বিদেশে গিয়ে নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। কেউ যান ভালো চাকরির জন্য, কেউ কম খরচে স্বাচ্ছন্দ্য ও সুখী জীবনের খোঁজে, আবার কেউ নতুন সংস্কৃতি ও পরিবেশের টানে। কিন্তু বিদেশে বসবাসের ক্ষেত্রে শুধু আয় বা চাকরির সুযোগই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়া, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা, বাসস্থান পাওয়া, নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন জীবন কতটা সহজ—এসব বিষয়ও বড় ভূমিকা রাখে। তাহলে বিদেশে নতুন করে জীবন গড়তে চাইলে কোন দেশ বেছে নেয়া যায়?
বিদেশে বসবাসকারীদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ইন্টারন্যাশনস প্রতি বছর জরিপের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৬ সালের ‘এক্সপ্যাট ইনসাইডার’ জরিপের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে বিবিসির তৈরি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রবাসীদের পছন্দের শীর্ষ পাঁচ দেশ। এর মধ্য থেকে হয়তো আপনিও বেছে নিতে পারেন নিজের পছন্দের ভবিষ্যৎ ঠিকানা।
এ জরিপে ৩১টি দেশকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে জীবনযাত্রার মান, নতুন দেশে মানিয়ে নেয়ার সুযোগ, কর্মসংস্থান, ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থা এবং আবাসন ও ডিজিটাল সেবার মতো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
জরিপে শীর্ষ পাঁচে রয়েছে পানামা, মেক্সিকো, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ব্রাজিল। এ দেশগুলোয় বসবাসরত কয়েকজন প্রবাসীর অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে কেন তারা সেখানে থেকে যেতে চেয়েছেন এবং নতুনদের জন্য কী জানা জরুরি।
পানামা: স্বস্তির জীবনের খোঁজে
টানা তৃতীয় বছরের মতো এ তালিকার শীর্ষে রয়েছে পানামা। কর্মসংস্থান ও ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সূচকে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সংযোগস্থলে অবস্থিত এ দেশটির অবস্থান প্রথম। জরিপে অংশ নেয়া পানামায় বসবাসরত প্রবাসীদের ৮৭ শতাংশ জানিয়েছেন, বিদেশের জীবন নিয়ে তারা সন্তুষ্ট। আর ৯০ শতাংশের মতে, সেখানে বাসা খুঁজে পাওয়া তুলনামূলক সহজ।
এছাড়া সমুদ্রের কাছে যাওয়া, বাগানে হাঁটা আর পাখির ডাক শোনা—এসবও হতে পারে সেখানে বসবাসের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ। পাশাপাশি স্থিতিশীল অর্থনীতি ব্যবসা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সহায়ক বলে মত দিয়েছেন অনেকে।
তবে এখানে সবকিছুই যে সহজ, তা নয়। দ্বীপ এলাকায় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছাতে দেরি হতে পারে। আর দৈনন্দিন কাজে কিছুটা বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে সেখানকার আবহাওয়া। তাছাড়া পানামায় থাকতে হলে জীবনের একটু ধীর গতি মেনে নিতে হবে।
মেক্সিকো: সহজে আপন হয়ে ওঠার দেশ
নতুন দেশে গিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মিশতে পারা অনেক প্রবাসীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ জায়গায় মেক্সিকো সবচেয়ে এগিয়ে। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়ার সূচকে উত্তর আমেরিকার এ দেশটির অবস্থান প্রথম। জরিপে অংশ নেয়া ৭৩ শতাংশ প্রবাসী বলেছেন, সেখানে স্থানীয় বন্ধু তৈরি করা সহজ, যেখানে বিশ্বব্যাপী এ হার ৩৯ শতাংশ।
তবে মেক্সিকোর একটি দুর্বল দিকও আছে। নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে ৩১টি দেশের মধ্যে দেশটির অবস্থান ২৫তম। তাই দেশটিতে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেয়া গুরুত্বপূর্ণ।
থাইল্যান্ড: কম খরচে স্বস্তির জীবন
তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে থাইল্যান্ড। জরিপ অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসীদের মধ্যে জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির হার সবচেয়ে বেশি—৮৬ শতাংশ। জীবনযাত্রার ব্যয়ের ক্ষেত্রেও দেশটি শীর্ষে রয়েছে। কম খরচের পাশাপাশি থাই সমাজের জীবনধারা এবং শিক্ষাব্যবস্থার কিছু বিষয় প্রবাসীদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।
এছাড়া থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক আধুনিকতার পাশাপাশি ধরে রেখেছে তার নিজস্ব সংস্কৃতি। অঞ্চলটিতে বিভিন্ন দেশের খাবারের বৈচিত্র্য, পার্ক, শিল্পকলা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতির উপস্থিতি এখনো স্পষ্ট।
তবে প্রবাসীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান করা। বাড়িতে ঢোকার আগে জুতা খোলা বা জনসমক্ষে জাতীয় সংগীত বাজলে সম্মান দেখানোর মতো রীতিনীতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: কাজ ও দৈনন্দিন জীবনে সুবিধা
ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ এবং প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভালো অবস্থানে রয়েছে। ভিসা, ভাষা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন প্রয়োজনের বিষয়গুলো তুলনামূলক সহজ হওয়ায় দেশটি আন্তর্জাতিক কর্মীদের কাছে আকর্ষণীয়।
জরিপে অংশ নেয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন দেশের অভিবাসননীতি কঠোর হওয়ার সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনো বিদেশী কর্মীদের জন্য তুলনামূলক উন্মুক্ত পরিবেশ ধরে রেখেছে। অনেকের কাছে আবার সেখানকার তুলনামূলক কম ব্যস্ত জীবন, কম যানজট এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শুধু বিলাসবহুল শহরগুলো দেখলেই দেশটির পুরো চিত্র উঠে আসে না। দুবাইয়ের পুরনো এলাকায় ঘুরে দেখা, কর্মব্যস্ত সময়ে মেট্রোতে যাতায়াত বা ছোট স্থানীয় রেস্তোরাঁয় খেলে বোঝা যায় সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীদের দৈনন্দিন জীবন আসলে কেমন।
ব্রাজিল: স্থানীয়দের আন্তরিকতায় নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়ার সুবিধা
এ বছর প্রথমবারের মতো শীর্ষ পাঁচে জায়গা করে নিয়েছে ব্রাজিল। জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি, নতুন দেশে মানিয়ে নেয়া, স্থানীয় মানুষের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দেশটি ভালো অবস্থানে রয়েছে।
ব্রাজিলের স্থানীয়দের সামাজিকতায় যে কেউ দ্রুত নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবেন। তাছাড়া কারো সঙ্গে পরিচয়ের কিছুদিনের মধ্যেই তার বাড়িতে খাওয়ার আমন্ত্রণ পাওয়া সেখানে অস্বাভাবিক নয়। তবে ইংরেজির ব্যবহার তুলনামূলক কম হওয়ায় নতুনদের জন্য পর্তুগিজ ভাষা শেখা প্রয়োজন হতে পারে।
দেশ বাছাইয়ের আগে যা ভাবতে হবে
আরো কিছু জরিপের ফল বলছে, প্রবাসীদের কাছে কোনো দেশের আকর্ষণ শুধু ভালো বেতন বা আধুনিক অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। কেউ কতটা সহজে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারছেন, স্থানীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারছেন এবং নিজের আয় দিয়ে স্বস্তিতে জীবনযাপন করতে পারছেন—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পানামায় স্বস্তির জীবন, মেক্সিকোয় সামাজিক বন্ধন, থাইল্যান্ডে কম খরচ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং ব্রাজিলে স্থানীয়দের আন্তরিকতা—প্রতিটি দেশের আকর্ষণ আলাদা।
তাই বিদেশে নতুন জীবন শুরু করার আগে শুধু কোন আন্তর্জাতিক র্যাংকিং দেখেই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত হবে না। বরং চাকরির সুযোগ, ভিসার নিয়ম, নিরাপত্তা, ভাষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার পছন্দ—সবকিছু বিবেচনা করেই নিজের জন্য উপযুক্ত দেশ বেছে নেয়া প্রয়োজন।