আজকের যুগে স্মার্টফোনের স্ক্রলে একটি ‘ক্লিক’ আর দরজায় কুরিয়ার সার্ভিসের কলিংবেলের শব্দ—ব্যস, পছন্দের পণ্যটি হাতের মুঠোয়। এই যে আধুনিক ‘ডোরস্টপ ডেলিভারি’ বা হোম ডেলিভারি নিয়ে আমরা এতটা রোমাঞ্চিত, এর আদি রূপ কিন্তু লুকিয়ে আছে আমাদের গ্রাম বাংলার সেই অতি পরিচিত লেইস-ফিতাওয়ালার ঝুড়িতে। আজ যে অ্যাপের নোটিফিকেশন আমাদের সজাগ করে দেয়, কয়েক দশক আগেও সেই একই কাজ করতো ফেরিওয়ালার হাতের ঝুনঝুনি কিংবা দরাজ গলার হাঁক—"লেইস-ফিতাআআ, লেইস…"
আসলে লেইস-ফিতাওয়ালারা ছিলেন সে আমলের জীবন্ত ‘ই-কমার্স’। পার্থক্য শুধু একটাই—আজকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আমরা অ্যালগরিদম দেখি, আর তখন মেঠোপথের সেই ফেরিওয়ালার বাক্সে দেখা যেত রঙিন স্বপ্নের আলপনা। প্রযুক্তির এই জয়জয়কারে লেইস-ফিতাওয়ালারা হয়তো দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে গেছেন, কিন্তু তাদের সেই ‘দুয়ারে সেবা’ দেওয়ার দর্শনটিই আজ বিশ্বজুড়ে অনলাইন শপিংয়ের ভিত্তি হয়ে টিকে আছে। স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে সেই সেকালের হোম ডেলিভারি ম্যানদের গল্পটাই আজ নতুন করে বলা।
লেইস ফিতা পেশার উদ্ভব ও বাংলায় আগমন
লেইস বা ঝালর তৈরির শিল্পের শেকড় পোঁতা আছে ইউরোপে। ধারণা করা হয়, ১৫শ শতাব্দীর শেষের দিকে ইতালিতে এবং বেলজিয়ামে হাতে তৈরি লেইসের প্রচলন শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে এটি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। রাজপরিবার এবং অভিজাত শ্রেণির পোশাকে সৌন্দর্য বাড়াতে এর ব্যবহার হতো। শিল্প বিপ্লবের সময় যখন যন্ত্রের সাহায্যে প্রচুর পরিমাণে লেইস ও ফিতা তৈরি শুরু হলো, তখন ইউরোপীয় বণিকরা এগুলো এশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতে শুরু করে। ফলে সাধারণ তা সাধারণ মানুষের নাগালে আসে। বাংলায় এই পেশার প্রচলন ঘটে মূলত ব্রিটিশ আমলে। বিলেতি পণ্য যখন বাংলার বাজারে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন থেকেই রঙিন ফিতা আর লেইসের প্রতি বাঙালি নারীদের আকর্ষণ তৈরি হয়।
বাংলায় এই পেশার প্রসারের মূল কৃতিত্ব দেওয়া যায় ব্রিটিশ শাসনকালকে। ইংরেজরা যখন বাংলায় তাদের কল-কারখানায় তৈরি রঙিন ফিতা, জরি এবং নানা কারুকাজ করা সুতি ও সিল্কের লেইস নিয়ে আসে, তখন বাঙালি নারীদের মধ্যে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়।
তৎকালীন বাঙালি সমাজ ছিল মূলত পর্দানশীন। সম্ভ্রান্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীদের বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করার প্রচলন ছিল না। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে একদল উদ্যমী মানুষ সেই রঙিন বিলেতি পণ্যগুলো ঝুড়িতে ভরে সরাসরি নারীদের অন্দরমহলে পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করেন। এভাবেই ভ্রাম্যমাণ 'লেইস-ফিতা' বিক্রেতা বা ফেরিওয়ালা পেশার উদ্ভব হয়।
কাচের বাক্সে থাকা রঙিন দুনিয়া
একজন লেইস-ফিতাওয়ালার হাতে থাকতো কাচের বাক্স, কাঁধে থাকতো বড় কাপড় দিয়ে বোঁচকা বাঁধা একাধিক বাক্স কিংবা মাথায় বেতের ঝুড়ি। তাদের সংগ্রহে থাকতো নারীদের প্রসাধন ও সাজসজ্জার এক বিশাল সম্ভার। রঙিন সিল্কের ফিতা, কাঁটা, ক্লিপ ও রাবার ব্যান্ডের মতো চুলের সরঞ্জাম। স্নো, পাউডার, আলতা, সিঁদুর, কাজল এবং আয়না বোঝাই প্রসাধনী সামগ্রী। বাদ যেত না রেশমি চুড়ি, পুঁতির মালা, কানের দুলের মতো অলঙ্কার। সুই-সুতা, সেফটিপিন এবং জামায় লাগানোর বিভিন্ন কারুকাজ করা লেইস, অন্তর্বাসও থাকত সেই বাক্সে বন্দী রঙিন দুনিয়ায়।
