পৃথিবীর দুই মেরুতে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ বরফ দ্রুত কমে যাচ্ছে। এর সবটাই যে গলে যাচ্ছে, তা নয়। বরং হিমবাহের বরফ দ্রুত সরে সমুদ্রে গিয়ে মিশছে। দীর্ঘদিনের স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, ১৯৭০-এর দশক থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকা থেকে প্রায় ১২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন টন বরফ হারিয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে।
গবেষণা প্রকল্পটির প্রধান ইনেস ওতোসাকা বলেন, ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত পেছনে তাকানোর সুযোগ পাওয়ায় অর্ধশতকে বরফস্তরের পরিবর্তন এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এই গবেষণার তথ্যভান্ডারটির নাম দেয়া হয়েছে ‘আইএমবিআইই’।
তবে ৩ সেন্টিমিটার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শুনতে খুব বেশি মনে না হলেও এর প্রভাব বড়। গবেষকদের হিসাবে, এর কারণে আরো ৬০ থেকে ৯০ লাখ মানুষ উপকূলীয় বন্যা ও ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছেন। আইএমবিআইইর প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ড্রু শেফার্ড মনে করেন, সামনে বরফ ক্ষয় আরো বাড়তে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় এমন বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, হারানো বরফের ৮৪ শতাংশই গলে নয়, দ্রুতগতিতে সমুদ্রের দিকে বয়ে যাওয়া হিমবাহের মাধ্যমে সরে গেছে। মাত্র ১৬ শতাংশ বরফ হারিয়েছে পৃষ্ঠ গলে যাওয়ার কারণে। ওতোসাকার মতে, এতে বোঝা যায় উষ্ণ সমুদ্রের প্রভাবে বরফস্তরের পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ের প্রধান কারণ।
১৯৮০-এর দশকে গ্রিনল্যান্ডে বছরে বরফ কমেছিল প্রায় ৬৬ বিলিয়ন টন। ২০১০-এর দশকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯১ বিলিয়ন টনে। অ্যান্টার্কটিকাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। সেখানে ১৯৮০-এর দশকে বছরে ৫৩ বিলিয়ন টন বরফ হারালেও ২০১০-এর দশকে তা বেড়ে হয় ২২২ বিলিয়ন টন। ১৯৯০-এর দশক থেকেই বরফ হারানোর গতি আরো তীব্র হতে শুরু করে।
এর পেছনে প্রধান কারণ উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন। শিল্প উৎপাদন ও কৃষিসহ মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনও জানিয়েছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে প্রায় ২০০ দেশ এই সীমার মধ্যে উষ্ণায়ন ধরে রাখার চেষ্টা করার অঙ্গীকার করেছিল।
গবেষকদের মতে, স্যাটেলাইট তথ্য এখন মহাদেশজুড়ে প্রতিবছরের পরিবর্তন দেখাতে পারছে। এতে জলবায়ুর মডেল যাচাই ও ভবিষ্যৎ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা কমানো সম্ভব। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের টাইলার সাটারলি বলেন, দীর্ঘ সময়ের তথ্য, বেশি গবেষক দলের অংশগ্রহণ ও অনিশ্চয়তা নিরূপণের উন্নতির কারণে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী বরফস্তর মূল্যায়ন।
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার বিজ্ঞানী দিয়েগো ফের্নান্দেসও ভবিষ্যতে ক্রায়োস্যাট-২ ও সেন্টিনেলসহ স্যাটেলাইট অভিযান চালু রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। নাসা ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার সহায়তায় করা গবেষণাটি ‘সায়েন্টিফিক ডেটা’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
—স্পেসডটকম