কোনো জাদুঘরে গিয়ে কয়েকশ বছরের পুরোনো একটি নিদর্শনের সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতাই আলাদা। ঐতিহাসিক স্মারকটি চোখের সামনে দেখার জন্যই হয়তো দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে যান দর্শনার্থীরা। কিন্তু সেখানে গিয়ে যদি দেখেন, কাঙ্ক্ষিত নিদর্শনটি নেই? এর জায়গায় খালি ডিসপ্লে বাক্স, কিংবা রাখা হয়েছে একটি প্রতিলিপি। ইউরোপের বিভিন্ন জাদুঘরে সাম্প্রতিক একের পর এক চুরির ঘটনায় এমন দৃশ্যই এখন বাস্তব হয়ে উঠছে। আর এসব ঘটনার পর জাদুঘর কর্তৃপক্ষও এখন নতুন করে ভাবছে—মূল্যবান নিদর্শনগুলো দর্শনার্থীদের সামনে কীভাবে রাখা হবে।
লুভরেও নেই সেই বিখ্যাত রত্ন
ফ্রান্সের লুভর জাদুঘরের গ্যালারি দ্যাপোলোঁতে ঢুকলে চোখে পড়বে ছাদজুড়ে আঁকা বিশাল চিত্রকর্ম আর অসাধারণ সব ভাস্কর্য। কিন্তু কিছুদিন আগেও যে মূল্যবান রত্নগুলো সেখানে প্রদর্শিত হতো, এখন সেগুলো আর নেই।
গত জুলাইয়ে গ্যালারিটি আবার খুলেছে। এর প্রায় নয় মাস আগে সেখানে ঘটে যায় বড় ধরনের চুরি। চোরের দল ফ্রান্সের রাজপরিবারের ঐতিহাসিক রত্নভান্ডারের কিছু অংশ নিয়ে পালিয়ে যায়।
চুরি থেকে রক্ষা পাওয়া রত্নগুলো অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সেগুলো কীভাবে আরো নিরাপদে প্রদর্শন করা যায়, তা নিয়ে এখন ভাবছে লুভর কর্তৃপক্ষ।
তবে শুধু লুভর নয়। ইউরোপের আরো অনেক জাদুঘরই একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে।
কয়েক মিনিটেই উধাও হাজার বছরের পুরনো সম্পদ
গত ২৭ আগস্ট স্পেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভিয়েনার একটি জাদুঘরে ঢোকে চোর। মাত্র চার মিনিটের মধ্যে তারা নিয়ে যায় ব্রোঞ্জ যুগের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এর মধ্যে ছিল বাটি, বোতল, ব্রেসলেটসহ প্রায় ১০ কেজি স্বর্ণের জিনিস।
এর দুই সপ্তাহেরও কম সময় পর ফ্রান্সের রিভিয়েরার রেনোয়া জাদুঘরেও চুরি হয়। সেখান থেকে চারটি চিত্রকর্ম নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে চোর। দুটি পরে কাছের বাগান থেকে উদ্ধার করা গেলেও অন্য দুটি এখনো নিখোঁজ।
এর আগে জুলাইয়ে ফ্রান্সের বুরগান্ডির একটি জাদুঘর থেকে চুরি হয় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো ‘ভিক্স টর্ক’। সাধারণ দর্শনার্থী সেজেই জাদুঘরে ঢুকেছিল চোরের দল।
ইউরোপোলের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ ধরনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিছু ঘটনায় চোরেরা হাতুড়ি ও কুঠার দিয়ে কাচের বাক্স ভেঙেছে, কোথাও বিস্ফোরক ব্যবহার করেছে, আবার কোথাও আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে কর্মী ও দর্শনার্থীদের ভয় দেখিয়েছে।
ইউরোপোলের ইউরোপীয় ইউনিয়ন অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের প্রধান জ্যঁ-ইভ গোরিওর মতে, ২০২২-২৩ সালের দিকে শুরু করে জাদুঘরে ডাকাতির ঘটনা স্পষ্টভাবেই বেড়েছে।
জাদুঘর খোলা থাকবে, আবার নিরাপদও থাকতে হবে
জাদুঘরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো—এগুলো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত। কয়েক শ বছর পুরনো কোনো মূর্তি, মমি কিংবা চিত্রকর্মের একেবারে কাছে দাঁড়িয়ে দেখার সুযোগ থাকে দর্শনার্থীদের।
কিন্তু এ উন্মুক্ত পরিবেশই আবার জাদুঘরগুলোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। ইউরোপোলের গোরিও বলছেন, বাজেটের সীমাবদ্ধতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য জাদুঘর খোলা রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
আর নিরাপত্তা বাড়াতে গিয়ে বদলে যাচ্ছে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতাও।
আসলের বদলে প্রতিলিপি?
