কুকুর-বিড়ালের বন্ধ্যাত্বকরণ কেন জরুরি

বন্ধ্যাত্বকরণের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো অনাকাঙ্ক্ষিত প্রজনন নিয়ন্ত্রণ। একটি স্ত্রী বিড়াল বছরে একাধিকবার বাচ্চা দিতে পারে। একটি স্ত্রী কুকুরও প্রজননক্ষম সময়ে একাধিকবার বাচ্চা দিতে পারে। ফলে কয়েকটি প্রাণী থেকে অল্প সময়ের মধ্যে অনেক বাচ্চার জন্ম হতে পারে। সব বাচ্চার জন্য নিরাপদ ও স্থায়ী ঘর নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে তাদের একটি অংশ রাস্তায় চলে যায়। এতে পথপ্রাণীর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং খাবার, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের সংকটও তৈরি হয়। ফলে রোগব্যাধি আর নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে অনেক প্রাণী মারা যায়। তাই বন্ধ্যাত্বকরণ এই অনাকাঙ্ক্ষিত জন্ম ও কষ্ট প্রতিরোধ করার সবচেয়ে কার্যকর ও মানবিক উপায়।

কুকুর বা বিড়াল পোষার ক্ষেত্রে খাবার, টিকা ও চিকিৎসার পাশাপাশি স্টেরিলাইজেশন বা বন্ধ্যাত্বকরণও গুরুত্বপূর্ণ যত্নের অংশ। বিশেষ করে যেসব প্রাণীকে প্রজননের উদ্দেশ্যে রাখা হচ্ছে না, তাদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বয়সে বন্ধ্যাত্বকরণ করলে অনাকাঙ্ক্ষিত বাচ্চা জন্মের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন রোগ ও আচরণগত সমস্যার ঝুঁকিও কমে যায়।

স্টেরিলাইজেশন বলতে সাধারণত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রাণীর প্রজননক্ষমতা বন্ধ করে দেয়াকে বোঝায়। পুরুষ কুকুর বা বিড়ালের ক্ষেত্রে অণ্ডকোষ অপসারণ করা হয়। আর স্ত্রী প্রাণীর ক্ষেত্রে ডিম্বাশয় এবং সাধারণত জরায়ু অপসারণ করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এসব অস্ত্রোপচার যথাক্রমে নিউটার ও স্পে নামে পরিচিত।

বন্ধ্যাত্বকরণের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো অনাকাঙ্ক্ষিত প্রজনন নিয়ন্ত্রণ। একটি স্ত্রী বিড়াল বছরে একাধিকবার বাচ্চা দিতে পারে। একটি স্ত্রী কুকুরও প্রজননক্ষম সময়ে একাধিকবার বাচ্চা দিতে পারে। ফলে কয়েকটি প্রাণী থেকে অল্প সময়ের মধ্যে অনেক বাচ্চার জন্ম হতে পারে। সব বাচ্চার জন্য নিরাপদ ও স্থায়ী ঘর নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে তাদের একটি অংশ রাস্তায় চলে যায়। এতে পথপ্রাণীর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং খাবার, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের সংকটও তৈরি হয়। ফলে রোগব্যাধি আর নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে অনেক প্রাণী মারা যায়। তাই বন্ধ্যাত্বকরণ এই অনাকাঙ্ক্ষিত জন্ম ও কষ্ট প্রতিরোধ করার সবচেয়ে কার্যকর ও মানবিক উপায়।

বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তায় থাকা কুকুর ও বিড়ালের সংখ্যা বাড়লে মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘাতের সম্ভাবনাও বাড়ে। খাবারের জন্য দলবদ্ধ হওয়া, বর্জ্যের ওপর নির্ভরতা, যানবাহনের নিচে বা আশপাশে আশ্রয় নেয়া এবং প্রজনন মৌসুমে মারামারির মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। দায়িত্বশীলভাবে বন্ধ্যাত্বকরণ করলে দীর্ঘমেয়াদে এসব চাপ কমানো সম্ভব।

