মেক্সিকো আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলের খামারগুলোয় ইদানিং এক নীরব আতঙ্ক ভর করেছে। সাধারণ মাছির মতো দেখতে এক ধরনের পরজীবী হানা দিচ্ছে গবাদিপশুর পালে। যেকোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর গায়ের মাংস খুবলে খাওয়া এ পরজীবীর পুনরুত্থান মার্কিন পশুপালকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে।
দেখতে সাধারণ সবুজাভ ব্লোফ্লাইয়ের মতো হলেও নিউ ওয়ার্ল্ড স্ক্রুওয়ার্মের জীবন একেবারেই আলাদা। সাধারণ ‘ব্লোফ্লাই’ মৃত প্রাণীর দেহ পচিয়ে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু স্ক্রুওয়ার্ম বেছে নেয় জীবন্ত প্রাণীকে। গরু, ছাগল, ভেড়া কিংবা অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরে সামান্য ক্ষত, কাটা জায়গা, এমনকি নাক বা কানের ছিদ্র পেলেই সেখানে ডিম পাড়ে স্ত্রী মাছি। মাত্র ৬ থেকে ৭ ঘণ্টার মধ্যেই ডিম ফুটে বের হওয়া লার্ভা প্রাণীগুলোর জীবন্ত মাংস খেতে শুরু করে। শরীরে থাকা ছোট হুকের মতো অংশ দিয়ে তারা ভেতরের দিকে ঢুকে যায়। সেই থেকেই এদের নাম হয়েছে ‘স্ক্রুওয়ার্ম’।
গবাদিপশুর শরীরে মাংসখেকো মাছি, এ কারণে বিভিন্ন দেশ এখন মাংস আমদানিতেও নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে
গবাদিপশু বা অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর একটি ক্ষত থেকেই শুরু হতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে আরো মাছি একই ক্ষতে ডিম পাড়ে। ক্রমেই ক্ষত বড় হতে থাকে, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত প্রাণীটির মৃত্যুও হতে পারে। আর বেঁচে গেলেও চামড়া ও স্বাস্থ্যের স্থায়ী ক্ষতি হয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে এ পরজীবীর কারণে প্রতিবছর কয়েকশ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
তবে এ শত্রুর বিরুদ্ধে মানুষের লড়াইও কম নাটকীয় নয়। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ এমন এক কৌশল নেয়, যা তখন বিশ্বের নজর কাড়ে। গবেষণাগারে কোটি কোটি মাছি উৎপাদন করে সেগুলোকে বন্ধ্যা বানিয়ে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়া হয়। স্ত্রী স্ক্রুওয়ার্ম সাধারণত জীবনে মাত্র একবার মিলিত হয়। ফলে বন্ধ্যা পুরুষের সঙ্গে মিলনের পর আর কোনো বংশবিস্তার সম্ভব হতো না। সে কৌশলই ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্র, পরে নব্বইয়ের দশকে মেক্সিকো এবং ২০০৬ সালে পানামা পর্যন্ত পুরো অঞ্চলকে স্ক্রুওয়ার্মমুক্ত করতে বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু এ সাফল্য স্থায়ী হয়নি। ঠিক কী কারণে প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ল, তার স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
গবেষকদের ধারণা, আক্রান্ত গবাদিপশু এক দেশ থেকে অন্য দেশে পরিবহনের কারণেই পরজীবীটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পানামার উৎপাদনকেন্দ্র এখন আবারো প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০ কোটি বন্ধ্যা মাছি তৈরি করছে।
এরই মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন এক যুদ্ধ। এবার অস্ত্র কীটনাশক নয়, জিনপ্রযুক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির কীটতত্ত্ববিদ ম্যাক্সওয়েল স্কটের গবেষণাগারে অস্ট্রেলিয়ান শিপ ব্লোফ্লাই ব্যবহার করে স্ক্রুওয়ার্মের জিনগত রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা চলছে। লক্ষ্য হলো, আরো কার্যকর, কম ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করা।
নিউ ওয়ার্ল্ড স্ক্রুওয়ার্ম মাছি দেখতে সাধারণ গৃহপালিত মাছির আকারের বা তার চেয়ে সামান্য বড় হয়ে থাকে। এদের চোখ দুটি কমলা রঙের ও শরীর ধাতব নীল কিংবা সবুজ রঙের হয়। ছবি: মার্কিন কৃষি বিভাগ
এবার গবেষকরা এমন একটি জিন তৈরি করেছেন, যা নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক না থাকলে সক্রিয় হয়ে স্ত্রী মাছিকে মেরে ফেলে। ফলে শুধু পুরুষ মাছি উৎপাদন করা সম্ভব হয়। পরে তারা আরো উন্নত একটি প্রযুক্তি তৈরি করেন, যাতে স্ত্রী মাছি লার্ভা হওয়ার আগেই মারা যায়। এতে মাছি উৎপাদনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বর্তমানে এসব প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার জন্য অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
এদিকে এক ধাপ এগিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন ‘জিন ড্রাইভ’ প্রযুক্তি নিয়ে। এ পদ্ধতিতে একটি কাঙ্ক্ষিত জিন প্রায় সব বংশধরের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া যায়। ফলে আগের মতো শত কোটি মাছি ছাড়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে। এ প্রযুক্তি সফল করতে স্ক্রুওয়ার্মের পূর্ণ জিনোম মানচিত্রও তৈরি হয়েছে। ২০২০ সালে প্রথম সংস্করণ প্রকাশের পর ২০২২ ও ২০২৫ সালে তুলনামূলক উন্নত সংস্করণ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ।
একই প্রযুক্তি এরই মধ্যে আরেক ক্ষতিকর ফলমাছির ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন উরুগুয়ের গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে স্ক্রুওয়ার্মের বিরুদ্ধেও একই কৌশল প্রয়োগের প্রস্তুতি চলছে।
ইতিহাস বলছে, মানুষ একবার এ পরজীবীকে পরাজিত করতে পেরেছিল। এখন সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক জিনপ্রযুক্তি, যা নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। তাই বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, সময়মতো সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া গেলে ‘নিউ ওয়ার্ল্ড স্ক্রুওয়ার্ম’ কে আবারো ইতিহাসের পাতায় ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হবে।