পাহাড়ের সন্তান থেকে সাগরের আতঙ্ক— কারা এ হুথি

হুথিরা আরেকটি পরিচয় পেতে শুরু করে— ‘রেড সি পাওয়ার’। ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা শুরু করে। হুথিদের দাবি ছিল, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি এবং ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্য করা। কিন্তু এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়। একটি ইয়েমেনি আন্দোলন তখন আর শুধু স্থানীয় বিষয় থাকল না, তার সামরিক সক্ষমতা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সমুদ্রপথের হিসাবেও ঢুকে পড়ল

একটি পাহাড়ি জনপদের ধর্মীয় পুনর্জাগরণ কীভাবে পরিণত হলো এমন এক শক্তিতে, যার হাতে আজ ইয়েমেনের রাজনীতি থেকে লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ, দুটিই অস্থির। সৌদি আরবসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলা হুথিরা আসলে কারা?

উত্তর ইয়েমেনের পাহাড়ে হুথিদের গল্পের শুরু কোনো ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নয়, একটি পরিচয়কে ঘিরে। সেই পরিচয়, জায়দি। শতাব্দীর পর শতাব্দী উত্তর ইয়েমেনে জায়দি শিয়াদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব ছিল গভীর। কিন্তু ১৯৬২ সালের বিপ্লবের পর সেই পুরনো ইমামতন্ত্রের অবসান ঘটে; প্রতিষ্ঠিত হয় প্রজাতন্ত্র। এরপর রাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি সমাজ, ধর্মীয় পরিবার ও উপজাতীয় শক্তির সম্পর্ক কখনোই পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। গবেষক মারিকে ব্রান্ট দেখিয়েছেন, পরবর্তী হুথি সংঘাতকে শুধু সুন্নি-শিয়া বিভাজন বা সৌদি-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা দিয়ে বোঝা যায় না, এর গভীরে ছিল উত্তর ইয়েমেনের ক্ষমতা, সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা ও স্থানীয় রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস।

সেই ইতিহাসের কেন্দ্র সা'দাহ, সৌদি সীমান্তঘেঁষা উত্তর ইয়েমেনের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল। এখানেই ১৯৯০-এর দশকে জায়দি ধর্মীয় পরিচয় পুনরুজ্জীবনের একটি আন্দোলন গড়ে ওঠে। এর নাম ছিল ‘বিলিভিং ইয়ুথ’। শুরুতে এটি ছিল মূলত ধর্মীয় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের উদ্যোগ। কিন্তু উত্তর ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সালাফি প্রভাব বাড়তে থাকায় এবং স্থানীয় সমাজের একাংশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত বোধ করায় আন্দোলনটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক চরিত্র পেতে শুরু করে।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিলেন ধার্মিক জায়দি পরিবারের সন্তান, সাবেক সংসদ সদস্য এবং পরবর্তীকালে আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হুসেইন বদর আল-দীন আল-হুথি। তার বক্তৃতায় উঠে আসতে থাকে দুর্নীতি, বিদেশী হস্তক্ষেপ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরোধিতা এবং জায়দি পরিচয় রক্ষার কথা। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ তার রাজনীতিকে আরো তীব্র করে। কিন্তু তখনো এটি কোনো ইরানি প্রক্সি বাহিনী ছিল না; এর শিকড় ছিল ইয়েমেনের নিজস্ব সমাজ ও রাজনীতিতে।

তারপর ২০০৪। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর সরকারের সঙ্গে হুসেইন আল-হুথির বিরোধ সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। কয়েক মাসের লড়াইয়ের পর সেপ্টেম্বর ২০০৪-এ হুসেইন নিহত হন। কিন্তু তার মৃত্যু আন্দোলনের সমাপ্তি নয়, বরং নতুন অধ্যায়ের শুরু। নেতৃত্বে আসেন তার ভাই আবদুল মালিক আল-হুথি। আর অনুসারীদের আন্দোলন ধীরে ধীরে পরিচিত হতে থাকে ‘হুথি’ নামে, তাদের নিজেদের নাম আনসারুল্লাহ অর্থাৎ ‘আল্লাহর সমর্থক’।

