পশ্চিমা বিশ্বে মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি মূলত ‘মানবতার কবি’ বা ‘প্রেমের কবি’ হিসেবে পরিচিত। এ পরিচিতির পেছনে বড় একটি ভূমিকা রেখেছে রুমির কবিতার ইংরেজি অনুবাদগুলো। অনেক ক্ষেত্রেই এসব অনুবাদে তার আধ্যাত্মিক দর্শন, খোদায়ী প্রেম ও ইসলামী বৌদ্ধিক প্রেক্ষাপট আংশিকভাবে বা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। কিছু অনুবাদক হয়তো রুমির আধ্যাত্মিক গভীরতা উপলব্ধি করেছিলেন, কিন্তু পাশ্চাত্য পাঠক ও দর্শনের উপযোগী করে তুলতে গিয়ে তার কবিতা থেকে ইসলামী ও ধর্মতাত্ত্বিক উপাদান ছেঁটে ফেলা হয়েছে।
বিশেষ করে কোলম্যান বার্কসের অনুবাদের মাধ্যমে রুমি পশ্চিমা বিশ্বে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে কবি রবার্ট ব্লাই ক্যামব্রিজের গবেষক এ. জে. আরবেরির অনূদিত মসনভির ছয় খণ্ড বার্কসের হাতে তুলে দেন। পরবর্তী তিন দশকের বেশি সময়ে বার্কস রুমিকে নিয়ে প্রায় ২২টি বই প্রকাশ করেন, যা বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০ লাখ কপি বিক্রি হয় এবং ২০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়।
তবে এ অনুবাদগুলোর একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, রুমির আধ্যাত্মিক দর্শন ও ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিক ভাষাকে উল্লেখযোগ্যভাবে সংক্ষিপ্ত বা বাদ দেয়া হয়েছে। এর ফলে রুমিকে মূলত একজন রোমান্টিক বা মানবিক প্রেমের কবি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সাহিত্য তার ঐতিহাসিক ও দার্শনিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি সহজপাচ্য, বাজারযোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে, যা একধরনের সাংস্কৃতিক বিকৃতি।
শিল্প ও সাহিত্য যখন তার মূল প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল ভোগ্য পণ্যে পরিণত হয়, তখন তা মানুষের চিন্তা ও সংবেদনশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। প্রক্রিয়াটি বোঝার জন্য থিওডর অ্যাডোর্নো ও ম্যাক্স হর্কহেইমারের ‘কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি’ ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। তারা Dialectic of Enlightenment গ্রন্থে দেখান, আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে সংস্কৃতি উৎপাদন একটি শিল্পকারখানার মতো কাজ করে যেখানে শিল্পকে সরলীকরণ করা হয়। শিল্পকে তার গোড়া থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, যাতে তা সহজে ভোগ করা যায় এবং গভীর কোনো উপলব্ধি সৃষ্টি না করে।
এর ফলে বাজারের চাহিদা ও ভোগবাদী মানসিকতার স্বাভাবিক ফল হিসেবে শিল্পের জটিলতা ও প্রকৃত রূপ বিকৃত হয়ে যায়। ফলস্বরূপ মানুষ চিন্তাশীল পাঠক বা সাধক না হয়ে নিষ্ক্রিয় ভোক্তায় পরিণত হয়।
এ প্রেক্ষাপটে রুমির পাশ্চাত্য জনপ্রিয়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। রুমি ছিলেন আত্মদর্শন, খোদাপ্রেম ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সাধক। কিন্তু পাশ্চাত্যের জনপ্রিয় অনুবাদে তার ঐশী চেতনার বড় অংশ অনুপস্থিত। ফলে তার কবিতা পশ্চিমে আধ্যাত্মিক মুক্তির পথনির্দেশনার চেয়ে ব্যক্তিগত আবেগ ও রোমান্টিক অনুভূতির উৎস হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
রুমির শিক্ষা সর্বজনীন, কিন্তু এ সর্বজনীনতা কোনো শূন্যতায় জন্ম নেয়নি। তার আধ্যাত্মিক দর্শন ইসলামের গভীর ঐতিহ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি নিজেই মসনভিকে কুরআনের ব্যাখ্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কুরআন ও হাদিসের অসংখ্য ইঙ্গিত ও রেফারেন্স তার কবিতায় পাওয়া যায়। তিনি ‘মাযহাব-এ-ইশক’ ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা আহমদ গাজালি, আইনুল কুযাত হামাদানি, হাল্লাজ, বায়েজিদ বোসতামি ও রাবেয়া বসরির সুফি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা।
কিন্তু পাশ্চাত্যের জনপ্রিয় অনুবাদে এ ইসলামী পরিচয় প্রায় অনুপস্থিত। রুমির বহু কবিতায় স্পষ্ট ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিক শব্দ ও ধারণা ব্যবহৃত হয়েছে। একটা কবিতায় তিনি বলেন—
‘তুমি ফিরে এসো,
যে-ই হও তুমি,
যদি হও কাফির কিংবা মূর্তিপূজক,
তবুও ফিরে এসো’
কবিতাটি যখন ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়, তখন ‘কাফির’ ও ‘মূর্তিপূজক’ শব্দ দুটি বাদ দেয়া হয়। অথচ এ কবিতার ভাষা ও ভাব কুরআনের রহমত, তাওবা ও প্রত্যাবর্তনের ধারণার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সাযুজ্যপূর্ণ।
আরো একটি বহুল প্রচলিত উক্তি ‘আমি কোনো ধর্মের নই, আমার ধর্ম প্রেম’ এর কোনো নির্ভরযোগ্য ফারসি উৎস পাওয়া যায় না। এটি পাশ্চাত্য পুনর্লিখন ও ব্যাখ্যার ফল, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রুমির নামে প্রচারিত হলেও মূল রুমির চিন্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রুমি বলেছেন, আমি রাসূল মুহাম্মদ (সা.) এর পথের ধুলো ছাড়া আর কিছুই নই।
একইভাবে রুমি ও শামস-ই-তাবরিজের সম্পর্কও বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। শামস ছিলেন রুমির আধ্যাত্মিক গুরু, যিনি তাকে আত্মজিজ্ঞাসা ও খোদাপ্রেমের নতুন স্তরে পৌঁছে দেন। কিন্তু কিছু সাহিত্যিক ব্যাখ্যা ও পপ-কালচারিক পাঠে এ সম্পর্ককে আধ্যাত্মিকতার পরিবর্তে বিকৃত আবেগিক সম্পর্ক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফাতেমেহ কেশাভার্জ মনে করেন, রুমি সম্ভবত সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করেছিলেন, কারণ তার কবিতায় কুরআনের ভাষা ও ভাবনার পুনরাবৃত্তি স্পষ্ট। পশ্চিমে যে রুমিকে ভালোবাসা হয়, সেই রুমি অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হলেও এর বিনিময়ে তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শেকড় ছেঁটে ফেলা হয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্বে রুমির জনপ্রিয়তা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। কিন্তু এ জনপ্রিয়তার পেছনে বাজারনির্ভর সংস্কৃতি উৎপাদন ব্যবস্থার ভূমিকা স্পষ্ট। এখানে রুমির ইসলামী দর্শন ও আধ্যাত্মিক গভীরতাকে সরিয়ে দিয়ে তাকে একটি সহজপাচ্য, ধর্মহীন স্পিরিচুয়াল আইকনে পরিণত করা হয়েছে। অথচ রুমি কেবল প্রেমের কবি নন—তিনি ছিলেন খোদাপ্রেমের সাধক, আত্মদর্শনের শিক্ষক এবং ইসলামের গভীর ব্যাখ্যাকারী।