স্ত্রী বিড়ালের ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বকরণ জরায়ুর সংক্রমণ বা পায়োমেট্রার মতো গুরুতর সমস্যার ঝুঁকি দূর করতে পারে। উপযুক্ত বয়সে অস্ত্রোপচার করলে স্তনগ্রন্থির কিছু টিউমারের ঝুঁকিও কমতে পারে। স্ত্রী কুকুরের ক্ষেত্রেও পায়োমেট্রা প্রতিরোধে এটি গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষ প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রোস্টেট অর্থাৎ অণ্ডকোষের ক্যানসারের ঝুঁকি দূর হয় এবং কিছু প্রজননসংক্রান্ত সমস্যার সম্ভাবনা কমে।

আর আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বন্ধ্যাত্বকরণের পর কুকুর-বিড়ালের আচরণগত দিক থেকেও বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। পুরুষ কুকুর ও বিড়ালের প্রস্রাব দিয়ে এলাকা বা টেরিটরি চিহ্নিত করার প্রবণতা কমে যায়। এছাড়া সঙ্গী খুঁজে বাইরে চলে যাওয়ার প্রবণতা এবং প্রজনন নিয়ে মারামারির সম্ভাবনাও কমে যায়। তবে বন্ধ্যাত্বকরণ সব ধরনের আচরণগত সমস্যা দূর করে না। ভয়, উদ্বেগ, প্রশিক্ষণের অভাব বা পরিবেশগত সমস্যার কারণে তৈরি আচরণে আলাদা ব্যবস্থা প্রয়োজন।

তবে বন্ধ্যাত্বকরণ মানেই সব প্রাণীর জন্য একই সময়ে অস্ত্রোপচার করা নয়। প্রাণীর বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা, টিকা, পূর্বের রোগ এবং অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি বিবেচনা করে সময় নির্ধারণ করা উচিত। কুকুর ও বিড়ালের ক্ষেত্রে কোন বয়স সবচেয়ে উপযুক্ত, তা জাত, আকার ও স্বাস্থ্যের ওপরও নির্ভর করতে পারে। তাই অস্ত্রোপচারের আগে রেজিস্টার্ড পশুচিকিৎসকের শারীরিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

অস্ত্রোপচারের পরের যত্নও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কয়েক দিন পর্যন্ত প্রাণীকে অতিরিক্ত দৌড়ঝাঁপ ও লাফালাফি থেকে দূরে রাখতে হয়। অস্ত্রোপচারের স্থান চাটতে বা কামড়াতে না পারে, সেদিকেও নজর দিতে হয়। ক্ষত ফুলে যাওয়া, অতিরিক্ত রক্তপাত, পুঁজ, দুর্গন্ধ, দীর্ঘ সময় না খাওয়া বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে এক্ষেত্রে অবশ্যই দ্রুত পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

বন্ধ্যাত্বকরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি শুধু একটি প্রাণীর বিষয় নয়। পোষ্য প্রাণীর অনিয়ন্ত্রিত প্রজনন ঠেকানোর মাধ্যমে মালিক যেমন ভবিষ্যতের অতিরিক্ত দায়িত্ব এড়াতে পারেন, তেমনি সমাজে পরিত্যক্ত প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধির চাপও কমানো যায়। একই কারণে পথপ্রাণী নিয়ন্ত্রণেও বন্ধ্যাত্বকরণভিত্তিক কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে শুধু বন্ধ্যাত্বকরণ করলেই পথপ্রাণীর সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে না। এর সঙ্গে টিকাদান, নিয়মিত চিকিৎসা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্বশীলভাবে প্রাণী পালন এবং পরিত্যক্ত প্রাণীর পুনর্বাসনও জরুরি। বিশেষ করে পথকুকুর ও পথবিড়ালের ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে বন্ধ্যাত্বকরণ, টিকাদান এবং পুনরায় নিরাপদ পরিবেশে ছেড়ে দেয়ার ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।

সবশেষে, বন্ধ্যাত্বকরণকে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা হিসেবে না দেখে দায়িত্বশীল প্রাণী ব্যবস্থাপনার একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে দেখতে হবে। সঠিক বয়সে, সুস্থ প্রাণীর ক্ষেত্রে এবং প্রশিক্ষিত পশুচিকিৎসকের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করা হলে এটি প্রাণীর নিজের স্বাস্থ্য, পোষ্য হিসেবে তার জীবন এবং বৃহত্তর প্রাণী জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আরও