“পাঙ্খা” শব্দটির মধ্যে যেন লুকানো আছে এক প্রাচীন বাতাসের ধ্বনি। এর উৎস সেই সংস্কৃত “পাঙ্খ” অর্থাৎ ডানা বা পাখা থেকে। হাজার বছরের এই উপমহাদেশে মানুষ কৃত্তিম বাতাসের উৎস হিসেবে আবিষ্কার করেছিল তালপাতা, খেজুরপাতা, বেত কিংবা শুকনো ঘাস দিয়ে তৈরি হাতপাখা। রাজপ্রাসাদের প্রহরায় দাঁড়িয়ে থাকা সেবক, মন্দিরচিত্রে বাতাস করতে থাকা সহচর, এসব দৃশ্য যুগ যুগ ধরে চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য আর ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে। হাতপাখার এই সরল ইতিহাসের ভেতরেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় আরেক রূপ,ঝুলন্ত পঙ্খা। ছাদের সঙ্গে বাঁধা থাকত লম্বা কাঠামো, কাপড় বা খোস কাঠের ফ্রেম; পুলি-চক্র আর দড়ির সাহায্যে এটিকে দুলিয়ে ঘরের ভেতর সৃষ্টি করা হতো শীতল বাতাস। আজ যে প্রযুক্তিকে আমরা ভুলে গেছি, সেই সময় তার ছিল অপরিহার্যতা।
শুরুর কথা
এই ঝুলন্ত ফ্যানটির সুনির্দিষ্ট উৎপত্তিস্থান ইতিহাসচর্চার কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কেউ বলেন, এই পাঙ্খা আরব অঞ্চলের প্রাচীন swing fan থেকে ভারতবর্ষে এসেছে। রেশম, সুতির কাঠামো ও কাঠের ফ্রেমে রূপ পেয়ে নতুনভাবে বিকশিত হয়েছে। ইতিহাসবিদরা এটুকু নিশ্চিত করেন যে ব্রিটিশ আমলে এসে এর ব্যবহার এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে কোনো প্রশাসনিক দপ্তর, আদালত কিংবা জমিদারবাড়ি, সব জায়গাতেই পঙ্খা ছাড়া গ্রীষ্ম কাটানো ছিল প্রায় অসম্ভব। যদিও বাংলার প্রাচীন ইতিহাসে ঝুলন্ত পাঙ্খার উল্লেখ কম, হাতপাখা এখানে ছিল ঘরের এক অপরিহার্য অবলম্বন যা এখনও গ্রামে গঞ্জে আংশিক দেখা যায়। তবে ঝুলন্ত পঙ্খা এ অঞ্চলে দেরিতে এলেও তার সাংস্কৃতিক ভূমি প্রস্তুত ছিল বহু আগেই।
প্রাচীন ভারতের পাঙ্খাপুলার
ঔপনিবেশিক শাসনের বিস্তৃত সময়ে, বিশেষত ১৮০০-এর শেষভাগ থেকে ১৯০০-এর শুরুর দিকে, পঙ্খা ব্যবহারের দৃশ্য ছিল প্রশাসনিক জগতে অত্যন্ত পরিচিত। ধাতু, ইট, চুন-সুরকির বড় ভবনগুলোয় গরম ছিল অসহনীয়। আর সেই গরমের বিরুদ্ধে মানুষের একমাত্র নির্ভরযোগ্য সহায় ছিল ঝুলন্ত কাপড়ের ফ্যান। ব্রিটিশ ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলের প্রাচীন নথিতে, ১৭৯৮ সালের রিপোর্টে, কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে কাউন্সিল রুমে ঝুলন্ত পাঙ্খা ব্যবহারের একটি উল্লেখ পাওয়া যায়। এর পরবর্তী কয়েক দশকে জমিদারবাড়ি থেকে শুরু করে সরকারি দপ্তর, আদালত, মিটিং কক্ষ, ক্যান্টিন ও বিভিন্ন গরমঘরে বৃহৎ কাপড়ের পঙ্খা টানার শব্দ প্রতিদিনের অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়।
পাঙ্খার শ্রেণীভেদ
