পারিল নওয়াধা, মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার বলধারা ইউনিয়নের একটি গ্রাম, যেটি পারিল নামেই সুপরিচিত। গ্রামের অলিগলিতে ছড়িয়ে আছে খাল-পুকুর, ঘাটে বাঁধা ডিঙি নৌকা, সব মিলিয়ে যেন স্কুলপড়ুয়া ছাত্রের কচি হাতে আঁকা ছবি। শীতের দিনে দেখা যায় দিগন্তজুড়ে ছেঁয়ে আছে সরিষা ক্ষেত। কতকগুলো আবার মৃদু বাতাসে যখন শরীর এলিয়ে দেয় মাটির কাছে, তখন সোনা রোদে চকচক করে আকৃষ্ট করে পথিককে। দীর্ঘক্ষণ সে দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকা যায়।
ঢাকার কোলাহল ছেড়ে চাইলেই যাওয়া যায় সেই নিভৃত, নৈসর্গিক গ্রামে। এখানে রয়েছে শতবর্ষী বটগাছ, চারশো বছরের পুরনো মন্দির, আছে শীতল-সুন্দর নদী-নালা। সেই নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও মানবজীবনকে আলো দিয়ে এঁকে গেছেন দেশের দুজন বিখ্যাত আলোকচিত্রী- নাইব উদ্দিন আহমদ ও ড. নওয়াজেশ আহমদ। তাদের জন্মভূমি এই পারিল। যুগ যুগ ধরে তাই ক্যামেরার সঙ্গে পরিচিত এ গ্রামের মানুষের। ক্যামেরা হাতে একজনের ছবি তুললে মুখ গোমরা করতে দেখা যায় পাশে বসা অন্যজনকে- কেন তার ছবি তোলা হচ্ছে না!
দিগন্ত বিস্তৃত সরিষা ক্ষেতের দেখা মেলে পারিলে
নাইব উদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের চিত্রধারক হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। তার তোলা অনেকগুলো ছবির মধ্যে একটি হলো- পেছনে নদী, তার পাড়ে তিন কিশোর। একজনের হাতে বারুদ, অন্য দুজন রাইফেল তাক করে হাঁটুগেড়ে বসে আছে। মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে নেটদুনিয়ায় এ ছবি প্রায়শই দেখা যায়। আরেকটি ছবি হলো ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে তোলা, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে থাকা মাথার খুলির ভেতর থেকে জন্মানো গাছ। প্রকৃতি ও বাস্তবতাকে এভাবেই চিত্রিত করে গেছেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের বহু আগেও এক্ষেত্রে নিজের ছাপ রেখেছেন। নাইব উদ্দিন আহমদ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে কলকাতার অলিগলি-রাজপথ ঘুরে তুলেছিলেন তেতাল্লিশের মন্বন্তরের ছবি। ১৯৫৮ সালে বিশ্বব্যাপী আয়োজিত ‘ওয়ার্ল্ড ফটো কনটেস্ট’-এ পাকিস্তানের শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রীর পুরস্কার পান তিনি।
এদিকে নাইব উদ্দিন আহমদের ছোট ভাই নওয়াজেশ আহমদ ছিলেন একাধারে আলোকচিত্রী ও বিশিষ্ট উদ্ভিদবিজ্ঞানী। প্রকৃতি প্রেম তার আলোকচিত্রের অনন্য বৈশিষ্ট্য। একটা সময় চাকরি বাদ দিয়ে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন দেশের বৃক্ষ-ফুল, পাখি ও নদী প্রেমে। প্রকৃতির পাশাপাশি ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখেছেন শিল্প-সাহিত্যকে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রে বর্ণিত প্রকৃতির সৌন্দর্য ও জীবনকে ফুঁটিয়ে তুলেছেন নওয়াজেশ আহমদ। কবি জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার রূপকে চিত্রিত করেছেন ‘ধানসিঁড়ি নদীটি পাশে’ আলোকচিত্রের অ্যালবামে। এমন অনেক সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে তিনি আলোকচিত্র শিল্পে স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গেছেন। স্বীকৃতিস্বরূপ এশিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আলোকচিত্র উৎসব ছবিমেলার ১০ম আয়োজনে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার ২০১৯-এ ভূষিত হয়েছিলেন।
জহির মঞ্জিল
