ঢাকার ব্যস্ত রাস্তাঘাট থেকে গ্রামের টিনের ঘর, সবখানেই মানুষ গরমের সঙ্গে সহাবস্থান করতে শিখেছে। কিন্তু গ্লোবাল ওয়ার্মিং আজকাল সেই সহাবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করছে। অসহনীয় গরমে মানুষ অতিষ্ট হয়ে উঠছে। বড় কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই নিঃশব্দে ভয়ংকর পরিণতির দিকে ধেয়ে যেতে পারে কোন শরীর। অনেকেই অজান্তেই শিকার হচ্ছে ‘হিটস্ট্রোক’ নামক এক দানবের। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ যখন বুঝতে পারে এটা কেবল সাধারণ গরম লাগা নয়, এর চেয়েও বেশি কিছু— ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়।
শুধুই গরম লাগার অনুভূতি?
মানুষের শরীর গরম সহনশীল। গরমে ঘাম ঝরে, শরীর ঠান্ডা হয়, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার শর্ত হলো, তাপ যেন শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের আর্দ্র বাতাসে, সেই পথটাই প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। যখন তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায় আর আর্দ্রতা ৭০–৮০ শতাংশে ওঠে, তখন ঘাম ঠিকমতো শুকায় না। চামড়ার উপরেই লেগে থাকে। ভেতরে ভেতরে শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে।
এ সময় প্রায়ই হালকা মাথাব্যথা, একধরনের ক্লান্তি, শরীর ভারী লাগার মত অনুভূতি হয়। এই সময়টিকে বলা হয় ‘হিট একজোশন’ যেখানে শরীর গরমের সঙ্গে লড়াই করছে। এখানেই ঘটে সবচেয়ে বড় ভুলটি। মানুষ গুরুত্ব দেয় না, আর ভাবে কেবলই ‘গরম লাগা’র অনুভূতি। মানুষ বুঝতে চায় না শরীর তাকে থামতে বলছে। তারপর হঠাৎ করেই শরীর সীমা অতিক্রম করে। ঘাম ঝরা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। শরীরের ভেতর তীব্র জ্বালাপোড়ার অনুভূতি হয়। কথা জড়িয়ে যায়, চিন্তা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। সবচেয়ে আগে আক্রান্ত হয় মস্তিষ্ক। তারপর হৃদযন্ত্র ও কিডনি। এটি নিছক গরমের ক্লান্তি নয়। এটিই হিটস্ট্রোক যা প্রাণঘাতী হতে পারে।
কেন জানতে হবে এ রোগ সম্পর্কে?
বাংলাদেশ সবসময়ই উষ্ণ। কিন্তু দিন দিন গরম অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। বদলাচ্ছে তার তীব্রতা, স্থায়িত্ব, এবং পরিবেশ। ঢাকার মতো শহরগুলো এখন ‘হিট আইল্যান্ড’।কংক্রিট, অ্যাসফল্ট, কাঁচ দিনভর তাপ শোষণ করে, আর রাতে ধীরে ধীরে তা ছাড়তে থাকে। ফলে শহর কখনো পুরোপুরি ঠান্ডা হয় না। ধনীদের জন্য এর সমাধান আছে। এসি চালু করলেই ঘরে আসে কৃত্রিম শীতলতা। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের জন্য এ শহর হয়ে উঠছে মৃত্যুকূপ। শহরের বস্তিগুলোর কথাই ভাবুন। টিনের ছাউনির ঘরের ভেতরে দুপুরে তাপমাত্রা বাইরের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। সেই টিন গরম ধরে রাখে, ঘরকে চুল্লিতে পরিণত করে। তার ওপর গত কয়েকদিনে যোগ হয়েছে লোডশেডিং। এ অবস্থায় যেকোনো সময় আঘাত হানতে পারে হিটস্ট্রোক। তাই বাংলাদেশে হিটস্ট্রোক এখন একটি সামাজিক বাস্তবতা। যা সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরী।
ভুল ধারণাগুলো, যা বিপদ বাড়ায়