পঙ্খার কাঠামোও যেন ব্যবহারকারীর পরিচয় জানান দিত। সাধারণ বাড়িতে এটি হত বেত দিয়ে তৈরি; আর উচ্চবিত্ত, রাজন্য ও ব্রিটিশ অফিসারদের ঘরে পাঙ্খা ঢেকে রাখা হত সাদা কাপড়, সূক্ষ্ম সুতি কিংবা রেশমে। দড়ির অন্য প্রান্তে বসে যে মানুষটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা পঙ্খা টেনে যেতেন,তিনি ছিলেন পেশাগতভাবে ‘পাঙ্খাওয়ালা’ বা পাঙ্খা পুলার। তার কাজ ছিল নিঃশব্দ, কিন্তু অপরিহার্য। বিশেষ করে বড় আদালত বা কাউন্সিল রুমে পুলারকে এমন স্থানে রাখা হত যাতে তিনি গোপন আলোচনা শুনতে না পান। তার উপস্থিতি কার্যত প্রয়োজনীয় হলেও দেখতে-না-পাওয়া এক অস্তিত্বে পরিণত হন তিনি। সমাজের শ্রেণিবিন্যাস সেখানে এমনই স্পষ্ট ছিল, একদিকে আরামের অধিকারীরা, অন্যদিকে সেই আরাম বজায় রাখতে ঘন্টার পর ঘন্টা দড়ি টেনে চলা এক মানুষ, যার নাম ইতিহাসের পাতায় আজ প্রায় অদৃশ্য।
বাংলাদেশে পাঙ্খার আগমন।
পূর্ববঙ্গ বা আজকের বাংলাদেশের ইতিহাসে ঝুলন্ত পঙ্খা ও পুলারের নির্দিষ্ট নথি খুব বেশি পাওয়া যায় না। বহু দলিল হারিয়ে গেছে, অনেক স্মৃতি সময়ের স্রোতে মিলিয়ে গেছে। তবে বাংলা অঞ্চলে পঙ্খার উপস্থিতি নিশ্চিত, বিশেষত যেখানে ব্রিটিশ প্রশাসনিক কাঠামো ছিল। কলকাতা, ঢাকা সদরঘাট, চট্টগ্রাম, সিলেটের শহরাঞ্চল, এবং বিভিন্ন জমিদারবাড়ি ও কোর্ট কমপ্লেক্সে।
ইতিহাস থেকে জানা যায় ১৮০০-এর গোড়ার দিকে প্রথম ব্যক্তিগত বাড়িতে ঝুলন্ত পঙ্খার দেখা পাওয়া যায়; এরপর অফিস, আদালত, বড় দপ্তরগুলোতে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আরও আকর্ষণীয় তথ্য হলো, ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত, পূর্ব পাকিস্তান আমলেও, কিছু কোর্ট রুমে ঝুলন্ত পঙ্খা ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই সময় পর্যন্ত বৈদ্যুতিক ফ্যান ও সিলিং ফ্যান পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি; ফলে পুরনো পদ্ধতির পঙ্খা ও পুলারের কাজ কিছু জায়গায় টিকে ছিল।
হারিয়ে গেল যেভাবে
কিন্তু প্রযুক্তির দৌড় দ্রুত। ২০ শতকের প্রথমার্ধ থেকে বৈদ্যুতিক ফ্যান, পরে সিলিং ফ্যান এবং অবশেষে এয়ার কন্ডিশনার আসায় পঙ্খা পুলারের পেশা ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। ১৯৫০–৬০–এর দশকের পর এই পেশার অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়। আজ তালপাতার হাতপাখা গ্রামবাংলায় পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু ঝুলন্ত পঙ্খা, কাপড়ের বিশাল দোলন ফ্যান, এখন কেবল স্মৃতি।
কিন্তু ইতিহাস কখনো পুরোপুরি হারায় না। আজও দেশের কিছু পুরনো জমিদারবাড়ি, জরাজীর্ণ আদালত ভবন, কিংবা সংগ্রাহকের পুরনো ট্রাঙ্কে পাওয়া যায় কাপড়ের পঙ্খার ছেঁড়া অংশ, কাঠের ফ্রেম, কিংবা দড়ির কুণ্ডলী। এশিয়া, ইউরোপের সংগ্রহশালাগুলোতেও টিকে আছে এই বিলুপ্তশিল্পের স্মৃতি। লন্ডনের 'ফ্যান মিউজিয়াম' এ ২০০৪ সালে অনুষ্ঠিত “Pankha: Traditional Crafted Hand Fans Of The Indian Subcontinent” প্রদর্শনীতে উপমহাদেশের নানা অঞ্চল থেকে সংগৃহীত শতাধিক পঙ্খা স্থান পেয়েছিল, এক বিস্মৃত ইতিহাসকে উন্মোচন করে।
এই পেশার ইতিহাসে আছে কঠোরতা, আছে শ্রেণিবিভাজনের নির্মম রেখা, আছে আরামের সঙ্গে যুক্ত নিঃশব্দ শ্রমের গভীর প্রতিচ্ছবি। একদিকে শাসকের ঠান্ডা আরাম; অন্যদিকে পুলারের পরিশ্রম, যে পরিশ্রম দৃশ্যমান হলেও স্বীকৃত নয়। আর এই দ্বৈততার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক বাস্তবতার পুরনো স্তরগুলো।