ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তর। একসময় আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথ পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি হয়েছিল স্থাপনাটি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকদের দাবি তুলে ধরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে নারীর নিরাপত্তা, কৃষকের অধিকার, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ কিংবা নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ—বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠস্বর ধারণ করেছে যন্তর মন্তর। তিন শতাব্দীর ইতিহাস পেরিয়ে জায়গাটি এখন ভারতের গণতান্ত্রিক পরিসরে ভিন্ন এক পরিচয়ের মুখোমুখি।
নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার মুখে যখন ইন্ডিয়া গেটের ঐতিহ্যবাহী ‘বোট ক্লাব’ প্রাঙ্গণে সভা-সমাবেশ বন্ধ করে দেয়া হয়, ঠিক তখনই বিকল্প রাজপথ হিসেবে উঠে আসে লুটিয়েন্স দিল্লির যন্তর মন্তর রোড। সংসদ ও কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর কাছাকাছি অবস্থান স্থানটির গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দেয়। নাগরিক, অধিকারকর্মী ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠন এখানে সমবেত হয়ে নিজেদের দাবি তুলে ধরতে থাকে।
যন্তর মন্তরের এ রূপান্তর কিন্তু এক রাতে ঘটেনি, এর ইতিহাস যেমন প্রাচীন, তেমনই প্রবাহমান। ১৭২৪ সালে মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের নির্দেশে জয়পুরের মহারাজা সাওয়াই জয় সিং (দ্বিতীয়) যখন পাথর ও ইটের এই অনন্য কাঠামোটি নির্মাণ করেন, তখন এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তারকা ও গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথ সঠিক রূপরেখায় হিসাব করা। কিন্তু তিন শতক পর সেই একই প্রাঙ্গণ ভারতের রাজনীতি, নাগরিক অধিকার এবং প্রতিবাদের ‘হৃদয়পুর’ হয়ে ওঠে।
গত তিন দশকে ভারতের আধুনিক ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া একের পর এক মাইলফলক আন্দোলনের নীরব সাক্ষী থেকেছে যন্তর মন্তর
যন্তর মন্তরের সঙ্গে হৃদয়পুরের সম্পর্ক কী? সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র ‘হীরক রাজার দেশে’ (১৯৮০)-তে যন্তর মন্তর এবং হৃদয়পুর মূলত একনায়কতন্ত্র ও মুক্তচিন্তার মধ্যকার লড়াই ও বিপরীত ভাবাদর্শের প্রতীক হিসেবে সম্পর্কিত। চলচ্চিত্রে ‘যন্তর মন্তর’ হলো হীরক রাজার তৈরি একটি অত্যাচারী মগজধোলাই ঘর, যেখানে রাজ্যযন্ত্রের প্রতিবাদী মানুষ, কৃষক ও শিক্ষকদের বন্দি করে ছড়া কিংবা মন্ত্রের মাধ্যমে তাদের স্বাধীন চিন্তাশক্তি কেড়ে নিয়ে রাজার অন্ধ অনুগতে পরিণত করা হতো। অন্যদিকে ‘হৃদয়পুর’ হলো রাজদ্রোহী শিক্ষক উদয়ন পণ্ডিতের গোপন আশ্রয়স্থল ও পাঠশালা, যা মুক্তশিক্ষা, সত্য, মানবতা এবং শোষণের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল প্রতিবাদের সূচনা কেন্দ্র। অর্থাৎ, যন্তর মন্তর যেখানে স্বৈরাচার, বাকস্বাধীনতা হরণ ও নিগ্রহের প্রতিনিধিত্ব করে, হৃদয়পুর সেখানে শিক্ষা, বিবেক এবং স্বৈরাচারী শাসনের পতনের মূল চালিকাশক্তি বা প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।
