শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী

শিশুর পান্তার থালা যখন রাজনীতির পাঠ

একটি শিশুর পান্তাভাতের থালা ফিরিয়ে দেয়ার গল্প আর একটি প্রদেশের কৃষিঋণ সংকট মোকাবেলার এক নয়। প্রথমটি স্মৃতিচারণায় সংরক্ষিত একটি ঘটনা, দ্বিতীয়টি নথিবদ্ধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু দুটির মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে, ঋণ যখন মানুষের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদাকে গ্রাস করে, তখন সেই সংকটকে রাজনীতির প্রশ্নে পরিণত করার প্রয়োজন দেখা দেয়

একটি শিশু অঝোরে কাঁদছে। আর সেই কান্নার শব্দে সড়কে থেমে গেল এক রাজনীতিকের ঘোড়ার গাড়ি। শিশুটির সামনে একটি পান্তাভাতের থালা, পেছনে ঋণের বোঝায় সর্বস্বান্ত এক কৃষক পরিবার। সেই সামান্য থালাটিই একদিন এক জনবান্ধব রাজনীতিকের বোঝাপড়ার দুয়ার খুলে দেয়। বাংলার রাজনীতিতে সামনে আসে কৃষক-প্রজার অধিকারের লড়াই।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের জীবনের প্রথম দিকের ঘটনা এটি। বরিশাল থেকে চাখার যাওয়ার পথে একটি কুঁড়েঘরের সামনে শিশুর আর্তচিৎকার শুনে গাড়ি থামিয়েছিলেন তিনি। ঘরের ভেতর সাত বছরের শিশু কেরামত কাঁদছিল। তার কান্নার কারণ, কেউ তার পান্তাভাতের থালাটি কেড়ে নিতে চাইছে।

পরিবারের কর্তা ফরিদ একসময় সাত বিঘা জমির মালিক ছিলেন। ঋণ শোধ করতে একে একে সেই জমির সবটুকুই চলে গেছে মহাজন মহিম সরকারের হাতে। এবার ঋণ আদায়ের নামে ঘরের শেষ সম্বলটুকুও নিলামে তোলার আয়োজন চলছে। এরই মধ্যে ছাগল ও দুটি পিতলের থালা নিয়ে গেছে মহাজনের লোকজন। এবার হাত পড়েছে শিশুটির খাবারের থালায়।

ঘটনাটি শুনে ফজলুল হক শিশুটির থালা ফিরিয়ে দিতে পাঁচ টাকা দেন। এরপর পরিবারটির ঋণ পরিশোধ করে অন্য জিনিসপত্রও ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। ফেরার পথে তার মুখে আর কোনো কথা ছিল না। চাখারে পৌঁছে উপলব্ধি করেছিলেন, ঋণের বোঝা কীভাবে একটি কৃষক পরিবারকে নিঃস্ব করে দিতে পারে।

ঘটনাটি পাওয়া যায় ইব্রাহিম খানের বর্ণনার সূত্রে, যার বিস্তারিত প্রকাশ হয় ১৯৬৯ সালে ফজলুল হকের মৃত্যুর অষ্টম বার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত একটি স্মারকগ্রন্থে। গল্পটির কেন্দ্রে থাকা শিশুটির থালাটি বাংলার গ্রামীণ দারিদ্র্যের এক গভীর বাস্তবতাকে সামনে আনে। বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার কৃষকের সংকট শুধু ফসলের ফলন বা জমির মালিকানায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ঋণ, চড়া সুদ, জমি হারানো এবং মহাজনী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা অনেক কৃষক পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দা সেই সংকটকে আরো তীব্র করে। কৃষকের এই দুর্দশা থেকেই বাংলার রাজনীতিতে জমিদারি, কৃষিঋণ ও প্রজাস্বত্বের প্রশ্ন ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

১৯৩৭ সালে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন চালুর পর বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক

ফজলুল হকের রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল সেই কৃষক-প্রজার স্বার্থ। ১৯৩৭ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার সরকার কৃষিঋণের বোঝা কমাতে ঋণ নিষ্পত্তি বোর্ডের কার্যক্রম এগিয়ে নেয়। ১৯৩৫ সালের বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ডেটরস অ্যাক্টের আওতায় গঠিত এসব বোর্ডের উদ্দেশ্য ছিল ঋণগ্রস্ত কৃষক ও ঋণদাতার মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে দেনার পরিমাণ নির্ধারণ এবং পরিশোধের ব্যবস্থা করা। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য সীমাহীন ছিল না। প্রশাসনিক জটিলতা ও বাস্তব অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক ঋণ নিষ্পত্তির আবেদন অনিষ্পন্ন থেকে যায়।

একটি শিশুর পান্তাভাতের থালা ফিরিয়ে দেয়ার গল্প আর একটি প্রদেশের কৃষিঋণ সংকট মোকাবেলার এক নয়। প্রথমটি স্মৃতিচারণায় সংরক্ষিত একটি ঘটনা, দ্বিতীয়টি নথিবদ্ধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু দুটির মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে, ঋণ যখন মানুষের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদাকে গ্রাস করে, তখন সেই সংকটকে রাজনীতির প্রশ্নে পরিণত করার প্রয়োজন দেখা দেয়।

শেরেবাংলা ফজলুল হককে মনে রাখার প্রচলিত উপায় তার রাজনৈতিক পদ, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপন কিংবা বাংলার ইতিহাসে তাঁর দীর্ঘ ভূমিকার কথা বলা। কিন্তু তার জীবনের ছোট ছোট ঘটনাও প্রশ্ন তোলে—একজন নেতার রাজনীতির মূল্যায়ন কি শুধু তার ভাষণ ও ক্ষমতার ইতিহাস দিয়ে সম্ভব, নাকি সেই রাজনীতির কেন্দ্রে থাকা মানুষের জীবন দিয়েও তা বিচার করা প্রয়োজন?

১৮৭৩ সালের আজকের দিন অর্থাৎ ২৬ অক্টোবর জন্ম নেন আইনজীবী ও রাজনীতিক শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। তিনি ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। কিন্তু ক্ষমতার ইতিহাসের বাইরেও তার পরিচিতি গড়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের প্রতি উদারতার জন্য। শিক্ষার্থী, অসহায় মানুষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাহায্য করতে গিয়ে নিজের আর্থিক অবস্থাও সংকটে ফেলেছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তাকে প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয়ে সতর্ক করেন। আর এক স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, ফজলুল হক তখন নিজের গলায় চাবুক ঝুলিয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে শাস্তি মেনে নেয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। কৃষকের ঋণমুক্তির প্রশ্ন থেকে জনতার কাছে দায়বদ্ধতার এই নাটকীয় অঙ্গীকার, দুই ঘটনাই তার জনসম্পৃক্ত রাজনীতির ভিন্ন দিক তুলে ধরে।

আরও