জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ দিন দিন আরো তীব্র হচ্ছে। এতে মানুষের পাশাপাশি চিড়িয়াখানায় থাকা প্রাণীদের নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। অতিরিক্ত গরমে প্রাণীদের নিরাপদ রাখতে চিড়িয়াখানাগুলোর বর্তমান ব্যবস্থা যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
সম্প্রতি জাপানের টোকিওর তামা চিড়িয়াখানায় তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে তিনটি সিংহীর মৃত্যু হয়েছে। ওই সময় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচণ্ড পানিশূন্যতা ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ অকেজো হয়ে যাওয়ার (মাল্টিপল অর্গান ফেইলিয়র) কারণে মুগি, ইচিগো ও লুয়েনা নামের সিংহী তিনটির মৃত্যু হয়। চিকিৎসকেরা হিটস্ট্রোককেই মৃত্যুর প্রধান কারণ বলে ধারণা করছেন।
অসুস্থ আরো কয়েকটি সিংহকে বাঁচাতে চিড়িয়াখানার কর্মীরা বড় পাখা, পানি স্প্রে ও স্যালাইন ব্যবহার করে চেষ্টা চালান। পরিস্থিতির অবনতি হলে সাময়িকভাবে সিংহ প্রদর্শনীর এলাকা দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়। এ ঘটনার তদন্ত এখনো চলছে। তবে ঘটনাটি মানুষের তত্ত্বাবধানে থাকা প্রাণীরা দ্রুত বদলে যাওয়া জলবায়ুতে কতটা নিরাপদ থাকবে, সেই প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
সিংহকে সাধারণত আফ্রিকার গরম ও শুষ্ক পরিবেশের প্রাণী হিসেবে পরিচিত। তাই প্রচণ্ড গরমে তাদের সমস্যা হওয়ার কথা নয়—এমন ধারণা অনেকের। কিন্তু প্রাণীদের তাপ সহ্য ক্ষ্মতার বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
তাপমাত্রার পাশাপাশি বাতাসের আর্দ্রতাও গুরুত্বপূর্ণ। সিংহসহ অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণী মানুষের মতো শরীরের বেশির ভাগ অংশ দিয়ে ঘামতে পারে না। শরীর ঠান্ডা রাখতে তারা ছায়ায় আশ্রয় নেয়, চলাফেরা কমিয়ে দেয় কিংবা হাঁপাতে থাকে। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি হলে এসব পদ্ধতিও কম কার্যকর হয়ে পড়ে।
বন্য পরিবেশে সিংহের গরম থেকে বাঁচার সুযোগ তুলনামূলক বেশি। তারা বড় এলাকায় চলাফেরা করে ঠান্ডা জায়গা খুঁজে নিতে পারে, ছায়ায় বিশ্রাম নিতে পারে। চিড়িয়াখানায় থাকা প্রাণীদের এমন সুযোগ সীমিত থাকে। বেষ্টনীর আকার ও নকশা তাদের পছন্দমতো ঠান্ডা জায়গা বেছে নেয়ার সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে।
শুধু সিংহ নয়, আরো অনেক প্রাণী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। মেরু ভালুক, পেঙ্গুইন ও লাল পান্ডার মতো ঠান্ডা পরিবেশে অভ্যস্ত প্রাণীদের ঝুঁকি সহজেই বোঝা যায়। তবে গরম অঞ্চলের প্রাণীরাও তীব্র তাপ থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
গরিলা, ট্যাপির, চিতা ও হাতির মতো প্রাণীরাও অতিরিক্ত তাপ ও আর্দ্রতার কারণে শারীরিক চাপের মুখে পড়তে পারে। আর্দ্রতা বেশি হলে শরীর থেকে তাপ বের করে দেয়া কঠিন হয়ে যায়। বড় দেহের কারণে হাতির ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো বেশি হতে পারে। পর্যাপ্ত ছায়া, পানি ও শরীর ঠান্ডা করার ব্যবস্থা না থাকলে পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে।
বদলে যাচ্ছে প্রাণী কল্যাণের ধারণা
শীতপ্রধান বা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের অনেক চিড়িয়াখানা মূলত ঠান্ডা ও বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়েছে। প্রাণীদের শীত থেকে রক্ষায় সেখানে নানা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত গরমকে এতদিন তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেই ধারণা এখন বদলে দিচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহের সংখ্যা, স্থায়িত্ব ও তীব্রতা বাড়ছে। ফলে ১০ বা ২০ বছর আগে যে ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল, বর্তমান ও ভবিষ্যতের আবহাওয়ার জন্য তা আর যথেষ্ট নাও হতে পারে।
চিড়িয়াখানাগুলোকে তাই আরো ছায়ার ব্যবস্থা, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত আশ্রয়, উন্নত বায়ু চলাচল, পানি ছিটানোর ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত পানির সুযোগ তৈরি করতে হতে পারে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।
একই প্রজাতির দুটি প্রাণী একই পরিবেশে থেকেও গরমের প্রতিক্রিয়া ভিন্নভাবে দেখাতে পারে। বয়স্ক প্রাণী এবং শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বা অন্য শারীরিক জটিলতা থাকা প্রাণীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে। চিড়িয়াখানায় প্রতিটি প্রাণীর স্বাস্থ্য, আচরণ ও সামাজিক সম্পর্কের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব।
আচরণে মিলতে পারে আগাম সতর্কতা
অতিরিক্ত গরমে কোনো প্রাণী অস্বাভাবিকভাবে অলস হয়ে পড়লে, একা থাকতে চাইলে বা আশপাশের পরিবেশে আগ্রহ হারালে তা অস্বস্তির লক্ষণ হতে পারে। খাবারের পরিমাণ কমে যাওয়া, চলাফেরার ধরন বদলে যাওয়া কিংবা অন্য প্রাণীর সঙ্গে আচরণ পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
তাই চরম তাপপ্রবাহকে এখন ঝড়, বন্যা বা রোগের মতোই প্রাণী কল্যাণের সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শুধু চিড়িয়াখানা নয়, খামার, বন্য প্রাণী উদ্যান, উদ্ধারকেন্দ্র ও পোষা প্রাণীর মালিকদেরও ভবিষ্যতে তীব্র গরম মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে হবে।
টোকিওর তামা চিড়িয়াখানায় তিন সিংহীর মৃত্যু দেখিয়ে দিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে প্রাণীদের সুরক্ষায় নতুন করে প্রস্তুতি নেয়া কতটা জরুরি। ভবিষ্যতের চিড়িয়াখানাগুলোকে তাই শুধু প্রাণীদের জন্য নিরাপদ জায়গা নয়, পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার মতো পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রাণী কল্যাণবিষয়ক গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু পরিবেশ নয়, সেই পরিবেশে প্রাণীর কতটা স্বাধীনতা রয়েছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রাণী নিজের মতো করে ছায়া, পানি বা ঠান্ডা জায়গা বেছে নিতে পারছে কি না, সেটি তার সুস্থতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
—জাপান টুডে অবলম্বনে