প্রিয় রুদ্র, তুমি আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখতে বলেছিলে। তুমি কি এখন আকাশ জুড়ে থাকো? তুমি আকাশে উড়ে বেড়াও? তুমি এই জগত্সংসার ছেড়ে আকাশে চলে গেছো। তুমি আসলে বেঁচেই গেছো রুদ্র। ‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’— রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এই গানের লাইনের উত্তরে তার প্রেমিকা এই চিঠি লিখেছিলেন। এত প্রেম যাকে ঘিরে ছিল, কেমন ছিল তার জীবন?
১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর বরিশালে জন্ম রুদ্রর। সত্তরের দশকে বাংলা কবিতায় তার আবির্ভাব এমন এক সময়ে, যখন যুদ্ধের ক্ষত, রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বৈরাচারবিরোধী আকাঙ্ক্ষা আর ব্যক্তিমানুষের প্রেম-প্রতিবাদ মিলেমিশে তৈরি করছিল নতুন সময়ের ভাষা। রুদ্রর কাছে প্রেম নিছক কোমল অনুভূতি ছিল না; তা ছিল স্বাধীনতা, অধিকার, অভিমান আর হারানোর যন্ত্রণা।
সেই প্রেমের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লেখক তসলিমা নাসরিনের নাম। সাহিত্য ও চিঠির সূত্রে তাদের পরিচয়, তারপর প্রেম। ১৯৮১ সালের ২৯ জানুয়ারি তারা বিয়ে করেন। কিন্তু যে দুই মানুষ শব্দের মধ্য দিয়ে পরস্পরের কাছে পৌঁছেছিলেন, এক ছাদের নিচে তাদের জীবন তত সহজ থাকেনি। ১৯৮৬ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। পরবর্তী জীবনে তসলিমার স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে সম্পর্কের টানাপড়েন, ঈর্ষা, অভিমান এবং বিচ্ছেদের পরও থেকে যাওয়া আবেগের নানা অনুষঙ্গ। বিচ্ছেদের পরও রুদ্রর জীবন থেমে থাকেনি। তার জীবনে নতুন প্রেম এসেছিল। নিউ এজ পত্রিকায় প্রকাশিত জীবনীমূলক এক লেখায় শিমুল নামের এক তরুণীর সঙ্গে তার সম্পর্কের উল্লেখ রয়েছে। তসলিমার পরবর্তী স্মৃতিচারণেও রুদ্রর জীবনের শেষ পর্বে আরেক নারীর প্রতি তার আকর্ষণের কথা উঠে এসেছে।
কিন্তু তার জীবনের শেষ অধ্যায়ে একাকিত্বের যে ছবি পাওয়া যায়, তা অন্য রকম। জীবনীকার তপন বাগচীর বিবরণ এবং রুদ্রর বন্ধুদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে নীলক্ষেতের কবি অসীম সাহার ছাপাখানায় তার দীর্ঘ সময় কাটানোর কথা। বন্ধুদের বর্ণনায়, জীবনের শেষ দিকে তিনি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন; নতুন সম্পর্ক ও বিয়ের সম্ভাবনা নিয়েও তার আশা ছিল। সেই আশা পূরণ হয়নি ।
তার শরীরও তখন ভালো ছিল না। জীবনীমূলক বিবরণে অনিয়মিত জীবনযাপন, ধূমপান, পাকস্থলীর আলসার এবং পায়ের বার্জার্স রোগের কথা এসেছে। ১৯৯১ সালের ২১ জুন ঢাকায় তার মৃত্যু হয়। মাত্র ৩৪ বছরের জীবনে তিনি রেখে গেছেন কবিতা, গান, প্রতিবাদ এবং এক অসমাপ্ত সৃষ্টিশীল সম্ভাবনা।
রুদ্রর জীবনকে তাই কেবল ব্যর্থ প্রেমের উপাখ্যান করে তোলা তার প্রতি সুবিচার হবে না। তিনি ছিলেন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সক্রিয় একজন কবি, যিনি মানুষের মুক্তি ও মর্যাদার কথা লিখেছেন, আবার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া একজন মানুষও ছিলেন। তার জনপ্রিয় গান ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ আজও বিচ্ছেদ ও মমতার এক অদ্ভুত সহাবস্থান মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু গানটির প্রতিটি শব্দকে তার নিজের জীবনের কোনো নির্দিষ্ট সম্পর্কের স্বীকারোক্তি ধরে নেয়া যায় না। শিল্পের সত্য আর জীবনের তথ্য,দুটিকে আলাদা রেখেই তাঁকে বোঝা জরুরি।
রুদ্রর জীবনের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দিক এই যে, মানুষের অনুভূতিকে ভাষা দেয়া আর নিজের জীবনে সেই অনুভূতির সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বাঁচতে পারা এক বিষয় নয়। কবি অন্যের জন্য ভালোবাসার শব্দ রেখে যেতে পারেন, অথচ নিজের জীবনে ভালোবাসার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে পারেন না। রুদ্র চলে গেছেন বহু বছর আগে। থেকে গেছে তার কবিতা, তার গান, আর মানুষের অন্তর্জগতের সেই চিরন্তন প্রশ্ন: যে মানুষ অন্যকে ভালোবাসার ভাষা দিতে পারে, সে কি নিজেও সবসময় ভালোবাসার ভেতর আশ্রয় খুঁজে পায়?