ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীদের অতিরিক্ত শিকারের কারণে প্রায় ২০০ বছর আগে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া একটি অনন্য বন্যপ্রাণী ‘ব্লুবাক অ্যান্টিলোপ’ বা নীলহরিণ। এবার জিন প্রকৌশল বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এ বিশেষ প্রজাতির হরিণকে পৃথিবীতে আবার ফিরিয়ে আনার এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠান।
যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘কলোসাল বায়োসায়েন্সেস’ সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার (ডি-এক্সটিংকশন) তালিকায় ষষ্ঠ প্রাণী হিসেবে যুক্ত হয়েছে এই নীলহরিণ। এর আগে তারা আইস এজ বা বরফ যুগের বিখ্যাত উলি ম্যামথ, ডোডো পাখি, তাসমানিয়ান টাইগার, মোয়া পাখি এবং প্রাচীন শিকারি প্রাণী ডায়ার উলফ বা নেকড়ে ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করেছে।
ব্লুবাক অ্যান্টিলোপের শিং। ছবি: কলোসাল বায়োসায়েন্সেস
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বেন ল্যাম্ব আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তারা দুই বছর ধরে নীলহরিণ প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করছেন এবং বেশ কিছু প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো অত্যাধুনিক জিন প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে হারিয়ে যাওয়া প্রাণীটির অবিকল রূপ তৈরি করা এবং একসময় তাদের আদি প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেয়া।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, নীলহরিণ বা ব্লুবাক অ্যান্টিলোপগুলো দেখতে অত্যন্ত সুন্দর ও আকর্ষণীয় ছিল। এদের শরীরের চামড়া বা পশম ছিল রূপালি ও স্লেট পাথরের মতো নীলচে রঙের। মাথার ওপর ছিল পেছনের দিকে বাঁকানো বড় রিং আকৃতির শিং। দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিম কেপ অঞ্চলের উপকূলীয় তৃণভূমিতে দল বেঁধে বাস করত এ প্রাণীটি। ১৭৬৬ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথম এই প্রাণীর সন্ধান পান এবং নথিবদ্ধ করেন। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, ইউরোপীয় শিকারিরা এদের সুন্দর চামড়ার লোভে এতটাই নির্বিচারে শিকার শুরু করে যে আবিষ্কারের মাত্র ৩৪ বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৮০০ সালের মধ্যেই এ পুরো প্রজাতিটি পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ব্লুবাক অ্যান্টিলোপের শ্রেণীবিন্যাস। ছবি: কলোসাল বায়োসায়েন্সেস
কলোসাল বায়োসায়েন্সেসের প্রধান বেন ল্যাম্ব বলেন, ‘মানুষের কারণেই এ সুন্দর প্রাণীটি পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীরা মাত্র ৩৪ বছরের মধ্যে কেপ অঞ্চল থেকে নীলহরিণদের গুলি করে মেরে শেষ করে দিয়েছে। এ অপরাধের পেছনে কোনো অস্পষ্টতা নেই এবং এর দায় সম্পূর্ণ মানুষের। তাই আজ যখন আমাদের কাছে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে, তখন এই ভুলটি সংশোধন করা আমাদের একটি বড় দায়িত্ব ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা বলে আমি মনে করি।’
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই নীলহরিণকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য তারা সুইডেনের স্টকহোমে অবস্থিত ‘সুইডিশ মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি’তে সংরক্ষিত একটি তরুণ পুরুষ নীলহরিণের চামড়া থেকে প্রাচীন ডিএনএ বা জিনগত উপাদান সংগ্রহ করেছেন। এরপর এই প্রাচীন ডিএনএর সঙ্গে নীলহরিণের সবচেয়ে নিকটবর্তী ও বর্তমানে জীবিত প্রজাতি ‘রোন অ্যান্টিলোপ’ বা রোন হরিণের ডিএনএ তুলনা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই দুই প্রজাতির জিনগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ৯৮ শতাংশেরও বেশি মিল রয়েছে।