পরবর্তী ছয় বছর উত্তর ইয়েমেনের পাহাড়ে চলে একের পর এক যুদ্ধ। ২০০৪ থেকে ২০১০ সালে হুথিদের সঙ্গে ইয়েমেনি সরকারের ছয় দফা সংঘাত হয়। যুদ্ধগুলো তাদের শুধু সামরিক শক্তিই দেয়নি, পাহাড়ি ভূখণ্ডে দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধ চালানোর অভিজ্ঞতা, স্থানীয় উপজাতীয় নেটওয়ার্ক এবং রাষ্ট্রের দুর্বলতার সুযোগ নেয়ার দক্ষতাও তৈরি করেছে। অক্সফোর্ডের গবেষক আসের অরকাবি এবং ব্রান্টের গবেষণায় এ যুদ্ধগুলোকে পরবর্তী হুথি উত্থানের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এ সংঘাতেই প্রথম সরাসরি মঞ্চে আসে সৌদি আরব। ২০০৯ সালে হুথিদের সঙ্গে ইয়েমেনি সরকারের লড়াই সৌদি সীমান্তে পৌঁছালে রিয়াদ সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করে। অর্থাৎ সৌদি-হুথি সংঘাতের শিকড় ২০১৫ সালে নয়, তার প্রথম সরাসরি সামরিক অধ্যায় শুরু হয়েছিল এরও কয়েক বছর আগে।

কিন্তু ইতিহাস তখনো আরো বড় বাঁক নেয়ার অপেক্ষায়। ২০১১ সালের আরব বসন্তে ইয়েমেনে সালেহবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে হুথিরাও সেই অস্থিরতার মধ্যে নিজেদের প্রভাব বাড়ায়। সালেহ ক্ষমতা ছাড়েন; ক্ষমতায় আসেন আবদুর রব্বু মনসুর হাদি। শুরু হয় জাতীয় সংলাপ, নতুন রাষ্ট্রকাঠামো তৈরির চেষ্টা। কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতা টেকেনি। ফেডারেল কাঠামো, সম্পদ বণ্টন ও উত্তরাঞ্চলের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিরোধ আরো গভীর হয়।

এরপর আসে ২০১৪। জ্বালানির ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্তে ইয়েমেনে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে হুথিরা ব্যাপক বিক্ষোভ সংগঠিত করে। দুর্নীতি, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে সঙ্গে নিয়ে তারা সানা অভিমুখে অগ্রসর হয়। সেপ্টেম্বর ২০১৪-এ হুথিরা রাজধানী দখল করে। তাদের সঙ্গে তখন সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহর অনুগত সামরিক ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্কেরও সহযোগিতা ছিল— যে সালেহ এক দশক আগেই হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। ইয়েমেনের রাজনীতির এই অদ্ভুত জোট দেখিয়ে দেয়, এখানে মতাদর্শের পাশাপাশি ক্ষমতার হিসাব কতটা গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের নথিতেও হুথি-সালেহ জোটকে বিভিন্ন উত্তরাঞ্চলীয় রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের সমন্বয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

২০১৫ সালে সেই সংকট আন্তর্জাতিক যুদ্ধে পরিণত হয়। হুথিরা সানা থেকে দক্ষিণের দিকে এগোতে থাকলে প্রেসিডেন্ট হাদি সৌদি আরবের সহায়তা চান। ওই বছরে মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করে। রিয়াদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো। কিন্তু সৌদি নিরাপত্তার দৃষ্টিতে বিষয়টি ছিল আরো গভীর। নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তের ঠিক ওপারে একটি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান এবং তার সঙ্গে ইরানের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক রিয়াদের কাছে বড় কৌশলগত উদ্বেগ হয়ে ওঠে।

এখানেই হুথি ইতিহাসে ইরানের প্রবেশ ঘটে স্পষ্টভাবে। হুথিরা ইরানে তৈরি কোনো আন্দোলন নয়। তাদের জন্ম উত্তর ইয়েমেনের জায়দি সমাজে, বহু বছর ধরে চলা স্থানীয় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের ভেতর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ইরানের সঙ্গে তাদের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গভীর হয়েছে। অস্ত্র, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তার বিষয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি নথিতে প্রমাণ ও অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়েছে। একইসঙ্গে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, হুথিদের সম্পূর্ণভাবে ‘ইরানের পুতুল’ হিসেবে দেখলে তাদের স্থানীয় শিকড় ও নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ অদৃশ্য হয়ে যায়।