গত তিন দশকে ভারতের আধুনিক ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া একের পর এক মাইলফলক আন্দোলনের নীরব সাক্ষী থেকেছে এই যন্তর মন্তর। ১৯৯৩ সালে সরকারের উদারীকরণ অর্থনৈতিক নীতির প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণ করা ‘জেল ভরো’ আন্দোলন দিয়ে এই চত্বরের রাজনৈতিক যাত্রার গতি বাড়ে। এরপর ২০১১ সালের এপ্রিলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জন লোকপাল বিলের দাবিতে অনশন শুরু করেন প্রবীণ সমাজকর্মী আন্না হাজারে। সেই পাঁচ দিনের অনশন সমগ্র ভারতে এক বিশাল দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের দাবানল জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তার ঠিক পরের বছর, ২০১২ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ‘নির্ভয়া’ গণধর্ষণের ঘটনার পর হাজার হাজার তরুণ ও সাধারণ নাগরিক যখন শোক ও ক্ষোভের আলো হাতে যন্তর মন্তরে মোমবাতি মিছিলে অংশ নেন। ক্ষমতার শীর্ষবিন্দু নাড়িয়ে দিয়েছি সে আন্দোলন, দেশের নারী সুরক্ষা আইনে আনা হয় বড় ধরনের ঐতিহাসিক পরিবর্তন।
ঐতিহাসিক প্রতিবাদী চত্বরটির পথচলা সম্প্রতি চরম এক প্রশাসনিক রূপান্তরের মুখে পড়েছে
শুধু দিল্লির স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় রাজনীতিই নয়, পুরো দেশের প্রান্তিক মানুষের আহাজারিও বহুবার এই মাটিকে ভিজিয়েছে। ২০১৪ সালে উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচল প্রদেশের শিক্ষার্থী নিডো তানিয়া বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হয়ে মারা গেলে, এর বিরুদ্ধে শত শত শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে এখানেই সুবিচারের দাবি জানান। আবার ২০১৭ সালে তামিলনাড়ুর খরাকবলিত কৃষকরা যখন ঋণ মওকুফ ও জরুরি ত্রাণের দাবিতে যন্তর মন্তরে ৪১ দিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন, তখন সেই খবর বিশ্ব গণমাধ্যমের নজর কেড়ে নেয়।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভেও বারবার ফিরে এসেছে যন্তর মন্তর। ২০২৪ সালে জাতীয় যোগ্যতা নির্ধারণী প্রবেশিকা পরীক্ষা—এনইইটি-ইউজি (নিট-ইউজি) পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে বিভিন্ন শিক্ষার্থী সংগঠন এখানে বিক্ষোভ করে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থকরা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এখানে এসেই জড়ো হন। পরে পদত্যাগে বাধ্য হন ধর্মেন্দ্র।
তবে এই ঐতিহাসিক প্রতিবাদী চত্বরটির পথচলা সম্প্রতি চরম এক প্রশাসনিক রূপান্তরের মুখে পড়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে দেশটিতে সম্প্রতি তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন উত্তপ্ত পরিস্থিতি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেস কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তরুণ সমাজ ও ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-সহ বিভিন্ন বিরোধী জোট ও ছাত্র সংগঠনগুলোর টানা গণবিক্ষোভে সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লির রাজপথ কার্যত উত্তাল হয়ে ওঠে। নিট (এনই্ইটি) পরীক্ষা কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে প্রশাসনিক নানা ইস্যুতে জন্ম নেয়া এ ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে সর্বশেষ নির্বাচন কমিশন বিরোধী আন্দোলন। এ উত্তাল গণআন্দোলন ও দীর্ঘদিনের উত্তেজনার জেরে গত ১২ অক্টোবর দিল্লি পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান হিসেবে ‘ডি-নোটিফাই’ বা বাতিল ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে ভারতের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম এক প্রতিবাদী বসন্তের প্রাতিষ্ঠানিক যবনিকা টানা হলো নাকি বিষয়টি অন্য মোড় নেবে— এখন তা-ই দেখার বিষয়।
সূত্র: দ্য হিন্দু, হিন্দুস্তান টাইমস ও এবিপি আনন্দ