বিক্রির কৌশল ও বিনিময় প্রথা
লেইস-ফিতা বিক্রেতাদের বিক্রির ধরন ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়। তারা নির্দিষ্ট কোনো সুরে হাঁক দিতেন অথবা হাতে থাকা একটি ছোট ঝুনঝুনি বাজিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতেন। গ্রামের অনেক ক্ষেত্রে নগদ টাকার বদলে চালের বিনিময়ে পণ্য কেনা হতো। এই পেশাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ ছিল এই বিনিময় প্রথা। সে সময় গ্রামের অনেক নারীর হাতে নগদ টাকা থাকতো না। কিন্তু ঘরে ধান বা চাল থাকতো। লেইস-ফিতাওয়ালারা টাকার পরিবর্তে ধান বা চালের বিনিময়ে পণ্য দেওয়া শুরু করায় এটি অতি দ্রুত একটি স্থায়ী গ্রামীণ পেশায় রূপ নেয়। গৃহিণীরা এক কৌটা বা এক পোয়া চাল দিয়ে পছন্দের ফিতা বা আলতা কিনে নিতেন। এই ফেরিওয়ালা আসা মানেই ছিল পাড়ার নারীদের এক জায়গায় জড়ো হওয়া। পণ্য দেখার ছলে চলতো হাসি-ঠাট্টা আর এক পশলা গল্প।
কেন বিলুপ্ত হচ্ছে এই ঐতিহ্য?
সময়ের বিবর্তনে এ পেশাটি এখন যাদুঘরে ঠাঁই নিচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি আর গ্রামে গ্রামে স্থায়ী প্রসাধন সামগ্রীর দোকান গড়ে ওঠায় ফেরিওয়ালাদের চাহিদা কমেছে। সারাদিন রোদে পুড়ে পায়ে হেঁটে পণ্য বিক্রি করে যে সামান্য লাভ হয়, তা দিয়ে বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে সংসার চালানো অসম্ভব। ফলে এই পেশার মানুষরা বাধ্য হয়েই অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়েছেন।
অন্যদিকে আধুনিক বিবর্তনে ফেরিওয়ালার ঝুড়ি থেকে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে জায়গা করে নিয়েছে একসময়ের গ্রাম বাংলার জনপ্রিয় এই পেশা। আধুনিক অনলাইন শপিং এবং ই-কমার্সের প্রসার এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ। এখন আর দুপুরের কড়া রোদে ফেরিওয়ালার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। ফেসবুক বা ই-কমার্স সাইটগুলো এখন আধুনিক যুগের 'ডিজিটাল লেইস-ফিতাওয়ালা'। লেইস-ফিতাওয়ালার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল ‘দুয়ারে পণ্য পৌঁছে দেওয়া’। আজকের ডেলিভারি রাইডাররা ঠিক একই কাজ করছে, তবে আরও যান্ত্রিক এবং পেশাদারভাবে। আগে চলতো বিনিময় প্রথা, আর এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এক নিমিষেই টাকা পরিশোধ করা যাচ্ছে। ফলে কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির পথে সেই চিরচেনা ডাক ‘লেইস ফিতা লেইস। হরেক রকম চুড়ি, ফিতা, কানেরদুল…’
লেইস-ফিতাওয়ালা কেবল একজন বিক্রেতা ছিলেন না, ছিলেন গ্রাম বাংলার সহজ-সরল জীবনের এক জীবন্ত অনুষঙ্গ। আধুনিকতার চাকচিক্যে রঙিন ফিতাগুলো হয়তো আরও উজ্জ্বল হয়েছে, কিন্তু ফেরিওয়ালার সেই মায়াবী ডাক আর ঝুনঝুনির শব্দ আজও আমাদের যান্ত্রিক জীবনে স্মৃতির মণিকোঠায় রয়ে গেছে। আমাদের আদি ‘হোম ডেলিভারি’ ব্যবস্থার সেই মহান কারিগররা হারিয়ে গেলেও, তাদের রেখে যাওয়া সেবার ধারণাটিই আজ বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।