একটি বড় জাদুঘরে একটি নিদর্শন হারিয়ে গেলে হয়তো অন্য অনেক কিছু দেখার সুযোগ থাকে। কিন্তু ছোট কোনো জাদুঘরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হারানো অনেক বড় বিষয়। ভিয়েনার ‘ট্রেজার অব ভিয়েনা’ এর একটি ভালো উদাহরণ। এটি শুধু জাদুঘরের সংগ্রহ নয়, শহরটির ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ব্রোঞ্জ যুগের স্বর্ণ, রূপা, অ্যাম্বার ও লোহার কয়েক ডজন নিদর্শন প্রায় তিন হাজার বছর মাটির নিচে ছিল। ১৯৬৩ সালে একজন প্রত্নতাত্ত্বিক সেগুলো খুঁজে বের করেন।
একইভাবে বুরগান্ডির ভিক্স টর্কও ছিল ওই জাদুঘরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। প্রায় ৪৮০ গ্রাম ওজনের স্বর্ণের গলার হারটি প্রায় ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মারা যাওয়া এক কেল্টিক নারীর সমাধি থেকে পাওয়া গিয়েছিল।
এই টর্কের দুটি নিখুঁত স্বর্ণের প্রতিলিপি আগে থেকেই তৈরি ছিল। এমনকি আসল টর্কটি অন্য জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য না পাঠিয়ে প্রতিলিপি পাঠানো হয়েছিল।
মূল নিদর্শন খুব মূল্যবান, ভঙ্গুর বা স্থানান্তর করা কঠিন হলে জাদুঘরে প্রতিলিপি ব্যবহারের ঘটনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক চুরির পর এ নিয়ে নতুন করে ভাবছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
ফ্রান্সের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর প্রিভেন্টিভ আর্কিওলজিক্যাল রিসার্চের প্রেসিডেন্ট ডমিনিক গার্সিয়াও জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনায় প্রতিলিপি ব্যবহারের কথা বলেছিলেন।
তবে ফ্রান্সের নতুন জাদুঘর-নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, যেসব আসল নিদর্শন বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলো নিরাপদভাবে প্রদর্শনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে দর্শনার্থীদের চোখের আড়ালে রাখা যেতে পারে।
এরইমধ্যে কিছু জাদুঘর এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৪ সালে বুরগান্ডির মিউজে দ্য ইয়েরোঁতে সশস্ত্র ডাকাতির পর পরিচালক মওদ সিরোঁ জাদুঘরের সবচেয়ে মূল্যবান কিছু শিল্পকর্ম প্রদর্শন বন্ধ করে দেন।
প্যারিসের মিউজে কন্যাক-জেও একটি প্রদর্শনী থেকে মূল্যবান এক জোড়া কানের দুল বাদ দিয়েছে। কাছের মিউজে কার্নাভালেও ২০২৬ সালের একটি প্রদর্শনীতে দামি একটি অলংকারের বদলে তুলনামূলক কম মূল্যের একটি আঁকা ছবি ও কৃত্রিম পাথরের ব্রোচ প্রদর্শন করেছে।
আসল নিদর্শনের আকর্ষণই আলাদা
তবে প্রতিলিপি দেখানো নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ জাদুঘরে মানুষ শুধু কোনো একটি সামগ্রী দেখতে যান না, সেই জিনিসটির সঙ্গে ইতিহাসের একটি সরাসরি যোগ খুঁজে পান।
গ্লোবাল অডিয়েন্স স্ট্র্যাটেজি এজেন্সি এমএইচএমের পরিচালক গাই টারটনের মতে, আসল কোনো নিদর্শন দেখার মধ্যে আলাদা ধরনের অনুভূতি কাজ করে। মনে হয়, বহু বছর আগে অন্য কোনো মানুষও একই জিনিসটি তৈরি করেছেন, ব্যবহার করেছেন কিংবা এর সংস্পর্শে এসেছেন। এই অনুভূতিই অনেকের কাছে জাদুঘর দেখার বিশেষ আকর্ষণ।