কারণ হুথিদের গল্পের কেন্দ্র এখনো ইয়েমেন। সা'দাহর পাহাড়, জায়দি পরিচয়, উত্তরাঞ্চলের উপজাতীয় রাজনীতি, সানা-কেন্দ্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত এবং সম্পদ ও ক্ষমতার অসম বণ্টন— এসবের ওপর দাঁড়িয়েই তৈরি হয়েছে তাদের শক্তি। ধর্ম তাদের পরিচয়ের একটি অংশ; কিন্তু তাদের রাজনৈতিক উত্থানের ব্যাখ্যা কেবল ধর্মে আটকে নেই। ব্রান্টের গবেষণায় স্থানীয় ক্ষমতার লড়াই ও ট্রাইবাল রাজনীতিকে হুথি সংঘাতের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে দেখানো হয়েছে।

২০১৭ সালে আবার বদলে যায় সমীকরণ। সাবেক শত্রু সালেহ যখন হুথিদের সঙ্গে জোট ভেঙে সৌদি সমর্থিত পক্ষের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন, হুথিদের সঙ্গে তার সংঘর্ষ শুরু হয়। ডিসেম্বরেই সালেহ নিহত হন। এরপর উত্তর ইয়েমেনে হুথিদের অবস্থান আরো সংহত হয়।

তারপর আসে যুদ্ধের দীর্ঘতম অধ্যায়। ২০১৫ থেকে বছরের পর বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলা, হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, স্থলযুদ্ধ এবং দুর্ভিক্ষ— সব মিলিয়ে ইয়েমেন পরিণত হয় বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয়ের কেন্দ্রে। ২০২২ সালের জাতিসংঘ-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি বড় আকারের সংঘর্ষ অনেকটাই কমিয়ে দেয়, কিন্তু স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান আনতে পারেনি।

আর তখনই হুথিরা আরেকটি পরিচয় পেতে শুরু করে— ‘রেড সি পাওয়ার’। ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা শুরু করে। হুথিদের দাবি ছিল, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি এবং ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্য করা। কিন্তু এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়। একটি ইয়েমেনি আন্দোলন তখন আর শুধু স্থানীয় বিষয় থাকল না, তার সামরিক সক্ষমতা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সমুদ্রপথের হিসাবেও ঢুকে পড়ল।

আর চলতি সেপ্টেম্বর এসে সেই গল্প আরো বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোয় হুথিরা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ধরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে মোখা ও বাব আল-মানদেবের কাছের গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড ও দ্বীপগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। পশ্চিম উপকূল নিয়ন্ত্রণের মাঝে সৌদি আরবের আবহা, খামিস মুশাইত ও তায়েফেও হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর এসেছে।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অগ্রগতি সৌদি আরবের জন্য ইয়েমেনে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় কৌশলগত ধাক্কা এবং বাব আল-মানদেবের ওপর হুথিদের প্রভাব আরো বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একসময় সা'দাহর পাহাড়ে নিজেদের পরিচয় রক্ষার জন্য যে আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল, সেই আন্দোলন আজ দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের পাশে।

হুথিদের তাই শুধু ‘ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া’ বললে গল্পের অর্ধেকই বলা হয়। আবার শুধু ‘জায়দি ধর্মীয় আন্দোলন’ বললেও বর্তমান বাস্তবতা ধরা পড়ে না। তারা এখন একইসঙ্গে ধর্মীয়-রাজনৈতিক আন্দোলন, সশস্ত্র শক্তি এবং উত্তর ও পশ্চিম ইয়েমেনের বড় অংশে কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এক ক্ষমতাকেন্দ্র।

হুথিদের ইতিহাস আসলে একটি পাহাড়ি জনপদের দীর্ঘ ক্ষোভের ইতিহাস— যেখানে ধর্ম, পরিচয়, উপজাতীয় রাজনীতি, রাষ্ট্রক্ষমতা, সৌদি নিরাপত্তা, ইরানের কৌশল এবং লোহিত সাগরের ভূগোল ধীরে ধীরে একই সুতোয় গাঁথা হয়েছে।

সেই কারণেই আজ হুথিদের দিকে তাকানো মানে শুধু ইয়েমেনের দিকে তাকানো নয়, তাকাতে হয় আরব উপদ্বীপের ক্ষমতার মানচিত্র, ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর দিকেও।

আরও