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এ দুজন আলোকচিত্রীর পৈত্রিক নিবাস জহির মঞ্জিল, যেটি পারিলে অবস্থিত। এ বাড়িতে আগেও বহু গুণীজনের পদচারণা ছিল এবং এখনো রয়েছে। বাড়িটি এখন প্রায় সবার জন্য উন্মুক্ত। ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ, আলোকচিত্রীরা যান সেখানে।
পারিলের মানুষও যেন জন্মসূত্রেই ক্যামেরার সঙ্গে পরিচিত। পুরো গ্রাম ও বাসিন্দাদের ফ্রেমবন্দী করেছেন আলোকচিত্র শিল্পের এ দুজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাই ফটোগ্রাফি তাদের কাছে আজ বড্ড চেনা এক বিষয়। কেউ ছবি তোলার আগ্রহ দেখালে সবাই কমবেশি সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ওঠেন। আর সেই দুজন শিল্পীও পারিলকে এতটা গভীরভাবে নিজস্ব সত্ত্বায় ধারণ করেন যে সম্ভবত সে কারণেই ঢাকার আবাসনের নামও রেখেছেন ‘পারিল গ্রীন’, যেটি গ্রীনরোডে অবস্থিত। তাইতো এ গ্রামের দিকে তাকালে মনে হয় ‘ছবির গ্রাম পারিল’।
এত সব কারণেই ক্যামেরা যেন তাদের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৯ সালে প্রায় কাছাকাছি সময়ে এ দুজন আলোকচিত্রী মারা গেলেও সেই ঐতিহ্য ইতিহাস হয়ে যায়নি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এটি বহমান। তাদের ভ্রাতুষ্পুত্র শিল্পী নাসিম আহমদ নাদভী বর্তমানে সেই ঐতিহ্যকে বহমান রেখেছেন খুব যত্নভরে।
তবে পারিলের ঐতিহ্য কেবল আলোকচিত্র বা আলোকচিত্রীর ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। দেশে নদী ও নৌকা বাইচের যে ঐতিহ্য, তার অন্যতম বাহকও পারিল। দীর্ঘ বছর ধরে নৌকা বাইচ হয়ে আসছে এ গ্রামে। বর্ষায় জল থৈ থৈ পারিলে ছেলে-মেয়েরা ছড়া কাটে- ‘ডোবা নালা গারা/নওয়াধা-পারিল বলধারা’। আর মাঝিমাল্লারা গেয়ে ওঠেন, ‘বাইচ দিবারও গেছিলাম পারিলাগো খালে/পারিলারা বইসা রইছে বৈন্যা গাছের তলে’।
এ পারিলারা কেবল নৌকা বাইচ নয়, আরো অনেক উৎসবে মাতেন বছরজুড়ে। এখানে শতবর্ষী এক বটতলায় অনুষ্ঠিত হয় শিবের পূজা। পূজায় মানত হিসেবে সবাই রেখে যান মাটির ঘোড়া। বছরজুড়ে সেখানে মানতের ঘোড়াগুলো সাজানো থাকে। আবার পূজা উপলক্ষে আয়োজন করা হয় গ্রামীণ মেলারও। রয়েছে পুরনো মন্দির। হিন্দু সম্প্রদায় রাধা কৃষ্ণের কীর্তনের আয়োজন করা হয় সেখানে। পাশাপাশি প্রতিবছর এখানে ওরসও অনুষ্ঠিত হয়। সর্বস্তরের মানুষ এসব অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার খবর প্রায় শোনা গেলেও এ গ্রামের মানুষের এমন সহবস্থানের কথা অজানা অধিকাংশের কাছেই।
মানত হিসেবে রেখে যাওয়া মাটির ঘোড়া
পারিলে রয়েছে হযরত গাজীউল মূলক ইকরাম ইব্রাহীম বোগদাদী শাহ্ (রহ.) এর মাজার। জনশ্রুতি আছে, হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর সফরসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার একজন হযরত গাজীউল মূলক ইকরাম ইব্রাহীম বোগদাদী শাহ্ (রহ.) এর হাত ধরে পারিল গ্রামের গোড়াপত্তন। তিনি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে জলপথে যাত্রা করছিলেন। সে সময় একটি স্থানে তিনি কাপ্তানকে নোঙ্গর ফেলতে বলেন। কিন্তু চারিদিকে অথৈ জল দেখে কাপ্তানের মনে আশঙ্কা জাগে যে এখানে মাটি পাওয়া যাবে না। তবু তিনি তার হুজুরের কথা মোতাবেক নোঙ্গর ফেলেন এবং মাটির সন্ধানও পেয়ে যান। সেখানেই হযরত গাজীউল মূলক ইকরাম ইব্রাহীম বোগদাদী শাহ্ (রহ.) তার ধর্মপ্রচারের জন্য অবস্থান করেন এবং পরবর্তীতে চরও জেগে ওঠে। সময়ের পরিক্রমায় জায়গাটি গ্রামে পরিণত, যা বর্তমানে পারিল নওয়াধা নামে পরিচিত, যার অর্থ নদীর পাড়।
ঢাকা থেকে খুব সহজেই যে কেউ এক দিনের জন্য যেতে পারেন পারিলে। ঈদের ছুটিতে ইট-সুরকির শহর থেকে প্রকৃতিতে বিচরণের একটি সহজ গন্তব্য হতে পারে পারিল নওয়াধা।