তবে প্রতিলিপি দেখানো হলে দর্শনার্থীরা সব সময় তা নেতিবাচকভাবে নেবেন—এমন নয়। শর্ত হলো, কেন আসলটি রাখা হয়নি, সেটি পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে।
জাদুঘর-অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণা করা এলি কিং মনে করেন, আসল নিদর্শনটি চুরি থেকে রক্ষা করার জন্য নিরাপদ জায়গায় রাখা হয়েছে—এ কথা দর্শনার্থীরা বুঝতে পারলে তারা প্রতিলিপি মেনে নিতে পারেন।
দর্শনার্থী আর নিদর্শনের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে পারে
শুধু প্রতিলিপি নয়, আসল নিদর্শনগুলো প্রদর্শনের ধরনও বদলাতে পারে। মূল্যবান কোনো বস্তু দর্শনার্থীদের সামনে রাখলে তার চারপাশে আরো বেশি দূরত্ব তৈরি করা হতে পারে। মোটা কাচের বাক্স, অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী কিংবা আরো বড় বাধা দেখা যেতে পারে।
কিন্তু এতে দর্শনার্থীর অভিজ্ঞতায়ও প্রভাব পড়তে পারে। গাই টারটনের মতে, মানুষ কোনো নিদর্শনের যত কাছে যেতে পারেন, তার খুঁটিনাটি দেখতে এবং বিভিন্ন দিক থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাদের যোগাযোগও তত গভীর হয়। অতিরিক্ত দূরত্ব বা বড় বাধা সেই অনুভূতি কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে।
তবে নিরাপত্তা মানেই যে অভিজ্ঞতা খারাপ হবে, তা নয়। লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রেমব্রান্টের বিখ্যাত ‘দ্য নাইট ওয়াচ’ চিত্রকর্মটি সংরক্ষণের কাজ দর্শনার্থীদের সামনেই করা হচ্ছে। ছবিটি কাচের আড়ালে থাকলেও মানুষ দেখতে পাচ্ছেন শিল্পকর্মটি কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের জাদুঘর কেমন হবে?
সাম্প্রতিক চুরির ঘটনা জাদুঘরগুলোর সামনে কঠিন একটি প্রশ্ন তৈরি করেছে—ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোকে কীভাবে নিরাপদ রাখা যাবে, আবার একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছেও সেগুলোকে পৌঁছে দয়া যাবে কীভাবে?
কোনো জাদুঘর হয়তো মূল্যবান আসল নিদর্শন সরিয়ে প্রতিলিপি রাখবে। কোনোটি হয়তো নিদর্শনের চারপাশে আরো নিরাপত্তা বাড়াবে। আবার কোথাও দর্শনার্থীদের কিছুটা দূর থেকেই দেখতে হতে পারে।
তবে পরিবর্তন যাই হোক, একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—কেন এমন পরিবর্তন করা হচ্ছে, তা দর্শনার্থীদের জানানো।
কারণ জাদুঘরে মানুষ শুধু একটি পুরোনো জিনিস দেখতে যান না। তারা ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা নিতে যান।
জাদুঘরগুলোর সামনে এখন তাই দুই দিক সামলানোর চ্যালেঞ্জ—শত শত বা হাজার বছর ধরে টিকে থাকা নিদর্শনগুলোকে নিরাপদ রাখা। আবার এতটাই উন্মুক্ত রাখা, যাতে মানুষ সেগুলো দেখতে সেখানে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে না ফেলেন।
বিবিসি থেকে নেয়া