সংস্কারের শিকল ভাঙছে নাইজেরিয়ান নারী ফুটবল দল

২০০৭ সালে নিরাপত্তার অজুহাতে নারীদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ করে ফিফা। যার কারণে ২০১২ সালের অলিম্পিক বাছাইপর্বে বাদ পড়ে ইরানের নারী ফুটবল দল। তবে নারী ফুটবলে ধর্মীয় স্বাধীনতার লড়াই চলতেই থাকে। অবশেষে ২০১৪ সালে হিজাব পরিধান বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় ফিফা।

কওয়ারা, নাইজেরিয়ার উত্তর-মধ্যাঞ্চলের রাজ্য। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসারে এখানে জীবনের প্রতিটি স্তরে শালীনতা ও আনুগত্যের নিয়মে বাঁধা নারীদের জীবন। কিন্তু ধর্মীয় বিধিনিষেধ মেনেই এখানকার একদল তরুণী ফুটবলকে বেছে নিয়েছে চ্যালেঞ্জ হিসেবে।

১৭ বছর বয়সী মারিয়াম মুহাম্মদ তাদের একজন। রোজ বিকালে হিজাব ও লেগিংস পরে মডেল কুইন্স ফুটবল একাডেমিতে অনুশীলনে যান তিনি। পথে সঙ্গী হয় মানুষের ঠাট্টা আর সমালোচনা। তবে তার চলার গতি শ্লথ হয় না। বরং অন্যদের নেতিবাচক মন্তব্য মারিয়ামকে লক্ষ্যপূরণে জেদি করে তোলে।

নিজের স্বপ্নপূরণের বিষয়ে মারিয়াম বলেন, নাইজেরিয়ার তীব্র গরমে হিজাব পরে দৌড়ানো কষ্টকর। মুখ বেয়ে ঘাম ঝরতে থাকে। কিন্তু হিজাব ত্যাগের প্রশ্নই আসে না। আদর্শ মুসলিম হিসেবে হিজাবকে অহংকার ও অলংকার মনে করেন মারিয়াম ও তার সঙ্গীরা।

এক সময় আন্তর্জাতিক ফুটবলেও এ পোশাক ছিল বড় বাধা। ২০০৭ সালে নিরাপত্তার অজুহাতে নারীদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ করে ফিফা। যার কারণে ২০১২ সালের অলিম্পিক বাছাইপর্বে বাদ পড়ে ইরানের নারী ফুটবল দল। তবে নারী ফুটবলে ধর্মীয় স্বাধীনতার লড়াই চলতেই থাকে। অবশেষে ২০১৪ সালে হিজাব পরিধান বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় ফিফা। প্রায় এক দশক পর, ২০২৩ সালের নারী বিশ্বকাপে মরক্কোর নুহাইলা বেঞ্জিনা প্রথম হিজাব পরিহিতা নারী খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে ইতিহাস গড়েন। এ পরিবর্তনের ঢেউ এসে লেগেছে নাইজেরিয়ার কওয়ারার মেয়েদের মনেও।

সমাজের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে মেয়েকে সমর্থন করছেন মারিয়ামের মা কেহিন্দে মুহাম্মদ। মেয়ের ভেতরে থাকা আগুনকে জ্বলে উঠতে দেখার অপেক্ষায় আছেন তিনি। এমনকি মেয়ের দলের জার্সির সঙ্গে মানানসই বিশেষ হিজাবও নিজ হাতে তৈরি করে দেন। মেয়েকে তিনি বলেন, ‘হিজাব তোমার পরিচয়—তুমি খেলো, কিন্তু তোমার ধর্মীয় মূল্যবোধ যেন অটুট থাকে।’

যদিও সব অভিভাবক মারিয়ামের মায়ের মতো এতটা সহনশীল নন। মাঠের পাশাপাশি ঘরেও লড়াই করতে হয় নাইজেরিয়ান নারী ফুটবলারদের। এ বিষয়ে দলের কোচ মুইহিদিন আবদুলওয়াহাব বলেন, ‘আমরা নিয়মিত অভিভাবকদের সঙ্গে দেখা করি, বুঝিয়ে বলি—শালীন পোশাকে ফুটবল খেলা ইসলামবিরোধী নয়। তবে তা এখনো অনেকেই মানতে চান না।’

মডেল কুইন্স দলের আরেক সদস্য বাসিরাত ওমোটোশো। ১৯ বছর বয়সী এ ফুটবল খেলোয়াড়কে খেলার পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বও পালন করতে হয়। প্রতিদিন সকালে মায়ের সঙ্গে বসে ‘পাফ পাফ’ নামের মিষ্টি বিক্রি করে সে। খেলার জন্য মায়ের অনুমতি পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাকে। তবে মেয়ের একাগ্রতা আর নাইজেরিয়ার তারকা খেলোয়াড় আসিসাত ওশওয়ালার সাফল্য দেখে অনুমতি দিতে বাধ্য হন মা।

তবে কওয়ারা ও উত্তর নাইজেরিয়ায় এখনো নারী ফুটবলের পথ সহজ নয়। স্থানীয় প্রশাসক আম্বালি আবদুলরাজাক জানান, খেলায় মেয়েদের আগ্রহ বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু অংশগ্রহণের হার এখনো কম। সামাজিক অনুমোদনই সবচেয়ে বড় বাধা। নাইজেরিয়া উইমেনস ফুটবল লিগ আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী হলেও এর পেছনে রয়েছে নানান চ্যালেঞ্জ।

এরমাঝেও নাইজেরিয়ায় নারী ফুটবলে বিপ্লব ঘটছে। দেশজুড়ে নারী ফুটবলের জনপ্রিয়তার সঙ্গে বাড়ছে জাতীয় দলের সাফল্য। নতুন স্পন্সর ও সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচি বাড়ছে। নাইজেরিয়ান মিডিয়া কোম্পানির তথ্যমতে, ২০২০ সালের পর থেকে নারী ফুটবল লিগের দর্শক বেড়েছে ৪০ শতাংশ, আর মাঠে উপস্থিত দর্শকের সংখ্যা বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। নানামুখী বাধা পেরিয়ে নাইজেরিয়ার মেয়েরা শুধু ফুটবলই খেলছে না, বরং এক নীরব বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

রয়টার্স অবলম্বনে

আরও