লরেন্সের চোখে ইংল্যান্ড— শিল্পবিপ্লব, শহর ও মানুষের সম্পর্ক

লরেন্সের ভাষায় শিল্পবিপ্লব মানুষকে অনেক কিছু দিলেও হারাতে হয়েছে অনেক কিছু। মানুষ হারিয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব, এবং জীবনের থেকে ছন্দ।

একদিকে সবুজ মাঠ, নদী, খামার আর গ্রামের শান্ত জীবন। অন্যদিকে ধোঁয়া ওঠা চিমনি, কয়লাখনি, কারখানা, রেললাইন আর শ্রমিকদের ঘনবসতি। ঊনিশ শতকের ইংল্যান্ডে যেন একইসঙ্গে দুটি ভিন্ন সময় চলছিল। একটিতে মানুষের সম্পর্ক মাটি ও প্রকৃতির সঙ্গে, অন্যটির সঙ্গে যন্ত্র, শ্রম ও উৎপাদনের। ডি এইচ লরেন্স সেই বদলে যাওয়া ইংল্যান্ডকেই দেখেছিলেন খুব কাছ থেকে।

১৮৮৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নটিংহ্যামশায়ারের ইস্টউডে জন্মেছিলেন লরেন্স। তার বাবা ছিলেন কয়লাখনির শ্রমিক। ফলে শিল্পায়নের এ গল্প তার নিজের গল্পও বলা চলে। ছোটবেলা থেকেই লরেন্স দেখেছেন খনিশহরের মানুষের জীবন, শ্রমিকদের ঘরবাড়ি, খনির চারপাশের পরিবেশ এবং মানুষের সম্পর্ক। তার নিজের বেড়ে উঠার দৃশ্যই পরবর্তী সময়ে তার লেখার অংশ হয়ে ওঠে।

লরেন্সের লেখা ইংল্যান্ডের শহুরে মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত। সড়ক, কারখানা, খনি, ধোঁয়া আর শ্রমিকের বাড়ি সবকিছুই মানুষের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে।

তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘সনস এন্ড লাভারস’-এ কয়লাখনি ঘিরে যে জীবন দেখা যায়, সেখানে কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। সেখানে অর্থনীতি, সম্পর্ক, আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যৎও সবকিছু নির্ভর করে খনির ওপর।

শিল্পবিপ্লব ইংল্যান্ডের শহরগুলোকে দ্রুত বদলে দিয়েছিল। কৃষিনির্ভর জীবন থেকে মানুষ ক্রমে কারখানাকেন্দ্রিক জীবনে ঢুকে পড়ে। গ্রাম থেকে শহরে আসে শ্রমিকরা। রেললাইন বাড়ে, নতুন বসতি তৈরি হয়, কারখানার চারপাশে গড়ে ওঠে শ্রমজীবী মানুষের এলাকা।

এর ফলে শহরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও আগের মতো থাকল না। শহর হয়ে গেল জীবিকা ও শ্রমের জায়গা। মানুষের জীবন ক্রমে নিজের স্বাভাবিক ছক বদলে শিল্পব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করল।

লরেন্সের ‘দ্য রেইনবো’-তে এ পরিবর্তন খুব ভালোভাবে দেখা যায়। ব্র্যাংওয়েন পরিবারের কয়েক প্রজন্মের গল্প দেখতে পাই আমরা। সেখান থেকে জানতে পারি কীভাবে একটি কৃষিনির্ভর সমাজ ধীরে ধীরে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পুরোনো গ্রামের জায়গা দখল করে নতুন যোগাযোগব্যবস্থা, যন্ত্র ও শিল্প গড়ে উঠছে। আর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনও।

লরেন্সের ‘ইংল্যান্ড, মাই ইংল্যান্ড অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ ছোটগল্পের সংকলনেও এক নতুন ইংল্যান্ডের ছবি পাওয়া যায়। ট্রামলাইন, শ্রমিকের বসতি, রেলপথ, খাল, দোকান ও কারখানা সব মিলে তৈরি হতে থাকে নতুন ইংল্যান্ড।

লরেন্সের ভাষায় শিল্পবিপ্লব মানুষকে অনেক কিছু দিলেও হারাতে হয়েছে অনেক কিছু। মানুষ হারিয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং জীবনের থেকে ছন্দ।

এরপরও লরেন্সের ইংল্যান্ড শুধু কয়লা, কারখানা কিংবা শহর তৈরির ইতিহাস নয়, এটি মানুষের পরিবর্তনের ইতিহাসও। একটি দেশ যখন গ্রাম থেকে শহরে, কৃষি থেকে শিল্পে, প্রকৃতি থেকে যন্ত্রের দিকে এগিয়ে যায়, মানুষও বদলে যায়।

আরও