যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছর। এক চতুর্থাংশ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও সেই মর্মান্তিক দিনের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন কোটি কোটি মার্কিন নাগরিক। সেদিনের হামলায় প্রায় তিন হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। পরবর্তীতে এ ঘটনা পুরোপুরি বদলে দেয় মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা নীতিকে। বিশ্বের ইতিহাস বদলে দেয়া এ ঘটনার প্রভাব আজও রেশ রেখে গেছে ভুক্তভোগী পরিবার, উদ্ধারকর্মী ও পরবর্তী প্রজন্মের জীবনে।
২০০১ সালের সেই সকালে আল-কায়েদার সশস্ত্র হামলাকারীরা চারটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ ছিনতাই করে। তারপর যুক্তরাষ্ট্রে একযোগে নজিরবিহীন হামলা চালায়। এর মধ্যে দুটি উড়োজাহাজ ডাউন ম্যানহাটনে অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে, যার ফলে ভবন দুটি ধসে পড়ে। তৃতীয় উড়োজাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগনে আঘাত হানে এবং চতুর্থটি পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে উত্তর টাওয়ার এবং ৯টা ২ মিনিটে দক্ষিণ টাওয়ারে হামলা হয়
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের মেয়াদের শুরুতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনার পর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে বহু বছর ধরে চলা যুদ্ধে ইরাক ও আফগানিস্তানের প্রায় নয় লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যার মূল সূত্রপাত ছিল এ হামলা।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাইরেও এ ঘটনা হাজার হাজার মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও পেশা বদলে দিয়েছে। চার বছরের স্কট লারসেন তার বাবাকে হারায় এ হামলায়। তার বাবার নামও ছিল স্কট লারসেন। ৩৫ বছর বয়সী লারসেন তখন নিউইয়র্ক সিটি ফায়ার ডিপার্টমেন্টের (এফডিএনওয়াই) একজন অগ্নিনির্বাপক কর্মী বা ফায়ারফাইটার ছিলেন। টুইন টাওয়ারে উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে যে ৩৪৩ জন অগ্নিনির্বাপক কর্মী নিহত হন, লারসেনের বাবা ছিলেন তাদের একজন।
বর্তমানে সেই ছোট্ট লারসেন নিউ ইয়র্কের কুইন্সের উডসাইডের সেই একই ফায়ারহাউসে কর্মরত আছেন, যেখানে তার বাবা কাজ করতেন। ফায়ারহাউসের দেয়ালে স্মৃতিফলক, ছবি ও ফায়ার ট্রাকে তার বাবার স্মৃতির ছাপ রয়েছে। আন্তর্জাতিক ফায়ারফাইটার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, ৯/১১-এ নিহত এফডিএনওয়াই ফায়ারফাইটারদের অন্তত ৫৮ জন সন্তান পরবর্তীতে নিজেদের বাবার পেশায় যোগ দিয়েছেন। লারসেনদের পরিবারে তিনি তৃতীয় প্রজন্মের ফায়ারফাইটার। তার ছোট ভাইও ফায়ারহাউসে যোগ দিবেন।
৩৫ বছর ফায়ারফাইটার স্কট লারসেন সেই ঘটনায় উদ্ধারকাজ চলাকালীন নিহত হন। তার ছেলে স্কট লারসেনের বয়স ছিল তখন চার বছর। বর্তমানে তিনিও ফায়ারফাইটার হিসেবে কর্মরত আছেন
হামলার পরবর্তী উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে শুরু হয় আরেক স্বাস্থ্য সংকট। ‘গ্রাউন্ড জিরো’ নামে পরিচিত সেই দুর্ঘটনাস্থলে ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের খোঁজে ও পরিচ্ছন্নতার কাজে অংশ নেন হাজার হাজার পুলিশ, অগ্নিনির্বাপক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী। তৎকালীন কন এডিসন বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল ডিরেক্টর ড. মাইকেল ক্রেন জানান, অনেক উদ্ধারকর্মী ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের দ্রুত খুঁজে পাওয়ার আশায় কাদা ও বিষাক্ত ধূলিকণার মধ্যেও মাস্ক বা রেসপিরেটর খুলে কাজ করেছিলেন। সেখান থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধূলাবালি শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করার কারণে পরবর্তীতে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়েন হাজারও মানুষ।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরিচালিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হেলথ প্রোগ্রাম সেই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ও উদ্ধারকাজে জড়িত প্রায় দেড় লাখ মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে। মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুসারে, এ কর্মসূচির আওতায় ৮৫ হাজারের বেশি শারীরিক সমস্যা নিবন্ধিত হয়েছে, যার অর্ধেকই ফুসফুসের সমস্যা এবং ৩০ শতাংশ ক্যানসার সম্পর্কিত। গত ২৫ বছরে এ প্রোগ্রামের আওতাভুক্ত ৯ হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী মারা গেছেন।
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার ধসে পড়ার পর দমকলকর্মী ও প্যারামেডিকরা আহতদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন
কারো কারো জন্য এ ট্র্যাজেডির স্মৃতি এক আজীবন অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদেরই একজন ৮০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত এয়ারলাইন কর্মী মাইকেল টুহি। ঘটনার দিন সকালে তিনি মেইন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনিই সেদিন দুই ছিনতাইকারী মোহাম্মদ আত্তা ও আবদুল আজিজ আল ওমারির টিকেট স্ক্যান করেছিলেন। আত্তার আচরণ কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হলেও তৎকালীন প্রচলিত নিয়মকানুন অনুযায়ী তাকে থামাননি টুহি। পরবর্তীতে ওই ছিনতাইকারীরাই আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১১ নিয়ে প্রথম টাওয়ারে আঘাত হানে।
ঘটনার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ গঠন করা হয়, নতুন বিমান চলাচল আইন এসেছে এবং বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা তল্লাশি ও ভ্রমণ পর্যবেক্ষণ আইন কঠোর করা হয়। তবে টুহির মতো মানুষের কাছে সেই সকালের ঘটনা, সেই স্মৃতি আজও ভারি এক বোঝা হয়ে আছে। আইন ও নিরাপত্তার দেয়াল যত শক্তই হোক না কেন, অগ্নিনির্বাপক কর্মী, চিকিৎসক কিংবা সাধারণ কর্মী—২৫ বছর পরও ৯/১১-এর ঘটনাটি মার্কিন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক গভীর দাগ কেটে রেখেছে।
রয়টার্স অবলম্বনে