শৈশব বিলাস: খেলনার বাজারে ‘কিডাল্ট’দের রাজত্ব

কল্পকাহিনীর চরিত্র পিটার প্যানের মতোই কিছু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ শৈশবের বৃত্তেই বন্দি থাকতে ভালোবাসেন। তারা বড়দের স্বাভাবিক দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা এড়িয়ে এক ধরনের মুক্ত ও ক্রীড়ামোদ আমেজ বজায় রাখতে চান

লন্ডনের বিখ্যাত সেলফ্রিজেস ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের একটি কাউন্টারে উপচে পড়া ভিড়। সেখানে হাসিমুখের কিছু প্লাশ টয় বা নরম তুলতুলে খেলনা বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা ১০ মিনিটের স্লট বুক করে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এ ‘অমিউজেবলস’ নামের খেলনাগুলো কেনার জন্য। চমকপ্রদ তথ্য হলো, ক্রেতারা তাদের ঘরের শিশুদের জন্য নয়, খেলনাগুলো কিনছেন নিজেদের জন্য।

অন্যদিকে, এশিয়ার বিভিন্ন শহরের নামী রেস্তোরাঁ ও কনভেনশন সেন্টারগুলোয় দেখা যাচ্ছে আরেক দৃশ্য। ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী একদল কর্মজীবী তরুণ-তরুণী গোল হয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছেন। তাদের সামনে টেবিলের ওপরের এক বিশেষ স্টেডিয়ামে প্রচণ্ড গতিতে একে অপরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে মেটালের তৈরি আধুনিক লাটিম, যার নাম ‘বেব্লেড’।

ছবি: সিএনএন

বিশ্বজুড়ে এখন এক নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক ট্রেন্ডের জোয়ার বইছে, যার নাম ‘কিডাল্টহুড’। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও যাদের মন থেকে এখনো শৈশবের খেলনাপ্রীতি মুছে যায়নি, তাদেরই বলা হচ্ছে ‘কিডাল্ট’। বিশ্ব খেলনা বাজারের বড় অংশ এখন বড়দের পকেটের ওপর ভর করে টিকে রয়েছে।

লকডাউন ও খেলনা বাজারের মোড় পরিবর্তন

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সারকানা’র নির্বাহী পরিচালক মেলিসা সাইমন্ডসের মতে, খেলনা বাজারের মোট বিক্রির এক বিশাল অংশ এখন প্রাপ্তবয়স্কদের দখলে। যুক্তরাজ্যে সর্বশেষ ১২ মাসে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কেনা খেলনার বাজার মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৩ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ড, যা মোট খেলনা বাজারের প্রায় ১৮ শতাংশ। চার বছর আগেও এই হার ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ।

মেলিসা জানান, খেলনার বাজারে বড়দের আধিপত্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে কভিড-১৯ লকডাউন। ঘরবন্দি মানুষ বাইরের বিনোদন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায়, ঘরে বসে পাজল মেলানো, বোর্ড গেম খেলা কিংবা নস্টালজিক পণ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সময় কাটাতে শুরু করে। লকডাউন কেটে গেলেও সেই অভ্যাস চলে যায়নি, বরং দিন দিন বাড়ছে।

নস্টালজিয়া ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মেলবন্ধন

খেলনা শিল্পে মূলত ১২ বছরের বেশি বয়সী কেউ যখন নিজের জন্য খেলনা বা গেম কেনে, তখন তাকে ‘কিডাল্ট’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ধারার বাণিজ্যিক গুরুত্ব এতটাই বেড়েছে যে, বিশ্ববিখ্যাত খেলনা প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘লেগো’ তাদের ওয়েবসাইটে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বদের জন্য বিশেষ সেকশন চালু করেছে।

একইভাবে, জাপানি প্রতিষ্ঠান তাকারা টমি তাদের ১৯৯৯ সালের বিখ্যাত খেলনা ‘বেব্লেড’-কে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিয়ে বাজারে এনেছে ‘বেব্লেড এক্স’ নামে। ছোটবেলার সেই সস্তা প্লাস্টিকের লাটিমকে বদলে এখন ভারী মেটাল গিয়ার ও স্টেডিয়ামে বিশেষ গতির রেললাইন ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে এটি এখন আর কেবল বাচ্চাদের খেলনা নয়, বরং প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে একটি রোমাঞ্চকর ‘মেকানিক্যাল স্পোর্টস’ হিসেবে রূপ নিয়েছে। ২০০০ সালের দিকে যে শিশুরা একটা বেব্লেডের জন্য বাবা-মায়ের কাছে বায়না ধরত, তারা এখন চাকরিজীবী। নিজস্ব আয় থাকায় তারা অনায়াসেই প্রিমিয়াম কোয়ালিটির বিদেশি খেলনা ও গেম নিজেদের জন্য কিনছেন।

