অস্তিত্ব সংকটে গঙ্গা নদীর ৬ হাজারের বেশি ডলফিন

ভারতের বন্যপ্রাণী ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ১০টি রাজ্যের ৫৮টি নদীতে সমীক্ষা চালিয়ে প্রথমবারের মতো ডলফিনের পূর্ণাঙ্গ গণনা করেছেন।

ভারতের দীর্ঘতম নদী গঙ্গা কয়েক হাজার ডলফিনের আবাসস্থল। কিন্তু এ ডলফিনগুলোর অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। খবর বিবিসি

এগুলো গাঙ্গেয় ডলফিন নামে পরিচিত। এদের দেখা মেলে ভারতের উত্তরাঞ্চলে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায়। এরা অনেকটা লম্বাটে বা চোঙার মতো মুখের হয়ে থাকে। এগুলো সমুদ্রের ডলফিনের মতো দীর্ঘ সময় পানির ওপর ভেসে থাকতে পারে না বা লাফ দিয়ে শূন্যে ভেসে উঠতে পারে না। এরা সাধারণত এক পাশ হয়ে বা কাত হয়ে সাঁতার কাটে। বেশিরভাগ সময় এদের কাটে পানির নিচে এবং এরা মূলত অন্ধ হয়ে থাকে। ভারতের জাতীয় জলজ প্রাণী এ গাঙ্গেয় ডলফিন।

নতুন এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভারতের নদীগুলোতে থাকা প্রায় ৬ হাজার ৩২৭টি ডলফিনের মধ্যে ৬ হাজার ৩২৪টি গাঙ্গেয় এবং মাত্র তিনটি সিন্ধু ডলফিন। সিন্ধু নদীর বেশিরভাগ ডলফিন পাকিস্তানে পাওয়া যায়। তবে দুই দেশেই সিন্ধু নদীর অববাহিকা থাকায় ভারত ও পাকিস্তানে এ ডলফিন পাওয়া যায়।

এ দুই প্রজাতির ডলফিনকেই ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) বিপন্ন হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে।

ভারতের বন্যপ্রাণী ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ১০টি রাজ্যের ৫৮টি নদীতে সমীক্ষা চালিয়ে প্রথমবারের মতো ডলফিনের পূর্ণাঙ্গ গণনা করেছেন।

নদীতে থাকা ডলফিনগুলোর উৎপত্তি ও বিবর্তনের ইতিহাস এ প্রাণীগুলোর মতোই মনোমুগ্ধকর। বিজ্ঞানীরা এদেরকে জীবন্ত জীবাশ্ম হিসেবে অভিহিত করে। ধারণা করা হয়, এরা লাখ লাখ বছর আগে এদের সামুদ্রিক পূর্বপুরুষদের থেকে বিবর্তিত হয়েছে।

এক সময় যখন দক্ষিণ এশিয়ার নিম্নভূমি সমুদ্রের পানিতে প্লাবিত হয়েছিল, তখন ডলফিনগুলো নদীতে চলে আসে। পরে সমুদ্রের পানি নেমে গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীর ঘোলাটে, কাদাময়, অগভীর পানিতে খাপ খাইয়ে নেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, নতুন এ সমীক্ষা নদীর ডলফিনের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৫০০ ডলফিন মারা গেছে। যেগুলো হয় দুর্ঘটনাক্রমে জালে আটকে বা ইচ্ছাকৃতভাবে মারা হয়েছে।

প্রাণী সংরক্ষণবাদী রবীন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, দুই হাজার সালের আগ পর্যন্ত নদীর ডলফিন সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা খুব কম ছিল। ২০০৯ সালে গাঙ্গেয় ডলফিনকে বাঁচাতে ভারত জাতীয় জলজ প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ২০২০ সালের একটি কর্মপরিকল্পনা এবং ২০২৪ সালে একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করে, যা ডলফিনের সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করেছে।

তবে সংরক্ষণবাদীদের মতে, এখনো অনেক পথ বাকি আছে। মাংস, তেল ও চর্বির জন্য নির্বিচারে ডলফিন শিকার করা হচ্ছে। আবার কখনো কখনো মাছ ধরার নৌকার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বা জালে আটকেও অনেক ডলফিন মারা যায়।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ট্রাস্টের নচিকেত কেলকার স্যাংচুয়ারি এশিয়া ম্যাগাজিনকে বলেন, অনেক জেলে আইনি ঝামেলার ভয়ে ডলফিনের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর খবর জানাতে চায় না।

ভারতীয় বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী, দুর্ঘটনাজনিত কারণে বা ইচ্ছাকৃতভাবে ডলফিন শিকারকে হত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির অনুমোদন রয়েছে। তাই অনেক দরিদ্র জেলে জরিমানা এড়াতে চুপচাপ ডলফিনের মৃতদেহ সরিয়ে ফেলে।

গত এক দশকে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীতে রিভার ক্রুজ ট্যুরিজম বেড়ে যাওয়ায় ডলফিনের বাসস্থান আরো হুমকির মুখে পড়েছে।

রবীন্দ্র কুমার সিনহা দ্য গার্ডিয়ানকে জানান, ডলফিন শব্দের প্রতি সংবেদনশীল। যদি এভাবে রিভার ক্রুজ ট্যুরিজমের সংখ্যা বাড়তে থাকে তাহলে একটা সময়ের পর চীনের ইয়াংজি নদীর বাইজি প্রজাতির ডলফিনের মতো গাঙ্গেয় ডলফিনও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

নদীর ডলফিন এমনিতেই তাদের বিবর্তনের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। তার ওপর তারা প্রায় অন্ধ হওয়ার কারণে চলাচলের জন্য ইকোলোকেশন বা উচ্চ কম্পাঙ্ক ব্যবহার করে। এ পদ্ধতি পানিতে উপযোগী হলেও বর্তমান সময়ে নতুন নতুন হুমকির সম্মুখীন করছে। অন্যদিকে তাদের প্রজনন হারও অন্যান্য প্রজাতির তুলনায় কম। সাধারণত তারা ৬ থেকে ১০ বছর বয়সে প্রজননক্ষম হয় এবং প্রতি ২-৩ বছরে মাত্র একটি বাচ্চা জন্ম দেয়।

তবু রবীন্দ্র কুমার সিনহা আশাবাদী। তিনি বলেন, সরকারি উদ্যোগ ডলফিন রক্ষায় বড় ভূমিকা রেখেছে। অনেক কিছুই হয়েছে, তবে এখনো অনেক কিছু করার বাকি আছে।

আরও