ব্লুবাক অ্যান্টিলোপ বা নীলহরিণের শিংসহ মাথার খুলি। ছবি: কলোসাল বায়োসায়েন্সেস
গবেষক দলটি এখন জিন-সম্পাদনা বা ‘জিনোম এডিটিং’ পর্যায়ে রয়েছে। এ ধাপে তারা জীবিত রোন হরিণের কোষে বিলুপ্ত নীলহরিণের মূল জিনগুলো প্রবেশ করাচ্ছেন। এই জিনগত পরিবর্তনের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে, সেই পরিবর্তিত কোষগুলো ব্যবহার করে ল্যাবরেটরিতে একটি কৃত্রিম ভ্রূণ তৈরি করা হবে। পরবর্তী সময়ে ভ্রূণটি একটি সারোগেট বা গর্ভধারণকারী মা রোন হরিণের জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হবে। এ প্রজাতির হরিণের গর্ভধারণকাল সাধারণত নয় মাস হয়ে থাকে। নয় মাস পর সেই মায়ের গর্ভ থেকেই জন্ম নেবে বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া নীলহরিণের শাবক।
এর আগে কলোসাল বায়োসায়েন্সেস এই একই পদ্ধতিতে দারুণ সাফল্য পেয়েছে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে তারা প্রাচীন ডিএনএ ব্যবহার করে জিনগতভাবে পরিবর্তিত তিনটি ডায়ার উলফ বা নেকড়ে ছানার জন্মের কথা ঘোষণা করেছিল। সেই নেকড়ের ভ্রূণগুলো একটি গৃহপালিত সাধারণ কুকুরের গর্ভে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বর্তমানে সেই নেকড়ে ছানাগুলো সুস্থ আছে এবং তাদের একটি বড় ও নিরাপদ প্রাকৃতিক অভয়ারণ্যে রেখে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
নেদারল্যান্ডের লেইডেনে অবস্থিত ন্যাচারাল বায়োডায়ভারসিটি সেন্টারে সংরক্ষিত ব্লুবাক অ্যান্টিলোপের প্রতিকৃতি। ছবি: কলোসাল বায়োসায়েন্সেস
তবে কৃত্রিমভাবে বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানী এবং নীতিবিদদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক চলছে। অনেক বিজ্ঞানী ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে জন্ম নেয়া প্রাণীগুলো কখনোই হুবহু আদি বিলুপ্ত প্রাণী হবে না। এগুলো আসলে বর্তমানে বেঁচে থাকা প্রাণীদের একটি জিনগতভাবে পরিবর্তিত বা মডিফাইড রূপ মাত্র। এ ছাড়া এই ধরনের কৃত্রিম প্রাণীকে হঠাৎ করে আবার বনে ছেড়ে দিলে তা প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করবে কিনা, তা নিয়েও অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এই বিতর্কের জবাবে কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে যেভাবে বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে, তা ঠেকানোর জন্য প্রচলিত বা চিরাচরিত সংরক্ষণ পদ্ধতি আর যথেষ্ট নয়। প্রচলিত ব্যবস্থার চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে পৃথিবী থেকে জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। কলোসালের দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে তারা যে নতুন প্রযুক্তি তৈরি করছেন, তা ভবিষ্যতে পৃথিবীর অন্য বিপন্ন প্রাণীদের বাঁচাতেও বড় ভূমিকা রাখবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৯০টি প্রজাতির হরিণের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে।
বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ব্লুবাক অ্যান্টিলোপ বা নীলহরিণের স্কেচ। ছবি: কলোসাল বায়োসায়েন্সেস
মার্কিন এ প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ তারা উলি ম্যামথ ও ডোডো পাখি ফিরিয়ে আনার কাজের অগ্রগতির বিষয়েও নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্ববাসীকে জানাতে পারবে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, যদি এই নীলহরিণ প্রকল্প সফল হয়, তবে তা বিশ্বজুড়ে হারিয়ে যাওয়া বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।