প্রচণ্ড গরমে মানুষ প্রথমেই বলে ‘ঠান্ডা পানি খাও’ কথাটি অর্ধেক সত্য। বরফঠান্ডা পানি দ্রুত খেলে শরীর সাময়িক স্বস্তি পায়, কিন্তু শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা কমাতে এটি যথেষ্ট নয়। কখনো কখনো এটি শরীরে হঠাৎ চাপও তৈরি করতে পারে। আরেকটি বড় ভুল হলো, শুধু পানি খাওয়াকে যথেষ্ট মনে করা। অতিরিক্ত ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে লবণ বেরিয়ে যায়। শুধু পানি খেলে সেই ঘাটতি পূরণ হয় না। বরং শরীর আরো দুর্বল হয়ে পড়ে, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই হঠাৎ বাইরে থেকে এসেই ঠান্ডা পানি না খেয়ে স্যালাইন পানি খেতে হবে। পোশাকও গুরুত্বপূর্ণ। গাঢ় রং, টাইট কাপড় সবই তাপ আটকে রাখে। তাই কাপড়ের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক হতে হবে। ঢিলেঢালা আরামদায়ক পোশাক পরতে হবে।
হিটস্ট্রোক সময় দেয় না
যখন কারো শরীর থেকে ঘাম ঝরা বন্ধ হয়ে যায়, বা হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যায়, তখন বুঝতে হবে শরীর এর মধ্যেই বিপজ্জনক অবস্থায়। হিটস্ট্রোক প্রভাব খাটাতে শুরু করেছে। এ সময় প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমেই তাকে গরম থেকে সরাতে হবে—ছায়া, বাতাস আছে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। তারপর দ্রুত শরীর ঠান্ডা করতে হবে। পানি ঢালা, ভেজা কাপড় দিয়ে গলা, বগল, কুঁচকির জায়গা ঠান্ডা করতে হবে। যদি তার জ্ঞান থাকে, ধীরে ধীরে পানি বা ওআরএস দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অজ্ঞান থাকলে মুখে পানি দেওয়া বিপজ্জনক। এবং অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। হিটস্ট্রোক কয়েক মিনিটেই অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে পারে।
বেঁচে থাকার ছোট ছোট কৌশল
দুপুর ১১টা থেকে বিকাল ৪টা এই সময়টাতে খুব সাবধান থাকতে হবে। যতটুকু সম্ভব ছায়াযুক্ত শীতল জায়গায় থাকতে হবে। শুধু পিপাসা লাগলে নয়, পানি খেতে হবে নিয়মিত। পানির সঙ্গে লবণ-লেবু, বা স্যালাইন শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে। খাবারেও পরিবর্তন দরকার। তরমুজ, শসা, দই এসব শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। পানির ক্ষেত্রে ফ্রিজের ঠান্ডা পানি না খেয়ে মাটির কলসের ঠান্ডা পানি অনেক ভালো কাজে দেয়। ঘর বেশি গরম হলে ছাদে পানি ছিটানো, বা ঘরের এক কোণে এক বালতি পানি আখলে ঘর কিছুটা শীতল হবে।
কারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে?
সবাই সমানভাবে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয় না। বয়স্ক মানুষ, শিশু, গর্ভবতী নারী,
হৃদরোগ বা কিডনির রোগীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। এছাড়া রিকশাচালক, শ্রমিক, ফেরিওয়ালা যারা রোদে কাজ করে তাদের জন্য এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই রাস্তাঘাটে বিভিন্ন জায়গায় পানির ব্যবস্থা রাখা, ফ্রি স্যালাইন বিতরণ কর্মসূচি এসব বাঁচাতে পারে অনেকগুলো প্রাণ।
হিটস্ট্রোক আসে খুব নিঃশব্দে। কিন্তু নিয়ে যেতে পারে আপনার প্রাণও। তাই শরীরের প্রত্যেকটা পরিবর্তনকে গুরুত্বের সাথে দেখুন। সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন।