আমরা অনেকেই বিড়াল পোষা শুরু করি খুব সাধারণ এক ঘটনার মধ্য দিয়ে। হয়তো আমাদের কোনো পূর্ব পরিকল্পনা থাকে না, কিন্তু তারপরও মায়ায় আটকে আমরা এই প্রাণীগুলোর সঙ্গে দিন কাটানো শুরু করি। কোনো এক মেঘলা দিনে কিংবা নিঃসঙ্গ রাতে হয়তো একটি গর্ভবতী মা বিড়াল আমাদের বিল্ডিংয়ের গ্যারেজে কিংবা ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে আশ্রয় চায়। মানবিক জায়গা থেকেই তাকে আমরা ঘরে জায়গা দিই। কিছুদিন পর সেই মা বিড়ালটি ছোট ছোট কিছু ছানার জন্ম দেয়। ছানাগুলোর ছোট্ট, নিষ্পাপ মুখ দেখে মায়ায় পড়ে যাই আমরা। সামর্থ্য থাকলে ছানাগুলোকে আমরা পরিবারের সদস্যের মতো ভালোবেসে রেখে দেই। আর সময় বা সুযোগের অভাব থাকলে উপযুক্ত আশ্রয়ে হাতবদলের মাধ্যমে দত্তক বা অ্যাডপশনে দিয়ে দেই।
কিটেনদের আদরে বড় করার প্রথম শর্তই হলো তাদের সঠিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা। জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ মা বিড়ালের দুধই ছানাদের প্রধান খাবার ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মূল উৎস। মায়ের শালদুধে থাকা উপাদান ছানাকে প্রাথমিক সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। তবে ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পর যখন ছানা ধীরে ধীরে শক্ত খাবার খেতে শুরু করে, তখন মায়ের দেয়া প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। এ সময়ই মূলত ছানার নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউনিটি গড়ে তোলার কাজ শুরু করতে হয়।
পর্ব ১: ডিওয়ার্মিং
ছানার শরীর শক্ত ও রোগমুক্ত রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো প্রথম কৃমিনাশক বা ডিওয়ার্মিং। সাধারণত ছানার বয়স যখন ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ হয়, তখন প্রথমবার ডিওয়ার্মিং করাতে হয়। কারণ মায়ের দুধ বা মায়ের শরীর থেকেই অনেক সময় ছানার পেটে কৃমির সংক্রমণ ঘটে। আবার ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ বয়সে কিটেনরা মায়ের দুধের পাশাপাশি ধীরে ধীরে সলিড খাবার খাওয়া শুরু করে। তাই এ সময়ই কৃমিনাশক দেয়া সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর সময়।
কৃমি থাকলে ছানার পুষ্টি ব্যাহত হয়, পেট ফুলে যায় এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রথমবার ডিওয়ার্মিং করার পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট বিরতিতে এটি নিয়মিত চালিয়ে যেতে হয়।
তাই আন্তর্জাতিক ভেটেরিনারি গাইডলাইন (WSAVA ও AAFP) অনুযায়ী, ভ্যাকসিন দেয়ার আগে বিড়ালছানার সুস্থ থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই কৃমির সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে আগে ডিওয়ার্মিং করে ছানাকে সুস্থ করে, এরপর বয়স অনুযায়ী ভ্যাকসিন শুরু করার পরামর্শ দেয়া হয়।
ডিওয়ার্মিং সম্পন্ন করার পর এবং কিটেন পুরোপুরি সুস্থ ও শক্ত খাবার খাওয়ায় অভ্যস্ত হলে শুরু হয় টিকা বা ভ্যাকসিনেশনের প্রক্রিয়া। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ছানার বয়স ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ হলে প্রথম ভ্যাকসিনেশন বা টিকা দেয়া হয়। এই টিকা বিড়ালের কয়েকটি মারাত্মক প্রাণঘাতী রোগ থেকে সুরক্ষার প্রাচীর তৈরি করে। বিড়াল ছানাকে সুস্থ ও দীর্ঘায়ু করতে সঠিক সময়ে টিকার সবগুলো ডোজ সম্পন্ন করা খুব জরুরি। এ নিয়ে বিস্তারিত বলা হবে ‘বিড়ালছানার যত্ন’ সিরিজের দ্বিতীয় পর্বে।
পরিচর্যার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে
নতুন ক্যাট প্যারেন্টরা অনেক সময় ভালোবাসা থেকেই এমন কিছু ভুল করেন, যা তাদের কিটেনদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। যেমন—
- জন্মের পর শুরুর দিকে বারবার তাদের শরীরে হাত দেয়া কিংবা কোলে নেয়া যাবে না।
- সরাসরি মেঝেতে শুতে দেয়া। এতে ঠান্ডা লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, পরবর্তীতে লাইফ থ্রেট তৈরি করতে পারে।
- গরুর দুধ খাওয়ানো। কারণ এতে ল্যাকটোজের পরিমাণ বেশি থাকে, যা হজমে সমস্যা তৈরি করে। ফলে ডায়রিয়া, পেট ফাঁপা, পানিশূন্যতা ও অপুষ্টির ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রয়োজন হলে ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী বিশেষ কিটেন মিল্ক রিপ্লেসার (KMR) ব্যবহার করা উচিত।
- মা থেকে খুব দ্রুত আলাদা করা যাবে না। এতে বাচ্চাদের মধ্যে এনজাইটি ও স্ট্রেস তৈরি হতে পারে।
- অসুস্থ মনে হলে কোনোভাবেই চিকিৎসকের কাছে নিতে দেরি করা যাবে না। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে এক্ষেত্রে আপনার নির্বাচন করা ভেটেরিনারিয়ান যেন অবশ্যই দক্ষ, আন্তরিক ও মানবিক হয়।
এসব ভুল এড়িয়ে চললেই অনেক ঝুঁকি কমে যায়।
পরের পর্বে যা থাকছে
জন্মের পর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত মা বিড়ালের দুধই ছানার সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। কিন্তু এই সুরক্ষা চিরদিন থাকে না। একসময় সেই দায়িত্ব নিতে হয় ভ্যাকসিনকে। কখন প্রথম টিকা দিতে হবে? কখন কৃমিনাশক? অসুস্থ অবস্থায় টিকা দেওয়া যাবে কি? কোন টিকা বাধ্যতামূলক আর কোনটি ঝুঁকিভিত্তিক?
এসব নিয়েই থাকছে ‘বিড়ালছানার যত্ন’ সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব।
—মতামত লেখকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে