‘লঞ্চ চলে ধীরে ধীরে, মোটর চলে পলকে/ মোটরের ভিতর সামাইয়া দেখ, কিসের বাজনা বাজে’—সাম্প্রতিক সময়ে রিলস ও শর্ট ভিডিওতে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে এই গান। গানটির কথায় ধরা দেয় নদীপথের যাত্রা, আধুনিক যানবাহনের গতি আর গ্রামীণ জীবনের সরস ছবি। একসময় সুনামগঞ্জের দিরাই অঞ্চলের উঠোনে নারীদের কণ্ঠে ও হাততালির ছন্দে এমন গান বেজে উঠত। সময়ের সঙ্গে সেই দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে। এখন হাইব্রিড সংস্কৃতির অংশ হয়ে নতুনভাবে বিস্তৃতি লাভ করছে এর পরিচিতি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলে যখন ধামাইলের সুর ভেসে আসে, তখন অনেকেই থমকে যান। গানের কথায় মুগ্ধ হয়ে, বৃত্তাকারে নাচের ছন্দে আলোড়িত হয়ে নতুন প্রজন্মের অনেকেই খুঁজতে শুরু করেছেন এর নাম, উৎস ও ইতিহাস। এভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাত ধরে ধামাইল নতুন করে পরিচিত হচ্ছে এমন এক প্রজন্মের কাছে, যাদের অনেকেরই গ্রামীণ উঠোনে ধামাইলের আসর দেখার অভিজ্ঞতা নেই।
ধামাইল মূলত সিলেট অঞ্চলের লোকজ নৃত্যগীত। বিয়ে, অন্নপ্রাশন, ধর্মীয় উৎসবসহ বিভিন্ন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে নারীরা দল বেঁধে এ গান গেয়ে নাচেন। সাধারণত ২০-২৫ জন নারী উঠোনে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে হাততালির ছন্দে নাচতে নাচতে গান গেয়ে থাকেন। এক পা সামনে, আরেক পা পেছনে রেখে বৃত্তাকারে ঘোরার সঙ্গে তাল মেলান সবাই। হাততালিই এখানে ছন্দের প্রধান বাহন। আলাদা কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই জমে ওঠে আসর। গানের সুর, কথার আবেগ আর দলবদ্ধ নাচ মিলিয়ে তৈরি হয় ধামাইলের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
ধামাইলের উৎপত্তি ঠিক কোন সময়ে, তা নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য না থাকলেও এর শিকড় সিলেট অঞ্চলের গ্রামীণ ও পারিবারিক সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। ‘ধামাইল’ শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে নানা মত প্রচলিত রয়েছে। একটি ধারণা হলো, শব্দটি ‘ধামা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ভাব বা আবেশ। স্থানীয় অর্থে ‘ধামা’ বলতে উঠোনও বোঝানো হয়। বাড়ির উঠোনে এই গান-নাচের আয়োজন হতো বলেই নামটি প্রচলিত হয়েছে—এমন ব্যাখ্যাও রয়েছে।
এ লোকনৃত্যের বিকাশের ইতিহাসে মরমি কবি রাধারমণ দত্তের নাম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তার গান ধামাইলের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে ধামাইলকে শুধু একজন কবির গান বা নির্দিষ্ট কিছু সুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর বিস্তৃত লোকজ চরিত্র বোঝা যায় না। ধামাইলের গানে উঠে আসে প্রেম, বিরহ, আনন্দ, অভিমান, পারিবারিক সম্পর্ক এবং নারীর সুখ-দুঃখের নানা অভিজ্ঞতা।
ভৌগোলিকভাবেও ধামাইলের পরিচিতি সিলেটের সীমানায় আটকে নেই। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে এর প্রচলন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সিলেটি জনগোষ্ঠীর বসতি রয়েছে ভারতের ত্রিপুরা ও আসামের বিভিন্ন এলাকায়ও। সেখানেও অব্যাহত রয়েছে ধামাইলের চর্চা। অর্থাৎ, এই নৃত্যগীত শুধু একটি অঞ্চলের বিনোদন নয়; সীমান্তের দুই পাশে ছড়িয়ে থাকা মানুষের ভাষা, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
দীর্ঘদিন ধামাইলের প্রধান আশ্রয় ছিল গ্রাম, উঠোন ও পারিবারিক অনুষ্ঠান। সেখানে শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে কোনো দূরত্ব ছিল না। বিয়ের বাড়িতে একদল নারী গান ধরতেন, অন্যরা হাততালি দিয়ে যোগ দিতেন। শিশুরা পাশে দাঁড়িয়ে দেখত, শুনত, ধীরে ধীরে শিখে নিত গানের কথা ও নাচের ভঙ্গি। কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই এভাবেই টিকে থাকত ঐতিহ্যটি।
কিন্তু সময় বদলেছে। শহরমুখী জীবন, পারিবারিক আয়োজনের ধরন এবং বিনোদনের মাধ্যমের পরিবর্তনে অনেক জায়গায় উঠোনের সেই স্বতঃস্ফূর্ত আসর কমে এসেছে। ধামাইল নিয়ে কাজ করা সংগ্রাহক রামকৃষ্ণ সরকারও এর নানা ধরন ও ভঙ্গি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলেছেন। ২০০৫ সালে তিনি শ্রীমঙ্গলে ‘নবনাগরী ধামাইল সংঘ’ ও ‘ধামাইল একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর লক্ষ্য ছিল গান ও নাচের বিভিন্ন রীতি সংগ্রহ, চর্চা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়া।
ঠিক এই সময়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচিতির নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে এবং স্মার্টফোনের স্ক্রিনে রিলস বা শর্ট ভিডিওর যুগে আজ গ্রামবাংলার সুপ্রাচীন ধামাইল গান ও নৃত্য কেবল নির্দিষ্ট কোনো গ্রামীণ আঙিনায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বিশ্বমঞ্চে এক নতুন ঠিকানা পাচ্ছে। রিলসের স্বল্পদৈর্ঘ্য ও আকর্ষণীয় ফরম্যাট ব্যবহার করে দেশের তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে প্রবাসীরা পর্যন্ত ধামাইলের সুর, তাল ও ভঙ্গিমা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। একই গান নানা দল, ভিন্ন পোশাক, মঞ্চ কিংবা গ্রামীণ পরিবেশে পরিবেশিত হলে দর্শক ধামাইলের বিভিন্ন রূপ দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৃশ্যমানতা বাড়লেই ঐতিহ্যগত সংরক্ষণ নিশ্চিত হয় না। একটি গানের কয়েক সেকেন্ডের অংশ জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু এর দর্শন, পুরো আয়োজন, আঞ্চলিক উচ্চারণ, সুরের ভিন্নতা ও নাচের বিশেষ ভঙ্গি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। ধামাইলকে টিকিয়ে রাখতে তাই শুধু ভাইরাল ভিডিওর ওপর নির্ভর না করে প্রবীণ শিল্পীদের কাছ থেকে গান সংগ্রহ, পরিবেশনার ধরন নথিবদ্ধ করা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় আসর চালু রাখাও জরুরি।