত্র ফুট ওঠে জেনির বাবার মধ্যে। সে মেয়ের বয়সী মেঘলার ছবি জুম করে দেখত। মেঘলা এ লালসার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাকে মেসেজ দিয়ে প্রলুব্ধ করে এবং শারীরিক সম্পর্কে জড়ায়। এ সম্পর্কের পর জেনির বাবা অদৃশ্যভাবে বন্দী হয়ে পড়ে। মেঘলা যা করতে বলে সে তাই করে। মূলত লালসার মাধ্যমে মেঘলা জেনির বাবাকে নিজের দাস বানিয়ে ফেলে।
চক্র ও ডক্টর ফস্টাসে—উভয় জায়গায় লোভকে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। শয়তান বা নেতিবাচক শক্তি মানুষের মনের অবদমিত লোভকে চাবিকাঠি বানিয়ে অন্ধকারে টেনে নেয়।
নাটকের মূল চরিত্র ডক্টর ফস্টাস নিজেই লোভের সবচেয়ে বড় উদাহরণ, তবে তার লোভ কেবল সাধারণ টাকা-পয়সার প্রতি ছিল না। তার লোভ ছিল সীমাহীন ক্ষমতা, বৈশ্বিক আধিপত্য এবং নিষিদ্ধ জ্ঞানের প্রতি। এ পার্থিব ও বস্তুগত লোভের মোহে অন্ধ হয়েই নিজের আত্মাকে লুসিফারের কাছে চব্বিশ বছরের জন্য বিক্রি করে দেয়।
‘চক্র’ সিরিজের প্রথম সিজনে হেলাল চরিত্রটির মাধ্যমে মধ্যবিত্ত মানুষের লোভের চিরন্তন রূপটি দেখানো হয়েছে। হেলাল ছিল একজন অতিসাধারণ মানুষ, যে বাবার চোখে ব্যর্থ একজন মানুষ। তার মনে রাতারাতি ধনী হওয়ার এবং নিজের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে ফেলার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল। স্যাটানিক বা কাল্ট শক্তিগুলো সবসময় এমন দুর্বল মানসিকতার মানুষকে খোঁজে। হেলালের এ অর্থনৈতিক লোভ এবং সহজে সফল হওয়ার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাকে স্যাটানিজমের ফাঁদে ফেলা হয়। প্রথমে দেয়া হয়, ছোট ছোট টাস্ক। বিনিময়ে সে অর্থ পেত। কিন্তু দিন দিন অর্থের প্রতি তার লোভ বেড়ে যায়। এসব টাস্ক পূরণ করতে করতে তিনি এক সময় পুরো পরিবারকে নিয়ে আত্মহত্যার আয়োজন করেন। এক পর্যায়ে এ পরিবারের লুবনা আর হেলাল ছাড়া সবাই আত্মহত্যা করে।
সিজন-২ এ জেনির পরিবারের ধ্বংসের পেছনে অন্যতম প্রভাবক ছিল তার ভাবির বৈষয়িক লোভ। অতিরিক্ত লোভের কারণে সে স্বামীকে নিয়মিত চাপ দিত, অবৈধ পথে হলেও বেশি আয় করার জন্য। এক সময় জেনির ভাই স্যাটানিক কাল্টের খপ্পরে পড়ে যায়। স্ত্রীর চাহিদা পূরণের জন্য স্যাটানিক কাল্টের দেয়া নানা টাস্ক পূরণ করতে শুরু করেন। এভাবে তিনি ধীরে ধীরে অন্ধকারে প্রবেশ করে।
সেভেন ডেডলি সিন্সের আরেকটি পাপ হলো অতিরিক্ত ভোজন। চক্রে দ্বিতীয় সিজনে জেনির পুরো পরিবার যখন মেঘলা ও স্যাটানিক শক্তির দ্বারা পুরোপুরি বশীভূত হয়ে পড়ে, তখন তাদের এ অতিরিক্ত ভোজনের বীভৎস রূপটি দেখানো হয়। ডাইনিং টেবিলের একটি দৃশ্যে দেখা যায় জেনির বাবা, ভাই ও পরিবারের বাকি সদস্যরা প্রচুর খাবার নিয়ে বসে আছে। তারা কোনো সাধারণ মানুষের মতো খাচ্ছিলেন না, বরং নোংরাভাবে দুহাত দিয়ে গোগ্রাসে খাবার মুখে পুরছিল। তাদের মুখে খাবার লেগে ছিল এবং চোখ-মুখের অভিব্যক্তি ছিল অস্বাভাবিক।
তবে চক্রে দুটি চরিত্রকে পুরোটা সময় স্যাটানিক কাল্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে দেখা যায়। একজন লুবনার চাচা সেলিম, অন্যজন লুবনা নিজেই। তারা ভেতর থেকে পরিশুদ্ধ ও প্রবৃত্তিকে দমন করতে পারার কারণে স্যাটানিক কাল্টগুলো তাদের বিভ্রান্ত করতে পারেনি। এ সিরিজে যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে সেটা হলো, স্যাটানিক কাল্ট বা শয়তান যখন কাউকে প্ররোচিত করতে চায় তখন ব্যক্তির দুর্বলতাগুলো টার্গেট করে। পরবর্তীতে তাদের বিভিন্ন পাপের মাধ্যমে অন্ধকারে টেনে নেয়।