স্মেল ওয়াক

একটু থামুন, ফুলের সুগন্ধে মনটা ভালো হোক

প্রকৃতিতে এমন অনেক ফুল ও উদ্ভিদ রয়েছে, যা মানসিক চাপ কমাতে অলৌকিক ওষুধের মতো কাজ করে। যেমন ল্যাভেন্ডার—এর স্নিগ্ধ বেগুনি রূপ আর শান্তিদায়ক সুবাস অ্যারোমাথেরাপিতে অত্যন্ত পরিচিত, যা স্নায়ুর উদ্দীপনা কমিয়ে ঘুম আনতে সাহায্য করে। ঘরের কোথাও পানিতে জুঁই ফুল ভিজিয়ে রাখলে তার মিষ্টি গন্ধে ক্লান্তিকর দিন শেষেও ঘরে ফিরেই মন চাঙ্গা হয়ে ওঠে

আধুনিক জীবনের গতি যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। সকাল থেকে রাত—অফিসের দায়িত্ব, পারিবারিক কাজ কিংবা ব্যক্তিগত লক্ষ্যপূরণের তাগিদে প্রতিনিয়ত যে মানসিক চাপ জমে ওঠে, তা একসময়ে রূপ নেয় স্থায়ী উদ্বেগ ও ক্লান্তিতে। দিনের ব্যস্ততার মধ্যে মাত্র ৩০ সেকেন্ড সময় নিয়ে একটি ফুলের গন্ধ নিলে শরীর ও মনের ভেতরে ঘটে যেতে পারে গভীর পরিবর্তন। ব্যস্ত দিনের মাঝখানে এই সামান্য বিরতিটুকু অনেকটা ধ্যানের মতোই কাজ করতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোনো মনোরম গন্ধ সচেতনভাবে গ্রহণ করলে হৃদ্স্পন্দন ধীর হতে পারে, স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হতে পারে এবং মেজাজেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ ঘ্রাণের সঙ্গে আমাদের আবেগ, স্মৃতি ও শরীরের প্রতিক্রিয়ার রয়েছে গভীর যোগসূত্র।

আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের মধ্যে ঘ্রাণ সবচেয়ে প্রাচীন এবং রহস্যময়। অন্যান্য ইন্দ্রিয় যেখানে মস্তিষ্ককে কেবল তথ্য পাঠায়, ঘ্রাণ সেখানে সোজা আঘাত করে আমাদের আবেগ ও স্মৃতির ঘরে। বিজ্ঞানীদের মতে, ফুলের সুবাস নাকে যাওয়ার পর মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই গভীর শ্বাস নেয়। এইগভীর শ্বাস আমাদের শরীরের ‘রেস্ট অ্যান্ড ডাইজেস্ট’ বা বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধার ব্যবসাকে সচল করে তোলে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রের সক্রিয়তা বলা হয়। ফলে মুহূর্তের মধ্যেই ধীর হয়ে আসে দ্রুত চলা হৃদ্স্পন্দন, শিথিল হয় টানটান হয়ে থাকা পেশি, আর মন পায় শান্ত হওয়ার রসদ। এ কারণেই ঘ্রাণ নিয়ে গবেষণাকারীরা সচেতনভাবে গন্ধ নেওয়ার এ অভিজ্ঞতাকে কখনো কখনো ‘ডেটা-ড্রিভেন মেডিটেশন’ বা তথ্যনির্ভর ধ্যানের সঙ্গে তুলনা করেন।

তবে ঘ্রাণের জগতটি অদ্ভুতভাবে ব্যক্তিগত। কোনো একটি নির্দিষ্ট গন্ধ সবার কাছে সমান ভালো নাও লাগতে পারে। আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, শৈশবের স্মৃতি, সংস্কৃতি এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের এক জটিল রসায়নে ঠিক হয় কোনটি কার প্রিয় সুবাস। দাদির ঘরের পুরোনো আতর, মায়ের রান্নার মশলার সুবাস কিংবা বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে ভেজা মাটির গন্ধ—এক একটি ঘ্রাণ যেন স্মৃতির পুরোনো বন্ধ দুয়ারগুলো এক নিমেষে খুলে দেয়। মানুষ শুধু তার নাক দিয়ে গন্ধ নেয় না; নিজের জীবন দিয়ে সেই গন্ধের অর্থ তৈরি করে।

প্রকৃতিতে এমন অনেক ফুল ও উদ্ভিদ রয়েছে, যা মানসিক চাপ কমাতে অলৌকিক ওষুধের মতো কাজ করে। যেমন ল্যাভেন্ডার—এর স্নিগ্ধ বেগুনি রূপ আর শান্তিদায়ক সুবাস অ্যারোমাথেরাপিতে অত্যন্ত পরিচিত, যা স্নায়ুর উদ্দীপনা কমিয়ে ঘুম আনতে সাহায্য করে। ঘরের কোথাও পানিতে জুঁই ফুল ভিজিয়ে রাখলে তার মিষ্টি গন্ধে ক্লান্তিকর দিন শেষেও ঘরে ফিরেই মন চাঙ্গা হয়ে ওঠে। প্রেমের প্রতীক গোলাপ কেবল দেখতেই সুন্দর নয়, এর সুবাস মন ফুরফুরে রাখতে অনন্য। এ ছাড়া ক্যামোমাইল ও প্যাশন ফ্লাওয়ারের সুগন্ধ অশান্ত মনকে নিমিষে স্থির করে তোলে। পুদিনা পরিবারের সদস্য ‘লেমন বাম’ কিংবা ‘পেপারমিন্ট’-এর পাতা সামান্য হাতের তালুতে ডলে গন্ধ নিলে চটজলদি ক্লান্তি কেটে গিয়ে মন সতেজ হয়ে ওঠে। আর ভ্যালেরিয়ানের মতো ভেষজের ব্যবহার তো অনিদ্রা ও অতিরিক্ত উদ্বেগ দূর করতে বহুকাল ধরেই হয়ে আসছে।

আজকের এই প্রযুক্তিনির্ভর যুগে আমরা ঘ্রাণের এ অদ্ভুত সুন্দর জগত থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। আমরা সুন্দর ফুল দেখলে থমকে দাঁড়িয়ে তার ছবি তুলি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করি; কিন্তু ফুলের কাছে গিয়ে চোখ বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত তার গন্ধ অনুভব করার মতো ফুড়সৎ আমাদের হয় না। এই জায়গাটিতেই আসে ‘স্মেল ওয়াক’ বা গন্ধভ্রমণের ধারণা। এর জন্য বিশেষ কোনো পাহাড়ি উপত্যকা কিংবা দামী উদ্যানে যাওয়ার দরকার নেই। বাড়ির বারান্দার টব, ছাদবাগান, পথের ধারের কোনো অচেনা বুনো ফুল কিংবা বৃষ্টির পর বারান্দায় আসা ভেজা মাটির গন্ধই হতে পারে আপনার পরম আশ্রয়।

দিনের হাজারো কাজের চাপ থেকে নিজেকে বাঁচাতে প্রতিদিন মাত্র ৩০ সেকেন্ডের জন্য থামুন। চোখ জোড়া বন্ধ করে চারপাশের বাতাসে ভেসে আসা সুবাসটুকু সচেতনভাবে বুক ভরে গ্রহণ করুন। যান্ত্রিক জীবন থেকে ক্ষণিকের এ বিরতি হয়তো খুব সামান্য, কিন্তু মন ভালো রাখার জন্য মাঝেমধ্যে এ ছোট্ট বিরতিটুকুই অনেক বেশি কার্যকর।

আরও