বৈশ্বিক রাজনীতিতে নারীর অবদান

সমতার পথে বাধা ও অর্জনের চালচিত্র

বিশ্ব রাজনীতিতে নারীর আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ শুরু হয় ভোটাধিকার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। উনবিংশ ও বিংশ শতকে ইউরোপ ও আমেরিকায় নারীরা ভোটাধিকারের দাবিতে সংগঠিত হন। কয়েক দশক ধরে চলা এ আন্দোলনের মাধ্যমেই বিশ্বব্যাপী নারীরা কেবল ভোটার হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক নাগরিক হিসেবে নিজেদের স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হন। নারীর ভোটাধিকার আন্দোলনে প্রথম দেশ হিসেবে ইতিহাস গড়ে নিউজিল্যান্ড।

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে সভ্যতার চাকা যে গতিতে এগোচ্ছে, তার অন্যতম প্রধান জ্বালানি নারীর ক্ষমতায়ন। বিশেষ করে রাজনৈতিক ও জনজীবনে নারীর সমান অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব কেবল মানবাধিকারের বিষয় নয়, বরং ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের একটি অপরিহার্য শর্ত।

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরে পুরুষ-প্রধান হিসেবে বিবেচিত হলেও নারীরা সব সময়ই রাজনৈতিক পরিবর্তনের অগ্রভাগে থেকেছেন। কখনো রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে, কখনো বিপ্লবী নেতা, কখনো মানবাধিকার আন্দোলনের মুখপাত্র—নারীর অংশগ্রহণ বিশ্ব রাজনীতিকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক করেছে। সমতা, গণতন্ত্র, শান্তি ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় নারীর অবদান আজ বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত।

বিশ্ব রাজনীতিতে নারীর আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ শুরু হয় ভোটাধিকার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। উনবিংশ ও বিংশ শতকে ইউরোপ ও আমেরিকায় নারীরা ভোটাধিকারের দাবিতে সংগঠিত হন। কয়েক দশক ধরে চলা এ আন্দোলনের মাধ্যমেই বিশ্বব্যাপী নারীরা কেবল ভোটার হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক নাগরিক হিসেবে নিজেদের স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হন। নারীর ভোটাধিকার আন্দোলনে প্রথম দেশ হিসেবে ইতিহাস গড়ে নিউজিল্যান্ড। ১৮৯৩ সালে দেশটি সব প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে ভোট দেয়ার অধিকার দেয়। এরপর বিভিন্ন দেশ পর্যায়ক্রমে এ অধিকার নিশ্চিত করে।

সিরিমাভো বন্দরনায়েকে

রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নারীর উত্থান বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। ১৯৬০ সালে বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান সিরিমাভো বন্দরনায়েকে। আধুনিক শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর স্থপতিদের একজন হিসেবে তার নাম স্মরণ করা হয়।

অন্যান্য নারী রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার তার কঠোর নেতৃত্ব ও অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য পরিচিত। দক্ষিণ এশিয়ায় ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেন। একইভাবে জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক কৌশলের প্রতীক হয়ে ওঠেন।

মার্গারেট থ্যাচার, ইন্দিরা গান্ধী ও অ্যাঞ্জেলা মার্কেল

নারীরা শুধু ক্ষমতার শীর্ষে নয়, তৃণমূল আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মিয়ানমারের গণতন্ত্র আন্দোলনের নেতা অং সান সূ চি দীর্ঘ সময় গৃহবন্দী থেকেও গণতন্ত্রের পক্ষে সংগ্রাম চালিয়ে যান। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভূট্টো মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী সরকারপ্রধান হিসেবে নারী নেতৃত্বের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিসরে গুরুত্ব পেয়েছে।

অং সান সূ চি, বেনজির ভূট্টো ওখালেদা জিয়া

মানবাধিকার ও শিক্ষার অধিকারের ক্ষেত্রে মালালা ইউসূফজাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারীর কণ্ঠকে আরো জোরালো করেছেন। যদিও তিনি সরাসরি রাজনীতিবিদ নন, তবুও তার আন্দোলন বিশ্ব রাজনীতিতে নীতিনির্ধারণী আলোচনাকে প্রভাবিত করেছে।

শান্তি প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ যে কতটা কার্যকর, তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগে প্রমাণিত হয়েছে। লাইবেরিয়ার শান্তি আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী এলেন জনসন সারলিফ আফ্রিকার প্রথম নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কলম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সংঘাত নিরসনে নারী প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা শান্তি চুক্তিকে টেকসই করেছে।

মালালা ইউসূফজাই, জনসন সারলিফ ও জেসিন্ডা আরডার্ন

গবেষণায় দেখা গেছে, যে সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বেশি, সেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন সহানুভূতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলায় নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছেন। তার নেতৃত্বে সন্ত্রাসবাদ ও মহামারি মোকাবিলায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

তবে অগ্রগতি সত্ত্বেও নারীরা এখনো বৈষম্য, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও সহিংসতার শিকার। অনেক দেশে রাজনৈতিক দলে নারীর অংশগ্রহণ সীমিত, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায়গুলোয় নারীদের প্রতিনিধিত্ব এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। বরং কাঙ্ক্ষিত লিঙ্গ সমতা অর্জনের পথ এখনো অনেকটা কন্টকাকীর্ণ। ২০২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩টি দেশের মধ্যে বিশ্বের মাত্র ২৯টি দেশে ৩২ জন নারী রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সারা বিশ্বে মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে মাত্র ২২ দশমিক ৯ শতাংশ নারী। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, মাত্র নয়টি দেশ তাদের মন্ত্রিসভায় ৫০ শতাংশ বা তার বেশি নারী সদস্য নিশ্চিত করতে পেরেছে।

বর্তমান রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের যে গতি সে সমীকরণ অনুযায়ী, শীর্ষপদে পূর্ণ লিঙ্গ সমতা আসতে আরো প্রায় ১৩০ বছর সময় লেগে যাবে। অর্থাৎ, আজকের তরুণী প্রজন্ম তাদের জীবদ্দশায় হয়তো বিশ্বজুড়ে সমতাপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেখে যেতে পারবে না।

দফতর বিভাজনের ক্ষেত্রে নারীদের সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিশ্বের নারী মন্ত্রীদের পরিচালিত শীর্ষ পাঁচটি পোর্টফোলিও হলো: নারী ও লিঙ্গ সমতা, পরিবার ও শিশু বিষয়ক দপ্তর, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা এবং সংস্কৃতি। প্রতিরক্ষা, অর্থ বা স্বরাষ্ট্রের মতো তথাকথিত ‘কঠিন’ মন্ত্রণালয়গুলোয় নারীদের পদায়ন এখনো অনেক দেশে ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

বৈশ্বিকভাবে জাতীয় সংসদ বা আইনসভায় নারীর প্রতিনিধিত্ব গত তিন দশকে কিছুটা বেড়েছে। ১৯৯৫ সালে যেখানে নারী সংসদ সদস্যের হার ছিল মাত্র ১১ শতাংশ, বর্তমানে তা ২৭ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে এ অগ্রগতি বৈশ্বিকভাবে সুষম নয়। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ৩৬ শতাংশ এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ৩৩ শতাংশ নারী সংসদ সদস্য থাকলেও, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় এ হার মাত্র ১৭ শতাংশ। বর্তমান হারে উন্নতি ঘটলে জাতীয় আইনসভাগুলোয় লিঙ্গ সমতা আসতে ২০৬৩ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।

গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে, নারীরা যখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকেন, তখন সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো বেশি প্রাধান্য পায়। ভারতের স্থানীয় কাউন্সিল বা পঞ্চায়েতগুলোয় দেখা গেছে, নারী নেতৃত্বাধীন এলাকায় পানীয় জল সংক্রান্ত প্রকল্পের সংখ্যা পুরুষ নেতৃত্বাধীন এলাকার তুলনায় ৬২ শতাংশ বেশি। নরওয়ের মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলে নারী প্রতিনিধিদের আধিক্যের সঙ্গে শিশু যত্ন বা চাইল্ডকেয়ার সুবিধার সরাসরি ইতিবাচক সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা।

নারীরা দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা নির্মূল, মাতৃত্বকালীন ছুটি, পেনশন সংস্কার এবং নির্বাচনী সংস্কারের মতো মানবিক ও সামাজিক বিষয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নজির স্থাপন করেছেন।

যেসব দেশে আইনিভাবে নারী কোটা বা ‘জেন্ডার কোটা’ প্রবর্তন করা হয়েছে, সেখানে রাজনীতির চিত্র দ্রুত বদলেছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, কোটা ব্যবস্থা থাকা দেশগুলোয় সংসদে ও স্থানীয় সরকারে নারীদের উপস্থিতি যথাক্রমে ৫ শতাংশ ও ৭ শতাংশ বেশি থাকে। সুতরাং, কেবল সচেতনতা নয়, আইনি বাধ্যবাধকতাও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা পালন করে।

নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কোনো করুণা বা বিশেষ সুযোগ নয়, বরং এটি একটি সুষম সমাজের অধিকার। বৈশ্বিক রাজনীতিতে নারীর অবদান যত বাড়বে, পৃথিবী তত বেশি মানবিক, টেকসই এবং সংঘাতমুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।

আরও