মানসিক চাপ মুক্তি ও ‘পিটার প্যান সিনড্রোম’

প্রাপ্তবয়স্কদের খেলনাপ্রীতির পেছনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। লেগোর গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ৯ জনই স্বীকার করেছেন লেগো ব্লক দিয়ে বিভিন্ন কাঠামো তৈরি বা খেলনা নিয়ে সময় কাটানো তাদের মানসিক দুশ্চিন্তা ও চাপ কমাতে সাহায্য করে।

যুক্তরাজ্যের চেস্টার ইউনিভার্সিটির সিনিয়র লেকচারার ড. জুলি কার্কহ্যাম এ বিষয়টিকে মনস্তত্ত্বের ‘পিটার প্যান সিনড্রোম’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। কল্পকাহিনীর চরিত্র পিটার প্যানের মতোই কিছু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ শৈশবের বৃত্তেই বন্দি থাকতে ভালোবাসেন। তারা বড়দের স্বাভাবিক দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা এড়িয়ে এক ধরনের মুক্ত ও ক্রীড়ামোদ আমেজ বজায় রাখতে চান।

পাশাপাশি সাইকোঅ্যানালিস্ট ডোনাল্ড উইনিকটের ‘ট্রানজিশনাল অবজেক্ট’ বা রূপান্তরকালীন বস্তুর তত্ত্বটিও এখানে প্রাসঙ্গিক। শৈশবে যেমন একটি নরম কাঁথা বা পুতুল শিশুকে একা থাকার ভয় কাটিয়ে উঠতে মানসিক স্বস্তি দেয়, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও যেকোনো প্রিয় খেলনা শৈশবের নিরাপদ ও আরামদায়ক স্মৃতির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে।

পছন্দের তালিকায় যা রয়েছে

কিডাল্টদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে লেগোর তৈরি ফুলের তোড়া বা উদ্ভিদের রেপ্লিকা সেট, আধুনিক বেব্লেড এক্স, এবং পপ মার্টের তৈরি অদ্ভুত-কিউট চেহারার ‘লাবুবু পুতুল’। এছাড়া পপ কালচার, জনপ্রিয় সিনেমা ও টিভি সিরিজের স্মারক বা মেমোরেবিলিয়ার চাহিদাও আকাশচুম্বী। হ্যারি পটার, ডক্টর হু কিংবা আশির দশকের প্রেক্ষাপটে তৈরি ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’ সিরিজের নস্টালজিয়াও বড়দের খেলনা কিনতে দারুণভাবে প্ররোচিত করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পারস্পরিক বন্ধন

ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো কিডাল্টদের জন্য নিজেদের শখ প্রকাশের একটি নিরাপদ ও বৈষম্যহীন জায়গা তৈরি করে দিয়েছে। ড. কার্কহ্যামের মতে, যখন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তার খেলনা সংগ্রহের ছবি বা বেব্লেড টুর্নামেন্টের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেন এবং সেখানে লাইক বা কমেন্ট পান, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা তাকে মানসিকভাবে আনন্দিত করে। একই সাথে এটি একটি সমমনা কমিউনিটি গড়ে তোলে।

তবে কিডাল্ট সংস্কৃতির সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো এটি বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করছে। ব্রিটিশ খেলনা ও শখ অ্যাসোসিয়েশনের রেবেকা ডিমিং-মিচেল বলেন, বোর্ড গেম বা পাজল খেলার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি সব বয়সের মানুষের জন্য উন্মুক্ত। এর মাধ্যমে নাতি-নাতনি থেকে শুরু করে দাদা-দাদী পর্যন্ত পরিবারের সবাই একসাথে মোবাইল স্ক্রিন থেকে দূরে থেকে মানসম্পন্ন সময় কাটাতে পারছেন।

আরও